নিজস্ব প্রতিবেদক
নাফ নদীর তীরে উখিয়া ও টেকনাফে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল পোল্ডার পুনর্বাসন প্রকল্প। ২০১৮ সালে অনুমোদনের সময় যার ব্যয় ছিল প্রায় ১৪২ কোটি টাকা, সেই প্রকল্পের প্রথম সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। নির্ধারিত সময়েও কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পটি এখন দ্বিতীয় সংশোধিত পর্যায়ে। আর চলতি বছরই প্রকল্পটি নিয়ে নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ—আইএমইডি।
এ কারণেই নাফ পোল্ডার প্রকল্পটি এখন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠেছে—এমন মন্তব্যকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পটির পরিকল্পনা, ব্যয়, বাস্তবায়ন ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে।
যে প্রকল্পের শুরু ১৪১ কোটি টাকায়
সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির নাম—‘কক্সবাজার জেলার বাংলাদেশ-মায়ানমার এ সীমান্ত নিরাপত্তা উন্নত করার জন্য উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় নাফ নদী বরাবর পোল্ডারসমূহ (৬৭/এ, ৬৭, ৬৭/বি এবং ৬৮) পুনর্বাসন প্রকল্প।’
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়।
প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। পরে প্রকল্পটি প্রথম সংশোধন করা হয়। প্রথম সংশোধিত প্রকল্পের সরকারি ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩৬৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।
অর্থাৎ প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রথম সংশোধনেই প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২২৭ কোটি টাকা, বা আড়াই গুণের বেশি।
একবার সংশোধনেও শেষ হয়নি
প্রথম সংশোধিত প্রকল্পের মেয়াদও শেষ হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটি সেখানেই শেষ হয়নি।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ নথিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকল্পটির পুনর্গঠিত আরডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। সেখানে প্রথম সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় ৩৬৮ কোটি ৬৬ লাখ ৭১ হাজার টাকা উল্লেখ করে বিষয়টি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছিল।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন আইএমইডি প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধিত সংস্করণের ওপর নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ মূল অনুমোদনের প্রায় নয় বছর পরও প্রকল্পটি সরকারি পরিবীক্ষণ ও সংশোধনের পর্যায়ে রয়েছে।
পোল্ডার কেন?
পোল্ডার হচ্ছে নদী বা সমুদ্রের পানি, জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার পানি থেকে কোনো এলাকাকে রক্ষার জন্য বাঁধ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, রেগুলেটর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর সমন্বিত ব্যবস্থা।
নাফ নদীর তীরবর্তী এসব পোল্ডারের পুরোনো অবকাঠামো পুনর্বাসনের পাশাপাশি প্রকল্পটির সরকারি নামেই সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়টি রয়েছে।
অর্থাৎ এটি কেবল পানি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এর সঙ্গে সীমান্ত এলাকার যোগাযোগ ও নিরাপত্তা অবকাঠামোর বিষয়টিও যুক্ত।
বাঁধের পাশাপাশি সড়ক ও পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো
প্রকল্পটির বিভিন্ন দরপত্রে পোল্ডার এলাকায় সড়ক ও পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর কাজের তথ্য পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দরপত্রে পোল্ডার ৬৮ এলাকায় প্রায় ১৪ কিলোমিটার, ৬৭/বি ও ৬৭ এলাকায় প্রায় ১০.৫ কিলোমিটার এবং ৬৭/এ এলাকায় প্রায় ৮.৫৩ কিলোমিটার এইচবিবি সড়কের প্যাকেজের তথ্য পাওয়া যায়।
এ ছাড়া পোল্ডার ৬৭/এ এলাকায় রেগুলেটর এবং বিভিন্ন এলাকায় কালভার্ট নির্মাণের কাজও প্রকল্পের আওতায় এসেছে।
ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সঙ্গে বাঁধ পুনর্বাসনের পাশাপাশি যোগাযোগ ও পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোও যুক্ত হয়েছে।
প্রশ্নটা শুধু ব্যয়ের নয়
নাফ পোল্ডার প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা খরচ হয়েছে’—এটি নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত ছিল?
২০১৭ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। পরে প্রথম সংশোধনে ব্যয় বেড়ে ৩৬৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। তারপরও প্রকল্পটি শেষ হয়নি।
এখন আবার দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্প নিয়ে আইএমইডি নিবিড় পরিবীক্ষণ করেছে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—প্রাথমিক ডিপিপি তৈরির সময় প্রকল্পের কাজ, ব্যয় ও বাস্তবায়নকাল যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল কিনা।
আইএমইডির নজরে কেন প্রকল্পটি?
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ বছরে বিভিন্ন চলমান ও সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ করে। নাফ পোল্ডার প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত সংস্করণের ওপরও ২০২৬ সালে এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদনটি অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, কাজের বাস্তবায়ন, ব্যয়, পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি যাচাই করার সুযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ এখন প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্টভাবে করা যায়—
কাগজে প্রকল্পের যে অগ্রগতি, মাঠে তার বাস্তব চিত্র কী?
প্রায় এক দশকের প্রকল্প, শেষ কোথায়?
নাফ পোল্ডার প্রকল্পের সময়রেখা দেখলে চিত্রটি স্পষ্ট।
২০১৭: প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু।
২০১৮: মূল প্রকল্প অনুমোদন।
২০২০: মূল মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
২০২৫: প্রথম সংশোধিত প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
২০২৫: পুনর্গঠিত আরডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।
২০২৬: দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্পের ওপর আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ।
অর্থাৎ প্রায় এক দশকের কাছাকাছি সময় ধরে চলা এই প্রকল্প এখনো প্রশ্নের বাইরে যেতে পারেনি।
‘গলার কাঁটা’ কেন—উত্তর খুঁজতে হবে মাঠে
নাফ পোল্ডার প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে সীমান্তবর্তী এলাকার বাস্তব ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি। নাফ নদীর তীরবর্তী এলাকায় বাঁধ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একইভাবে সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য যোগাযোগ অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
কিন্তু একটি প্রয়োজনীয় প্রকল্প কত দিনে, কত ব্যয়ে এবং কী মানে শেষ হচ্ছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
১৪১ কোটি টাকার প্রাথমিক প্রকল্প প্রথম সংশোধনে ৩৬৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকায় পৌঁছানো, নির্ধারিত মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় সংশোধিত পর্যায়ে পৌঁছানো—এই বাস্তবতাই প্রকল্পটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এখন তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ২০২৬ সালের আইএমইডি প্রতিবেদনে প্রকল্পটির বিষয়ে কী কী পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, মাঠপর্যায়ে কত শতাংশ কাজ বাস্তবে সম্পন্ন হয়েছে, কোন কোন কাজ অসম্পূর্ণ, কোথায় কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং সংশোধনের কারণ হিসেবে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য জনসমক্ষে আনা।
কারণ নাফ পোল্ডার শুধু একটি বাঁধ নির্মাণের গল্প নয়। এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, সরকারি অর্থ ব্যয় এবং দীর্ঘসূত্রতার একটি বড় সরকারি প্রকল্পের গল্প।
