রেস্তোরাঁয় খাবারের মান ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ কর্তৃপক্ষ ফুটপাতের ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসায়ীদের কতটা নিরাপত্তা দেবে? বড় ব্যবসার স্বার্থে দরিদ্র মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা কি অমূলক?
ফলোআপ নিউজ ডেস্ক
ফুটপাতে পিঠা, পুরি, পেঁয়াজু, ফুচকা কিংবা দুপুরের সস্তা খাবার বিক্রি করেন এমন মানুষের বড় অংশই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। তাদের অনেকের পুঁজি কয়েক শো থেকে কয়েক হাজার টাকা। তাদের ব্যবসার জায়গা ছোট, আয় অনিশ্চিত, জীবনযাপন সংগ্রামনির্ভর। এই মানুষগুলোর খাবারের পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ পানি, রান্নার পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের উপায় যদি হয় জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, অপ্রয়োজনীয় লাইসেন্সিং, নিয়মিত পরিদর্শনের ভয় এবং জরিমানার ঝুঁকি, তাহলে খাদ্যনিরাপত্তার উদ্যোগই দরিদ্র মানুষের জীবিকার ওপর নতুন চাপ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নতুন প্রবিধানমালায় রাস্তার পাশের খাবারের ব্যবসাকেও নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, এর মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসা শনাক্ত করা, মান পর্যবেক্ষণ করা এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। উদ্দেশ্যটি নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ব্যবস্থা বাস্তবে কীভাবে পরিচালিত হবে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর এর ব্যয় কতটা পড়বে এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
রেস্তোরাঁর খাবারে মান নিয়ন্ত্রণ কোথায়?
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক রেস্তোরাঁয় খাবারের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বেশিরভাগ রেস্তোরাঁর খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ, কোথাও অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘর, কোথাও বাসি উপকরণ কিংবা সংরক্ষণব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যকারিতা বিচার করতে হলে এসব ঝুঁকি প্রতিরোধে তাদের বাস্তব সাফল্য পরিমাপ করতে হবে।
কতটি রেস্তোরাঁ নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়? কতটি নমুনা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়? কতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? পুনরায় একই অপরাধ করলে কী শাস্তি হয়েছে? ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তির হার কত? এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন।
বড় রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে যদি খাদ্যের নিরাপত্তা, মূল্য এবং ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না যায়, তাহলে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনের আওতায় আনার মাধ্যমে ঠিক কোন সমস্যার সমাধান হবে— সেটি স্পষ্ট করা দরকার।
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির স্বার্থের প্রশ্ন
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনিবন্ধিত ও অস্বাস্থ্যকর রাস্তার খাবারের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। <Cite refs={[“turn181201search5”]}/>
এই অবস্থান থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসেঃ বড় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের সংগঠন যখন রাস্তার খাবারের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের দাবি তোলে, তখন সরকারের নীতিনির্ধারকদের উচিৎ সেই দাবির জনস্বাস্থ্যগত যৌক্তিকতা এবং এর সম্ভাব্য বাণিজ্যিক প্রভাব— দুটিই আলাদাভাবে যাচাই করা।
তবে সমিতির দাবি এবং সরকারের নতুন বিধিমালার মধ্যে সম্পর্ক থাকলেই সমিতি বিধিমালাটি চাপিয়ে দিয়েছে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এবং সরাসরি তা বলা দৃষ্টিকটু। এর পক্ষে প্রমাণ প্রয়োজন। কারা বিধিমালার খসড়া তৈরি করেছেন, কোন কোন সংগঠনের সঙ্গে পরামর্শ হয়েছে, কারা কোন প্রস্তাব দিয়েছেন এবং চূড়ান্ত বিধানে সেসব প্রস্তাব কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে— এই নথিগুলোই প্রকৃত স্বার্থের সংঘাত শনাক্ত করতে সাহায্য করবে।
সমিতি যদি সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে ক্ষুদ্র প্রতিযোগীদের বাজার থেকে সরিয়ে দিতে চায়, সেটি গুরুতর অভিযোগ। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে যোগাযোগের নথি, বৈঠকের কার্যবিবরণী, প্রস্তাব, সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়নের ধরন পরীক্ষা করা জরুরি।
নিবন্ধন থেকে চাঁদাবাজির ঝুঁকি: আশঙ্কাটি কোথায়?
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিবন্ধন করানো এবং কোনো ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য হওয়া এক বিষয় নয়। সরকারি নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলেও কোনো বেসরকারি সমিতির সদস্যপদ বাধ্যতামূলক হয়ে যায় না— যদি না তার পক্ষে পৃথক কোনো বৈধ বিধান থাকে।
কিন্তু বাস্তবে যদি কোনো সংগঠন নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করে দেওয়ার নামে ব্যবসায়ীদের সদস্য হতে বাধ্য করে, নির্ধারিত ফির বাইরে টাকা দাবি করে কিংবা সদস্য না হলে ব্যবসা করতে অসুবিধা সৃষ্টি করে, তাহলে সেটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও সম্ভাব্য চাঁদাবাজির প্রশ্ন তৈরি করবে।
তাই সরকারের উচিৎ নিবন্ধনকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, সহজ এবং সরাসরি পরিচালিত করা। এবং তাদের কাছে গিয়ে নিবন্ধন করানো। ফি থাকলে তা প্রকাশ্য তালিকায় থাকতে হবে। অর্থ গ্রহণের বিপরীতে সরকারি রসিদ দিতে হবে। কোনো বেসরকারি সমিতি যেন নিবন্ধনের দালাল বা অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ফুটপাতের খাবার কি কেবল দরিদ্র মানুষের জন্য?
ফুটপাতের খাবার বাংলাদেশের নগর অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শ্রমিক, রিকশাচালক, শিক্ষার্থী, নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ এবং সীমিত আয়ের পরিবারের জন্য এসব খাবার অনেক সময় সাশ্রয়ী বিকল্প। এখানে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়।
এই ব্যবসাগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল বা প্রশাসনিকভাবে দুরূহ করে তোলা হলে ছোট ব্যবসায়ীরা বাজার ছেড়ে দিতে পারেন। তাদের জায়গায় বড় পুঁজি, বেশি অবকাঠামো এবং বেশি পরিচালন ব্যয়সম্পন্ন ব্যবসা প্রবেশ করলে সস্তা খাবারের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে খাদ্যের দাম বাড়বে, মান যে দোকানেও নেই সেটি অনস্বীকার্য।
অন্যদিকে, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা গেলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা— উভয়েই লাভবান হবেন। সুতরাং সমাধান ফুটপাতের খাবারের ব্যবসা বন্ধ করা নয়; বরং নিরাপদ ও বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা।
কী করা উচিৎ?
প্রথমত, ক্ষুদ্র ভ্রাম্যমাণ খাদ্য ব্যবসার জন্য সহজ ও স্বল্পব্যয়ী নিবন্ধনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যে শ্রেণির জন্য বিনামূল্যে নিবন্ধনের ঘোষণা রয়েছে, তাদের কাছ থেকে কোনো অঘোষিত অর্থ নেওয়া যাবে না।
দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খাবার ঢেকে রাখা, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত রান্নার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিতে হবে। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে সাশ্রয়ী পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষকে বড় রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং ক্ষুদ্র রাস্তার খাবারের দোকান— সব ক্ষেত্রেই ঝুঁকিভিত্তিক ও স্বচ্ছ পরিদর্শন চালাতে হবে। ব্যবসার আকার নয়, খাদ্যজনিত ঝুঁকি হওয়া উচিত তদারকির প্রধান বিবেচনা।
চতুর্থত, নিবন্ধন ও পরিদর্শনের নামে ঘুষ, অনানুষ্ঠানিক ফি, হয়রানি এবং সমিতির বাধ্যতামূলক সদস্যপদ চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
পঞ্চমত, বিধিমালা তৈরির প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত প্রকাশ করতে হবে। রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি, ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ভোক্তা অধিকার সংগঠন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ— সব পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করে বাস্তবসম্মত নীতি তৈরি করতে হবে।
খাদ্যনিরাপত্তা, নাকি বাজার নিয়ন্ত্রণ?
ফুটপাতের খাবার নিরাপদ হওয়া দরকার। কিন্তু নিরাপদ খাবারের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জীবিকা সংকুচিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের নতুন সুযোগ তৈরি করা কিংবা ভোক্তাকে আরও ব্যয়বহুল খাবারের দিকে ঠেলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সরকারের কাছে তাই প্রশ্ন: নতুন নিবন্ধনব্যবস্থা কি সত্যিই খাবারের মান উন্নত করবে? নাকি বাস্তবায়নের দুর্বলতা ও প্রশাসনিক বিবেচনাহীনতার কারণে এটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়াবে?
আরেকটি প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ— রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি কি কেবল নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে রাস্তার খাবারের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, নাকি তাদের দাবির পেছনে যাচাইযোগ্য জনস্বাস্থ্যগত যুক্তি রয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, নথি, তথ্য, পরিদর্শনের ফলাফল এবং বাস্তব প্রয়োগের স্বচ্ছতা দিয়ে নির্ধারণ করতে হবে।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; কিন্তু সেই নিরাপত্তার নামে দরিদ্র মানুষের জীবিকা, সাশ্রয়ী খাবারের প্রাপ্যতা এবং বাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ কেড়ে নেওয়া যাবে না।
