ঋণনির্ভর জীবন, কিস্তি আদায়ের চাপ, মাঠকর্মীদের শ্রমের মূল্য এবং বিপুল আর্থিক কার্যক্রমের বিপরীতে নিট উদ্বৃত্তের ব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধান প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণকে দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্র্যাক, আশা, গ্রামীণ ব্যাংক, টিএমএসএস ও বুরো বাংলাদেশের মতো প্রতিষ্ঠান লাখ লাখ মানুষের কাছে ঋণ পৌঁছে দিয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, পশুপালন ও পারিবারিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এই ঋণের ভূমিকা রয়েছে।
কিন্তু এই ব্যবস্থার সাফল্য পরিমাপের প্রশ্নটি কি শুধু ঋণ বিতরণ, কিস্তি আদায় ও ঋণ পুনরুদ্ধারের হার দিয়ে নির্ধারণ করা যায়?
যে মানুষ ঋণ নিচ্ছেন, তার আয় কি স্থায়ীভাবে বাড়ছে? ঋণের অর্থ কি নতুন উৎপাদন ও কর্মসংস্থান তৈরি করছে, নাকি পুরোনো ঋণ পরিশোধ ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতেই ব্যবহৃত হচ্ছে? ঋণ আদায়ের সঙ্গে যুক্ত মাঠকর্মীরা কি তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে? আর প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় থেকে ব্যয় বাদ দেওয়ার পর যে নিট উদ্বৃত্ত তৈরি হচ্ছে, তার চূড়ান্ত সুবিধাভোগী কারা?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ক্ষুদ্রঋণের প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফলাফল নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
১. ঋণ বিতরণের পরিসংখ্যান কি দারিদ্র্য বিমোচনের প্রমাণ?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৬৯৩টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ গ্রাহককে বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া হয়েছে। ওই অর্থবছরে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা এবং ঋণ আদায় প্রায় ২ লাখ ৬৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষে প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণস্থিতি ছিল প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪–২৫।
এই পরিসংখ্যান ক্ষুদ্রঋণের বিশালতা তুলে ধরে। কিন্তু বিপুল ঋণ বিতরণ নিজে থেকেই দারিদ্র্য কমার প্রমাণ নয়।
ঋণগ্রহীতার আর্থিক অবস্থার প্রকৃত পরিবর্তন জানতে অন্তত চারটি বিষয় পরীক্ষা করা দরকার:
১. ঋণ নেওয়ার আগে ও পরে পরিবারের প্রকৃত আয় কতটা পরিবর্তিত হয়েছে?
২. ঋণের অর্থের কত অংশ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে এবং কত অংশ ভোগ, চিকিৎসা, শিক্ষা, পুরোনো ঋণ পরিশোধ কিংবা জরুরি ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়েছে?
৩. কিস্তি, সার্ভিস চার্জ ও ব্যবসায়িক ব্যয় বাদ দেওয়ার পর ঋণগ্রহীতার হাতে কত টাকা থাকে?
৪. ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন ঋণ, সম্পদ বিক্রি কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যের অতিরিক্ত শ্রমের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে কিনা?
একজন ঋণগ্রহীতা নিয়মিত কিস্তি দিলেই তিনি দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন— এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ঋণ আদায়ের সাফল্য এবং ঋণগ্রহীতার অর্থনৈতিক মুক্তি দুটি পৃথক সূচক।
২. ব্র্যাক: বিশাল ঋণ কার্যক্রম, কিন্তু উদ্বৃত্তের ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ?
ব্র্যাকের ২০২৩–২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষিত ক্ষুদ্রঋণসংক্রান্ত প্রতিবেদনে ২ হাজার ৯১৩টি শাখা, প্রায় ৬৯ লাখ ৪৯ হাজার ঋণগ্রহীতা এবং প্রায় ৩৯ হাজার ৭২২ জন ক্ষুদ্রঋণকর্মীর তথ্য রয়েছে। একই প্রতিবেদনে সদস্যদের কাছে ঋণস্থিতি দেখানো হয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার ৭০১ কোটি টাকা।
সূত্র: ব্র্যাকের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, ব্র্যাকের ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি একটি বৃহৎ আর্থিক ও শ্রমনির্ভর কার্যক্রম। বিপুলসংখ্যক কর্মী মাঠপর্যায়ে ঋণ বিতরণ, গ্রাহক ব্যবস্থাপনা, কিস্তি সংগ্রহ ও হিসাব পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত।
এখানে অনুসন্ধানের প্রশ্ন হলো, এত বড় কার্যক্রম পরিচালনায় প্রকৃত ব্যয় কত? কর্মীদের বেতন-ভাতা, শাখা পরিচালনা, পরিবহন, প্রযুক্তি, প্রশাসন, ঋণক্ষতি ও অর্থায়নের খরচ আলাদা করে দেখলে কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হয়?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি থেকে সৃষ্ট উদ্বৃত্ত কীভাবে ব্যবহৃত হয়?
ব্র্যাকের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২–২৩ অর্থবছরের ক্ষুদ্রঋণ উদ্বৃত্ত থেকে ২০২৩–২৪ অর্থবছরের উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যবহারের জন্য মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির অনুমোদনক্রমে ৫৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দের তথ্য রয়েছে। ব্র্যাকের উন্নয়ন কার্যক্রমে ক্ষুদ্রঋণের উদ্বৃত্তের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি অনুদান ও অন্যান্য উৎসের অর্থও ব্যবহৃত হয়েছে।
সূত্র: ব্র্যাকের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪।
অতএব, ব্র্যাকের ক্ষেত্রে পুরো উদ্বৃত্ত ব্যক্তিগত মালিক বা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টিত হচ্ছে— এমন অনুমানের ভিত্তি নেই। বরং অনুসন্ধানের লক্ষ্য— উদ্বৃত্তের ব্যবহার, ব্যয়ের যথার্থতা, ব্যবস্থাপনার পারিশ্রমিক এবং উন্নয়ন কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দের স্বচ্ছতা যাচাই করা।
সামাজিক উন্নয়নে উদ্বৃত্ত ব্যয় করা হলে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তবে সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, কোন কর্মসূচিতে কতটা ফল পাওয়া গেছে এবং ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা তৈরিতে কতটা ফিরে এসেছে, তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
৩. আশা: কম ব্যয়ে বিপুল ঋণ কার্যক্রম পরিচালনার মডেল কতটা কার্যকর?
আশা বাংলাদেশের বৃহৎ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোতে আর্থিক কার্যক্রম ও কর্মসূচির তথ্য পাওয়া যায়।
সূত্র: আশার বার্ষিক প্রতিবেদনসমূহ।
আশার মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিচালন ব্যয়ের দক্ষতা। প্রতি ঋণগ্রহীতার বিপরীতে কত টাকা ব্যয় হয়, প্রতি শাখায় কত কর্মী কাজ করেন, কর্মীদের কাজের চাপ কতটা এবং ঋণস্থিতির তুলনায় পরিচালন ব্যয় কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে— এসব সূচক বিশ্লেষণ করা দরকার।
কম পরিচালন ব্যয়কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দক্ষতা বলা যায় না। ব্যয় কমানোর ফলে যদি মাঠকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপানো হয়, গ্রাহকসেবার সময় কমে যায় কিংবা কর্মীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন থাকে, তাহলে সেই দক্ষতার সামাজিক মূল্যও বিবেচনা করতে হবে।
তবে আশার কর্মীদের বেতন বা কাজের চাপ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দিতে হলে কর্মীসংক্রান্ত নথি, কর্মঘণ্টা, বেতন কাঠামো ও মাঠপর্যায়ের সাক্ষ্য প্রয়োজন। কেবল প্রতিষ্ঠানের আকার বা ঋণ আদায়ের পরিমাণ দিয়ে শ্রম শোষণের অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না।
৪. গ্রামীণ ব্যাংক: ঋণ, সঞ্চয় ও আর্থিক দায়ের সম্পর্ক
গ্রামীণ ব্যাংক বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর ঋণ, সঞ্চয়, পরিচালন ব্যয়, অর্থায়ন এবং উদ্বৃত্তের হিসাব আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সূত্র: গ্রামীণ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু ব্যাংক কত ঋণ বিতরণ করেছে তা নয়; ঋণগ্রহীতার আয় ও দায়ের ভারসাম্য কেমন, সঞ্চয়ের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ কতটা এবং কিস্তি দেওয়ার পর পরিবারের হাতে কত অর্থ অবশিষ্ট থাকে।
ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে সঞ্চয় যুক্ত থাকলে সেটি আর্থিক নিরাপত্তা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সঞ্চয়ের শর্ত, উত্তোলনের সুযোগ, ঋণ পরিশোধের দায় এবং পরিবারের নগদ অর্থপ্রবাহ একসঙ্গে পরীক্ষা করা জরুরি।
একই সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের আর্থিক কাঠামো ব্র্যাক বা আশার সঙ্গে এক নয়। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব আইনগত কাঠামো, মালিকানা ও পরিচালনব্যবস্থা বিবেচনায় নিয়ে উদ্বৃত্তের সুবিধাভোগী নির্ধারণ করতে হবে। সব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে একই ধরনের মালিকানাধীন ব্যবসা হিসেবে দেখা সঠিক হবে না।
৫. টিএমএসএস ও বুরো বাংলাদেশ: তুলনামূলক অনুসন্ধানের প্রয়োজন
টিএমএসএস ও বুরো বাংলাদেশও দেশের বৃহৎ ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনেও বড় ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত ঋণ বিতরণ, আদায়, ঋণস্থিতি ও বকেয়ার তথ্য রয়েছে।
সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪–২৫।
তবে এই দুই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট ব্যয়, নিট উদ্বৃত্ত ও কর্মীদের পারিশ্রমিক নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে হলে সংশ্লিষ্ট বছরের আর্থিক বিবরণী এবং বিস্তারিত ব্যয়ের তথ্য প্রয়োজন।
তুলনামূলক অনুসন্ধানে পাঁচটি সূচক একইভাবে হিসাব করা যেতে পারে:
- প্রতি ঋণগ্রহীতার বিপরীতে পরিচালন ব্যয়;
- মোট আয় থেকে কর্মী ব্যয়ের অনুপাত;
- ঋণস্থিতির তুলনায় প্রশাসনিক ব্যয়;
- ঋণক্ষতি ও বকেয়ার প্রবণতা;
- নিট উদ্বৃত্তের পরিমাণ ও ব্যবহার।
একই সংজ্ঞায় হিসাব না করলে প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনা বিভ্রান্তিকর হবে। বিশেষ করে, কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুদানসহ মোট আয়কে অন্য প্রতিষ্ঠানের শুধু ঋণ কার্যক্রমের আয়ের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না।
৬. মাঠকর্মীরা কি দারিদ্র্য বিমোচনের কর্মী, নাকি কিস্তি আদায়ের যন্ত্র?
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো মাঠকর্মীদের শ্রম।
মাঠপর্যায়ের কর্মীরা গ্রাহক সংগ্রহ, ঋণ আবেদন যাচাই, দলীয় বৈঠক, কিস্তি সংগ্রহ, হিসাব সংরক্ষণ, বকেয়া অনুসরণ এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কাজ করেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্বের সঙ্গে যাতায়াত, সময়ের চাপ এবং গ্রাহকের আর্থিক সংকট মোকাবিলার বিষয়ও যুক্ত থাকে।
এখানে প্রশ্ন হলো, এই শ্রমের বিপরীতে কর্মীরা কতটা ন্যায্য পারিশ্রমিক, বিশ্রাম, নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা পান?
যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের দক্ষতা মূলত মাঠকর্মীদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কঠোর লক্ষ্যমাত্রা এবং সীমিত পারিশ্রমিকের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেই মডেলের প্রকৃত সামাজিক ব্যয় হিসাবের মধ্যে আনা প্রয়োজন।
তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য কর্মীদের বেতনপত্র, নিয়োগপত্র, কর্মঘণ্টা, যাতায়াত ব্যয়, লক্ষ্যমাত্রা, কর্মী পরিবর্তনের হার এবং মাঠকর্মীদের সাক্ষাৎকার প্রয়োজন। নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া সব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের একই পরিস্থিতিতে আছেন বলা যায় না।
৭. নিট উদ্বৃত্তের সুবিধাভোগী কারা?
এই অনুসন্ধানের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন এটি।
প্রতিষ্ঠানের মোট আয় থেকে বেতন, প্রশাসন, অর্থায়ন, ঋণক্ষতি ও অন্যান্য স্বীকৃত ব্যয় বাদ দেওয়ার পর যে উদ্বৃত্ত থাকে, তার হিসাব ও ব্যবহার নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কিন্তু উদ্বৃত্ত মানেই ব্যক্তিগত মুনাফা নয়। প্রতিষ্ঠানভেদে তা সংরক্ষিত তহবিল, পুনর্বিনিয়োগ, সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি অথবা অন্য অনুমোদিত খাতে ব্যবহৃত হতে পারে। অন্যদিকে, উদ্বৃত্ত নির্ধারণের আগেই বাদ দেওয়া ব্যবস্থাপনা ব্যয়, উচ্চপর্যায়ের পারিশ্রমিক কিংবা সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেনও পৃথকভাবে পরীক্ষা করা দরকার।
সুতরাং অনুসন্ধানে জানতে হবে:
১. শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেতন, বোনাস ও অন্যান্য সুবিধার মোট পরিমাণ কত?
২. প্রশাসনিক ও কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ব্যয় কীভাবে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে বরাদ্দ করা হয়?
৩. সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সেবাদাতার সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ কীভাবে হয়?
৪. উদ্বৃত্তের কত অংশ সংরক্ষণ, পুনর্বিনিয়োগ ও সামাজিক কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয়?
৫. এসব ব্যয়ের বিপরীতে ঋণগ্রহীতার আয়, সম্পদ ও আর্থিক নিরাপত্তায় কী পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন এসেছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া নিট উদ্বৃত্তের প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্ধারণ করা যাবে না।
৮. পরিচালন ব্যয়ের আড়ালে কি প্রকৃত উদ্বৃত্ত আড়াল হতে পারে?
এটি একটি যাচাইযোগ্য অনুসন্ধানী অনুমান। পরিচালন ব্যয় বেশি দেখানো হলে প্রকৃত উদ্বৃত্ত কম দেখা যেতে পারে। একই ব্যয় একাধিক প্রকল্পে বরাদ্দ, ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য, অস্পষ্ট প্রশাসনিক খাত কিংবা সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেনের মাধ্যমে হিসাবের স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা যায়।
তবে ব্যয় বেশি হলেই অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। বৃহৎ শাখা নেটওয়ার্ক, বিপুল কর্মী, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থায়ন ও ঋণক্ষতির বাস্তব ব্যয়ও থাকতে পারে।
প্রকৃত চিত্র পেতে বার্ষিক প্রতিবেদন ছাড়াও General Ledger, Trial Balance, শাখাভিত্তিক ব্যয়, বেতন তালিকা, ক্রয়াদেশ, ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন এবং নিরীক্ষকের ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ দরকার।
বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির দায়িত্বে রয়েছে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, NGO-MFI খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এমআরএ লাইসেন্স, তদারকি ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করে।
সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক—ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক কাঠামো।
এই কারণে অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি এমআরএর তদারকি, নিরীক্ষা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্যও সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
৯. দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্য মাপা হবে কী দিয়ে?
ক্ষুদ্রঋণের সাফল্য শুধু কত টাকা বিতরণ হয়েছে বা কত টাকা আদায় হয়েছে, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। ঋণগ্রহীতার জীবনমান ও মাঠকর্মীদের শ্রমের মূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে।
একটি কার্যকর মূল্যায়নে দেখা দরকার:
- ঋণ নেওয়ার পর পরিবারের প্রকৃত আয় ও সম্পদ বেড়েছে কিনা;
- ঋণগ্রহীতার পুরোনো ঋণের ওপর নির্ভরতা কমেছে কিনা;
- উৎপাদনশীল উদ্যোগ ও কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে কিনা;
- কিস্তি পরিশোধের পর পরিবারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকছে কিনা;
- মাঠকর্মীদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও কাজের চাপ ন্যায্য কিনা;
- প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্তের ব্যবহার প্রকাশিত ও যাচাইযোগ্য কিনা।
এ ধরনের তথ্য ছাড়া ঋণগ্রহীতার দারিদ্র্য, কর্মীদের শ্রমের মূল্য এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সাফল্যের মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করা অসম্ভব।
ঋণ আদায়ের সাফল্য, নাকি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি?
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে অনেক মানুষ অর্থায়নের সুযোগ পান; একই সঙ্গে ঋণনির্ভরতা, কিস্তির চাপ, কর্মীদের শ্রমের মূল্য এবং উদ্বৃত্তের ব্যবহার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও ওঠে।
সমালোচনার উদ্দেশ্য ক্ষুদ্রঋণের সব কার্যক্রমকে এক কথায় ব্যর্থ বলা নয়। বরং যে প্রতিষ্ঠান দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলে, তার সাফল্য যাচাইয়ের মানদণ্ডও হতে হবে মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জীবনের বাস্তব পরিবর্তন।
যদি ঋণগ্রহীতার আয় ও সম্পদ স্থায়ীভাবে না বাড়ে, মাঠকর্মীরা ন্যায্য পারিশ্রমিক না পান এবং পরিচালন ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হয়, তাহলে শুধু ঋণ বিতরণ ও কিস্তি আদায়ের সাফল্য দিয়ে সেই ব্যবস্থার সামাজিক সার্থকতা প্রমাণ করা যায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই— ক্ষুদ্রঋণের আর্থিক সাফল্য কার জীবনে কতটা উন্নতি আনছে?
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না কেবল প্রতিষ্ঠানের প্রচারপত্রে। প্রয়োজন হবে ঋণগ্রহীতার আয়-ব্যয়ের বাস্তব হিসাব, মাঠকর্মীদের শ্রমের নথি, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং নিট উদ্বৃত্তের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের যাচাইযোগ্য তথ্য।
দারিদ্র্য বিমোচনের দাবি যদি সত্য হয়, তবে সেই দাবির প্রমাণও থাকতে হবে ঋণগ্রহীতার জীবনে, মাঠকর্মীর ন্যায্য পারিশ্রমিকে এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতায়।
