Headlines

ফেসবুকে ইনকামের ধান্দা: একজনের লাভ, দেশের কতটা লস?

ফেসবুকে এখন অনেকের প্রধান চিন্তা—কীভাবে ইনকাম করা যায়।

ভিডিও বানাতে হবে, রিল বানাতে হবে, ফলোয়ার বাড়াতে হবে, ভিউ আনতে হবে। কনটেন্টের উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে—কিছু বলার জন্য নয়, কিছু থেকে আয় করার জন্য।

এটি ভালো না মন্দ—সেই বিচার এখানে মূল বিষয় নয়। বিষয়টি হলো, একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক কাঠামো মানুষকে লাভের সম্ভাবনা দেখিয়ে একটি নির্দিষ্ট আচরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সহজ করে বললে, এটি এমন এক অর্থনীতি যেখানে মানুষের সময়, মনোযোগ ও আকাঙ্ক্ষা—সবই পণ্য।

কিন্তু ব্যক্তিগত আয়ের এই হিসাবের বাইরে যদি দেশের হিসাবটি করি?

তখন গল্পটা একটু অন্যরকম।

এক লাখ মানুষ চেষ্টা করছে, আয় করছে কয়জন?

ধরুন, এক লাখ মানুষ ফেসবুক থেকে আয় করার চেষ্টা করছে।

কেউ স্মার্টফোন কিনেছে। কেউ ভালো ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, লাইট বা কম্পিউটার ব্যবহার করছে। সবাই ইন্টারনেট কিনছে। বিদ্যুৎ খরচ করছে। ভিডিও বানাচ্ছে, এডিট করছে। সবচেয়ে বড় কথা, সবাই নিজের সময় ব্যয় করছে।

ধরুন, এই এক লাখ মানুষ গড়ে ১০ হাজার টাকা করে ফেসবুককেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করল।

তাহলে মোট ব্যয়—

১,০০,০০০ × ১০,০০০ = ১০০ কোটি টাকা।

এখন ধরা যাক, এই এক লাখ মানুষের মধ্যে একজন শেষ পর্যন্ত ১ কোটি টাকা আয় করলেন।

ব্যক্তিগত হিসাবে তিনি সফল।

কিন্তু দেশের হিসাবে?

সরল উদাহরণে ১০০ কোটি টাকার ব্যয়ের বিপরীতে একজনের ১ কোটি টাকা আয়কে ১০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক অর্জন বলা যায় না।

বরং প্রশ্ন করতে হয়—এই ১০০ কোটি টাকার কতটা দেশে থাকল, কতটা আমদানি ও বিদেশি প্রযুক্তির পেছনে গেল, কতটা বিদেশি প্ল্যাটফর্মের কাছে গেল এবং কতটা আবার দেশের অর্থনীতিতে ফিরে এল?

অবশ্যই বাস্তব হিসাব এত সরল নয়। কারণ ইন্টারনেট ব্যবহারে দেশীয় টেলিকম কোম্পানির আয় আছে, কর আছে, স্থানীয় কর্মসংস্থান আছে, কনটেন্ট নির্মাতার আয় আছে। তাই পুরো ১০০ কোটি টাকাকে সরাসরি দেশের ক্ষতি বলা যাবে না।

কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়—

এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেশের নিট মূল্য সৃষ্টি কতটা?

ফেসবুক চালাতেও টাকা লাগে

ফেসবুককে অনেক সময় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এটি বিনা খরচের একটি প্ল্যাটফর্ম।

আসলে তা নয়।

ফেসবুক ব্যবহার করতে স্মার্টফোন লাগে। ইন্টারনেট লাগে। ডাটা লাগে। বিদ্যুৎ লাগে। কনটেন্ট তৈরির জন্য ক্যামেরা, কম্পিউটার, মাইক্রোফোন, সফটওয়্যার ও নানা ধরনের সরঞ্জাম লাগে।

এসবের একটি বড় অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আমদানিনির্ভর।

অর্থাৎ ফেসবুক থেকে আয় করার জন্যও দেশের মানুষকে একটি বড় অর্থনৈতিক অবকাঠামো ব্যবহার করতে হচ্ছে, যার সঙ্গে বিদেশি পণ্য ও প্রযুক্তির সম্পর্ক রয়েছে।

এখানে তাই শুধু প্রশ্ন নয়—কে কত আয় করল?

প্রশ্ন হলো—এই আয় তৈরি করতে দেশের মোট কত টাকা ব্যয় হলো?

একবার ভাবুন—পৃথিবীর সবাই যদি একটি করে টিভি চ্যানেল হয়

একবার ভাবুন তো—পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ যদি একটি করে টিভি চ্যানেল খুলে বসে।

প্রত্যেকের স্টুডিও আছে।

প্রত্যেকে অনুষ্ঠান বানাচ্ছে।

প্রত্যেকে লাইভ করছে।

প্রত্যেকে দর্শক চাইছে।

কিন্তু দর্শক কোথায়?

সবাই যদি সম্প্রচারক হয়, তাহলে সবাইকে দেখবে কে?

ফেসবুকের বর্তমান কনটেন্ট অর্থনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য অনেকটা এমন।

রান্না থেকে নাচ, ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাজনৈতিক মতামত, হাস্যরস থেকে কান্না, দুর্ঘটনা থেকে ঝগড়া—সবকিছুই কনটেন্ট।

কারণ এখন মানুষের মনোযোগই বাজার।

যে কনটেন্ট মানুষকে বেশি সময় ধরে রাখতে পারে, সেটি বেশি ভিউ পেতে পারে। বেশি ভিউ মানে বেশি বিজ্ঞাপন, আর বিজ্ঞাপন মানে সম্ভাব্য আয়।

কিন্তু এখানে একটি মৌলিক সমস্যা আছে।

যে কনটেন্ট বেশি দেখা হয়, সেটি যে সমাজের জন্য বেশি মূল্যবান—এমন কোনো অর্থনৈতিক সূত্র নেই।

জ্ঞানসমৃদ্ধ কনটেন্ট ভাইরাল নাও হতে পারে।

অর্থহীন কনটেন্ট লাখ লাখ মানুষ দেখতে পারে।

সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিবেদন হয়তো কয়েক হাজার মানুষ দেখবে, অথচ কোনো চটকদার ভিডিও কয়েক কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে।

ফলে সামাজিক মূল্য আর বাজারমূল্য এক জিনিস থাকে না।

বিজ্ঞাপনের টাকাও তো একটি অর্থনৈতিক প্রশ্ন

আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ—বিজ্ঞাপন।

বাংলাদেশের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এখন তাদের বিজ্ঞাপনের টাকা ফেসবুকসহ আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যয় করছে।

আপনি ফেসবুকে একটি ভিডিও বানালেন। আপনার ভিডিওর পাশে বিজ্ঞাপন দেখানো হলো।

আপনি ভিউ পেলেন।

প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞাপন পেল।

বিজ্ঞাপনদাতা তার পণ্য প্রচার করল।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিজ্ঞাপনের অর্থের কত অংশ বাংলাদেশের মিডিয়া অর্থনীতির ভেতরে থাকল?

দেশের সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ম্যাগাজিন এবং স্থানীয় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপনের অর্থ থেকে বঞ্চিত হলে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও কমে।

একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সাংবাদিক নিয়োগ করে, অফিস চালায়, বিদ্যুৎ বিল দেয়, সাংবাদিককে মাঠে পাঠায়, স্থানীয় ব্যবসা থেকে নানা ধরনের সেবা নেয়।

অর্থাৎ তার আয় আবার দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ঘুরে বেড়ায়।

অন্যদিকে একটি বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কাছে বিজ্ঞাপনের অর্থ গেলে তার বড় অংশ একটি বৈশ্বিক ব্যবসায়িক কাঠামোর মধ্যে চলে যায়।

দুটো ক্ষেত্রেই বিজ্ঞাপনদাতার কাছে বিষয়টি হয়তো শুধু ‘ডিজিটাল বিজ্ঞাপন’।

কিন্তু দেশের অর্থনীতির ভেতরে অর্থের ঘূর্ণন এক রকম নয়।

ব্যক্তিগত লাভ আর জাতীয় লাভ এক জিনিস নয়

এখানেই আসল প্রশ্ন।

একজন ফেসবুক থেকে ১ কোটি টাকা আয় করলেন—এটি তার আয়।

কিন্তু সেই ১ কোটি টাকা তৈরি হওয়ার আগে যদি এক লাখ মানুষ সম্মিলিতভাবে ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে, তাহলে শুধু ওই একজনের আয় দেখলে পুরো অর্থনৈতিক চিত্র দেখা হবে না।

কার টাকা কোথায় গেল?

কত টাকা দেশে থাকল?

কত টাকা আমদানির পেছনে গেল?

কত টাকা বিদেশি প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্মের কাছে গেল?

কত টাকা স্থানীয় ব্যবসায় ফিরে এল?

কত টাকা স্থানীয় মিডিয়া থেকে সরে গেল?

আর কত মানুষের কত সময় ব্যয় হলো?

জাতীয় অর্থনীতির প্রশ্নগুলো এখানেই।

সবচেয়ে বড় খরচ—সময়

টাকার হিসাবের চেয়েও বড় একটি হিসাব আছে।

সময়।

এক লাখ মানুষ যদি প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা কনটেন্ট বানায়, ভিডিও এডিট করে, লাইভ করে, ভিউ দেখে, কমেন্টের উত্তর দেয়, অন্যের কনটেন্ট দেখে এবং অ্যালগরিদমের সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করে—তাহলে সেই সময়ের মূল্য কত?

এই সময়ের একটি অংশ যদি শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদনশীল ব্যবসা, স্থানীয় সাংবাদিকতা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, কৃষি বা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজে ব্যয় হতো—তার সামাজিক মূল্য কী হতে পারত?

এর সঠিক হিসাব করা কঠিন।

কিন্তু তাই বলে সময়ের অর্থনৈতিক মূল্য নেই—এমন নয়।

মানুষের সময়ও একটি জাতীয় সম্পদ।

তাহলে কি ফেসবুক খারাপ?

না।

ফেসবুক মানুষের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে। ব্যবসার সুযোগ তৈরি করেছে। অনেক উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতা এখান থেকে আয় করছেন। ছোট ব্যবসা প্রচার করতে পারছে। অনেক মানুষ নিজের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে।

কিন্তু কোনো প্ল্যাটফর্মের উপযোগিতা আর তার অর্থনৈতিক কাঠামোর সমালোচনা—দুটি আলাদা বিষয়।

সমস্যা ফেসবুক আছে বলে নয়।

সমস্যা তখন, যখন “আপনিও আয় করতে পারবেন”—এই প্রলোভনটি লাখ লাখ মানুষকে একই অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেয়, অথচ সেই আয়ের সুযোগ সবার জন্য সমান নয়।

এখানে এমএলএম ব্যবসার সঙ্গে একটি তুলনা করা যায়। ব্যবসায়িক কাঠামো এক নয়, কিন্তু দুটির ক্ষেত্রেই মানুষের সামনে ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনাকে বড় করে দেখানো হতে পারে।

ফেসবুকের ক্ষেত্রেও মানুষকে বলা হয়—

মোবাইল আছে?

ইন্টারনেট আছে?

তাহলে আপনিও কনটেন্ট বানান।

আপনিও আয় করুন।

ফলে এক লাখ মানুষ চেষ্টা করতে পারে।

কিন্তু সবাই আয় করবে না।

অল্প কিছু মানুষ বড় আয় করবে, আর বিপুলসংখ্যক মানুষ সেই সম্ভাবনার পেছনে নিজেদের সময়, অর্থ ও মনোযোগ ব্যয় করবে।

শেষ প্রশ্নটা তাই অন্য

ফেসবুক থেকে একজন কত টাকা আয় করলেন—এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হতে পারে—

একজনের আয় তৈরি করতে সমাজ মোট কত টাকা ও কত সময় ব্যয় করল?

একজনের লাভের হিসাব আমরা খুব সহজে দেখতে পাই।

তার ভিডিওর ভিউ দেখা যায়।

তার আয় দেখা যায়।

তার ফলোয়ার দেখা যায়।

কিন্তু যে লাখ লাখ মানুষ একই স্বপ্ন নিয়ে সময় ও টাকা ব্যয় করছে, তাদের সম্মিলিত খরচের হিসাব কোথায়?

যে বিজ্ঞাপনের টাকা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে যাচ্ছে, তার অর্থনৈতিক প্রভাবের হিসাব কোথায়?

যে সময় মানুষ কনটেন্টের পেছনে দিচ্ছে, তার সামাজিক মূল্য কত?

আর দেশের নিজস্ব মিডিয়া, ব্যবসা ও উৎপাদনশীল খাত থেকে যে অর্থ ও মনোযোগ সরে যাচ্ছে, তার হিসাবই বা কে করছে?

ব্যক্তি হয়তো লাভ করছেন।

কেউ কেউ সত্যিই সফলও হচ্ছেন।

কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প দিয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক হিসাব শেষ করা যায় না।

কারণ—

ব্যক্তির লাভ সবসময় দেশের লাভ নয়।

আর কোনো ব্যবসায়িক মডেল মানুষকে যত বেশি লাভের প্রলোভন দেখাবে, তত বেশি জরুরি হয়ে উঠবে প্রশ্নটি—

লাভটা কার, আর খরচটা কার?