Headlines

হেফাজতে মৃত্যু: সাথানকুলামের মতো ঘটনা কি বাংলাদেশেও নিত্যদিনের বাস্তবতা?

ভারতের তামিলনাড়ুর সাথানকুলামে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু এবং সেই ঘটনায় এক নারী কনস্টেবলের সাহসী সাক্ষ্যে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি—এই ঘটনা উপমহাদেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা এবং ভেতর থেকে সত্য বলার সাহস—এসব প্রশ্ন এখন নতুন করে সামনে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশে কি এমন দৃষ্টান্ত সম্ভব? নাকি এখানেও হেফাজতে মৃত্যু একটি ‘চেনা কিন্তু অমীমাংসিত’ বাস্তবতা হয়েই রয়ে গেছে?

বাংলাদেশে হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ নতুন নয়। বরং গত এক দশকে বিভিন্ন সময় ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২০ সালে সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হান আহমদের মৃত্যু দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে এবং পরবর্তীতে একাধিক পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হয়। একইভাবে ২০১৪ সালে ঢাকায় জনি নামের এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় আদালত সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের শাস্তি দেয়—যা এ ধরনের মামলায় বিরল হলেও গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০১৫ সালে ডিবি পুলিশের হেফাজতে ব্যবসায়ী তানভীর ইসলামের মৃত্যুও প্রশ্ন তোলে—আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে আটক একজন নাগরিক কতটা নিরাপদ?

এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়—এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্তের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং দ্রুত বিচার নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। ফলে ভুক্তভোগীর পরিবার ন্যায়বিচার পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে, আর অনেক ঘটনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আড়ালে চলে যায়।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে—যা মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যদিও এসব ঘটনায় সব তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি বা অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত চলমান, তবুও বিষয়টি জনমনে প্রশ্ন তুলছে—রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা কি নিশ্চিত?

অন্যদিকে, এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও বিরোধী দল বিএনপি একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিল। তাদের দাবি ছিল, গ্রেপ্তারের পর অনেক নেতাকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছেন। যদিও সরকার পক্ষ অনেক ক্ষেত্রে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবুও মানবাধিকার সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভুক্তভোগীর রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও অভিযোগের ধরন প্রায় একই থেকে যায়। অর্থাৎ, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগ একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়—যা শুধু কোনো একটি সরকারের সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন।

সাথানকুলামের ঘটনায় কনস্টেবল রেবতীর ভূমিকা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। নিজের সহকর্মীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্য প্রকাশ করা সহজ কাজ নয়। পেশাগত ঝুঁকি, সামাজিক চাপ—সবকিছু উপেক্ষা করে তার সাক্ষ্যই শেষ পর্যন্ত বিচার নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছে। বাংলাদেশে এমন উদাহরণ খুব কমই দেখা যায়। অনেক সময় অভ্যন্তরীণ চাপ, চাকরি হারানোর ভয় কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে কেউ সামনে আসতে চান না—ফলে সত্য চাপা পড়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনার বিচার করলেই হবে না; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পুরো প্রক্রিয়াকে নজরদারির আওতায় আনা, সিসিটিভি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা, স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা—এসব পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও মানসিকতা পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, “জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে।” একটি ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত যেমন বহু অন্যায়ের পথ বন্ধ করতে পারে, তেমনি বিচারহীনতা নতুন অন্যায়ের জন্ম দেয়।

সাথানকুলামের ঘটনা তাই শুধু ভারতের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ যদি এই বার্তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তবে হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো কমানো সম্ভব। অন্যথায় প্রশ্নটি বারবারই ফিরে আসবে—রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা একজন মানুষ আসলে কতটা নিরাপদ?