প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং ওপার বাংলা – পর্ব ২ // তাপস দাস

কোলকাতা
১৯৭১
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ঘাতক আল বদরের হাতে শহীদ বুদ্ধিজীবী ও কথা সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার।

প্রেসিডেন্সি বা হিন্দু কলেজের ২০০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে সাজিয়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। তারমধ্যে একটি পরিকল্পনা হলো— বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ভবনের গাত্রে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পড়াশোনা অথবা অধ্যাপনা করেছেন এবং পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও সুনাম অর্জন করেছেন এমন গুণীব্যক্তিদের নাম লেখা। সেখানে অমর্ত্যসেন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি আবু সাইদ চৌধরী— এরকম অনেক মানুষের নাম খোদাই করা আছে। এই নামগুলির মধ্যে একটি নাম শহীদুল্লাহ কায়সার।

এই লেখার প্রধান বিষয় শহীদুল্লাহ কায়সার, যিনি ১৯৪৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। আমি শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম সম্পর্কে প্রথম অবগত হই সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘দেশভাগ এবং দেশত্যাগ’ বইটি পড়তে গিয়ে। ১৯৪৬-এর দাঙ্গা প্রসঙ্গে সেখানে লিখতে গিয়ে সন্দীপ মহাশয় লিখেছেন, “এই দাঙ্গার পর বহু গুণী ব্যক্তি কোলকাতা ছেড়ে চলে যান তার মধ্যে একজন শহীদুল্লাহ কায়সার।” কায়সার সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “চলে গেলেন বামপন্থী কর্মী, পরে সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারও। ১৪ আগস্ট কোলকাতার এক গোপন বৈঠকে তারা সিদ্বান্ত নিয়েছিলেন— পূর্ববঙ্গ থেকেই এবার বামপন্থী আন্দোলনের কাজ চালাতে হবে। ছেচল্লিশের কোলকাতা দাঙ্গা, দেশভাগ আর পূর্ববঙ্গের কোনো কোনো অঞ্চল হতে হিন্দুদের সদলবলে চলে আসার কাহিনী শহীদুল্লাহ লিখে রেখেছেন তার ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসের দ্বিতীয় খন্ডে।” এই ছিলো শহীদুল্লাহ কায়সার সম্পর্কে আমার প্রাথমিক ধারণা। এরপরে, তার ‘সংশপ্তক’ বইটি পড়ে ফেলেছিলাম। তার সঙ্গে আমার দ্বিতীয় পরিচয় ঘটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটি পড়তে গিয়ে। সেখানে ৪ জুন ১৯৬৬-এ কারাগারে বসে বঙ্গবন্ধু লিখছেন, “বন্ধু শহীদুল্লা কায়সারের সংশপ্তক বইটি পড়তে শুরু করেছি। লাগছে ভালই…..।”

তারপর আমার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে শহীদুল্লাহ কায়সারের পরিবারের আর এক কৃতী ব্যক্তিত্ব শাহরিয়ার কবিরের সঙ্গে। সম্পর্কে শহীদুল্লাহ ছিলেন শাহরিয়ার কবিরের জেঠুর বড় ছেলে এবং তার খুব আপন একজন মানুষ। এভাবেই আর একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো প্রেসিডেন্সি কলেজের সাথে আমার এবং ওপার বাংলার। পরবর্তীতে শহীদুল্লাহ কায়সার সম্পর্কে আমার জানার ভাণ্ডার পূর্ণ করে এবারের বাংলাদেশের একুশে বইমেলা থেকে সদ্য প্রকাশিত শাহরিয়ার কবিরের ‘আমার একাত্তর’ বইটি। সেখানে শাহরিয়ার কবির লিখেছেন, “জেঠু কট্টর ধার্মিক হলেও তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান আমাদের বড়দা শহীদুল্লাহ কায়সার কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র থাকাকালেই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়ে ছিলেন। …. ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে বড়দাকে গ্রেপ্তার করে কয়েক বছর কারাগারে আটকে রেখেছিলেন। এই কারাবাসের কারণেই হয়তো সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ শহীদুল্লাহ কায়সার বাংলাদেশের একজন বরেণ্য কথা শিল্পীতে রূপান্তরিত হতে পেরেছিলেন। তাঁর ‘রাজবন্দির রোজনামচা’ থেকে আরম্ভ করে উপন্যাস ‘সারেং বউ’, ‘সংশপ্তক’ সবই কারাগারে থাকাকালীন লেখা। … ৭১-এর ডিসেম্বরে জামায়াতে ইসলামীর আলবদরের ঘাতকরা তাকে ধরে নিয়ে যায়, তিনি আর ফিরে আসেননি।” এইভাবেই চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছিলো প্রেসিডেন্সি কলেজের এই কৃতী। এছাড়া তার সম্পর্কে আর যেসব বিষয় জানা যায়— ১৯৫১ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে তিনি অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেন এবং ৩ জুন গ্রেফতার হয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাভোগ করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি পুনরায় গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ হন। ১৯৫৮ সালের ১৪ অক্টোবর সামরিক শাসক কর্তৃক তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন এবং প্রায় চার বছর কারাভোগের পর ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি লাভ করেন।

শহীদুল্লাহ কায়সার বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে থেকে তাদেরকে নানানভাবে সহযোগীতা করতেন। তার বাসা ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তার বাসা থেকে প্রতিদিন মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার তৈরী করে দেওয়া হত। দিনের বেলা বিভিন্ন জায়গা এবং বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে টাকা ও ঔষধ সংগ্রহ করে রাতে তা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিতেন।

চলবে …


লেখকঃ গবেষক, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ