দেশের কাস্টমস প্রশাসনে বদলি, গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে পদায়ন এবং ভ্যাট সংক্রান্ত মামলা ব্যবস্থাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অঘোষিত একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ী, সাবেক কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কিছু কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিশ্চিত করেন এবং পরে সেই অবস্থান ব্যবহার করে ঘুষ বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করেন।
গুরুত্বপূর্ণ সার্কেল নিয়ন্ত্রণই মূল ক্ষমতা
কাস্টমস প্রশাসনে পদোন্নতি সরাসরি কমিশনারদের হাতে না থাকলেও, বদলির পর কোন কর্মকর্তা কোন সার্কেলে দায়িত্ব পাবেন— সেটি নির্ধারণ করেন কমিশনাররা। পাশাপাশি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা এবং তার নিচের পদগুলোর বদলির ক্ষমতাও কমিশনারদের হাতে থাকে।
প্রশাসনিক সূত্র বলছে, বড় রাজস্ব সংশ্লিষ্ট সার্কেলগুলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। এসব সার্কেলে বড় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এবং ভ্যাট ও শুল্ক নির্ধারণের দায়িত্ব থাকে। ফলে এসব সার্কেলে দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তাদের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয় এবং অভিযোগ অনুযায়ী সেখানে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ বেশি থাকে।
অভিযোগ: টাকা দিয়ে পদায়ন নিশ্চিত
সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে দায়িত্ব পেতে কিছু কর্মকর্তা অনৈতিক আর্থিক লেনদেন করেন। পরে ওই সার্কেলে দায়িত্ব পেয়ে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির মামলা বা তদন্ত শুরু করে আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলা দিয়ে চাপ তৈরির অভিযোগ
চট্টগ্রামের একজন আমদানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজস্ব নির্ধারণ সংক্রান্ত একাধিক নোটিশ দেওয়া হয়েছিলো। পরে প্রশাসনিক আলোচনার মাধ্যমে মামলা শিথিল করার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ঢাকার একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের একজন প্রতিনিধি জানান, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করা হয়। পরে তদবিরের মাধ্যমে চাপ কমে যাওয়ার ঘটনাও তারা লক্ষ্য করেছেন বলে দাবি করেন।
বদলি হলেও চক্র ভাঙে না
এক সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও পূর্ণ তদন্তের পরিবর্তে বদলি করা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নতুন কর্মস্থলে গিয়ে আবার গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে দায়িত্ব পাওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে অভিযোগ অনুযায়ী একই ধরনের প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকে।
দুদক তাহলে কী করছে?
এই ধরনের অভিযোগের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, দুর্নীতি দমন কমিশন কী ভূমিকা পালন করছে।
দুদকের প্রধান দায়িত্ব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা, অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করা এবং ঘুষ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনায় মামলা দায়ের করা। তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক বদলি বা মামলা-বাণিজ্যের মতো অভিযোগ প্রমাণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ বলছে, প্রশাসনিক চাপের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে সাহস পায় না। ঘুষ লেনদেন সাধারণত গোপনে হওয়ায় প্রমাণ সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক অভিযোগ সামনে এলেও তা আইনি পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লাগে।
দুদকের কর্মকর্তারা সাধারণত বলে থাকেন, লিখিত অভিযোগ বা প্রাথমিক তথ্য ছাড়া সরাসরি তদন্ত শুরু করা কঠিন। অভিযোগ পাওয়া গেলে তারা আইন অনুযায়ী অনুসন্ধান ও ব্যবস্থা নিতে পারে বলে জানানো হয়।
ব্যবসা ও বাজারে প্রভাব
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই ধরনের প্রশাসনিক চাপ বৈধ ব্যবসা পরিচালনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত খরচ বহন করতে বাধ্য হচ্ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দামের ওপর পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিযোগ দূর করতে সার্কেল বণ্টনে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল নজরদারি এবং শক্তিশালী জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। তারা মনে করেন, এসব বিষয়ে কাঠামোগত সংস্কার আনতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এর কার্যক্রম আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন।
আলোচিত রাজস্ব ও কাস্টমস বিরোধের উদাহরণ
১. গ্রামীণফোন
২৪ নভেম্বর ২০১৯
লাইসেন্স ফি ও রাজস্ব দাবি নিয়ে বড় অঙ্কের বিরোধ তৈরি হয়। বিষয়টি উচ্চ আদালতে যায় এবং দীর্ঘ সময় নিষ্পত্তিহীন থাকে।
২. রবি আজিয়াটা লিমিটেড
২৭ আগস্ট ২০২০
রাজস্ব হিসাব নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনি বিরোধে জড়ায় প্রতিষ্ঠানটি।
৩. বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস
মার্চ ২০২১
লাইসেন্স ফি ও ভ্যাট দাবি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি ট্রাইব্যুনালে যায়।
৪. বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
আমদানি শুল্ক নির্ধারণ নিয়ে আপিল ট্রাইব্যুনালে মামলা করে।
৫. এস আলম গ্রুপ
ফেব্রুয়ারি ২০২৩
আমদানি পণ্যের মূল্যায়ন নিয়ে প্রশাসনিক তদন্ত ও বিরোধ তৈরি হয়।
৬. বসুন্ধরা গ্রুপ
ডিসেম্বর ২০২২
শিল্প কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক নির্ধারণ নিয়ে বিরোধে জড়ায়।
৭. আকিজ গ্রুপ
জুলাই ২০২১
আমদানি কাঁচামালের শুল্ক নিয়ে প্রশাসনিক আপিল করে প্রতিষ্ঠানটি।
৮. পারটেক্স গ্রুপ
জুন ২০২৩
কাস্টমস মূল্য নির্ধারণ নিয়ে আপিল ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়।
৯. ইউনাইটেড গ্রুপ
এপ্রিল ২০২২
বিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি শুল্ক নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
১০. কনফিডেন্স গ্রুপ
অক্টোবর ২০২৩
জ্বালানি সরঞ্জাম আমদানির শুল্ক নিয়ে ট্রাইব্যুনালে শুনানি হয়।
১১. স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস
জানুয়ারি ২০২১
ওষুধের কাঁচামাল আমদানি শুল্ক নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসনিক বিরোধ হয়।
১২. রেনাটা লিমিটেড
নভেম্বর ২০২২
আমদানি কর নির্ধারণ সংক্রান্ত আপিল দায়ের করে প্রতিষ্ঠানটি।
১৩. ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ
মে ২০২৩
ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ আমদানির শুল্ক মূল্যায়ন নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।
১৪. প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ
আগস্ট ২০২২
কাঁচামাল আমদানি কর নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসনিক আপিল করে।
১৫. মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ
মার্চ ২০২১
ভোজ্য তেল আমদানির শুল্ক নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ হয়।
১৬. জেমকন গ্রুপ
জুলাই ২০২৩
শিল্প সরঞ্জাম আমদানি শুল্ক নিয়ে প্রশাসনিক বিরোধ দেখা দেয়।
১৭. সামিট গ্রুপ
ফেব্রুয়ারি ২০২২
বিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি কর নিয়ে আপিল করে প্রতিষ্ঠানটি।
১৮. ওরিয়ন গ্রুপ
সেপ্টেম্বর ২০২১
শিল্প প্রকল্প সরঞ্জাম আমদানির শুল্ক নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।
১৯. আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ
ডিসেম্বর ২০২৩
ইস্পাত কাঁচামাল আমদানির শুল্ক নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসনিক বিরোধ দেখা দেয়।
২০. নাভানা গ্রুপ
এপ্রিল ২০২৪
গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি শুল্ক মূল্যায়ন নিয়ে ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়।
সার্বিক প্রেক্ষাপট
রাজস্ব বিরোধ সংক্রান্ত নীতিমালা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। অন্যদিকে, রাজস্ব প্রশাসনে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন-এর ওপর। আসলে গড়ে হরিবল। ত্রিমুখী সমঝোতা হয়।
বিভাগীয় লেভেলের ছোট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলার উদাহরণ
১. চট্টগ্রাম কমিশনারেট
জুলাই ২০২১ – মাজেদ ট্রেডার্স (চট্টগ্রাম, আমদানি-রপ্তানি পণ্য)
ভ্যাট ও কাস্টমস হিসাব নিয়ে মামলা দায়ের, আপিল ট্রাইব্যুনালে দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকে।
মার্চ ২০২২ – সায়েম কনসার্ন (চট্টগ্রাম, খাদ্যপণ্য আমদানি)
কাস্টমস শুল্ক নির্ধারণ সংক্রান্ত বিরোধ, প্রশাসনিক আপিলে মামলা স্থগিত থাকে।
২. ঢাকা কমিশনারেট
আগস্ট ২০২২ – রাজ ট্রেডার্স (ঢাকা, ইলেকট্রনিক্স পণ্য আমদানি)
ভ্যাট হিসাব নিয়ে মামলা, অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লাগে।
ডিসেম্বর ২০২۲ – নুর ট্রেডার্স (ঢাকা, গার্মেন্টস যন্ত্রাংশ আমদানি)
কাস্টমস শুল্ক নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসনিক আপিলে মামলা ঝুলে থাকে।
৩. কুমিল্লা কমিশনারেট
জুন ২০২১ – হাসান এন্টারপ্রাইজেস (কুমিল্লা, কাঁচামাল আমদানি)
ভ্যাট ও শুল্ক হিসাব নিয়ে মামলার আপিল প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন স্থগিত।
জানুয়ারি ২০২৩ – সেলিম ট্রেডার্স (কুমিল্লা, শিল্প সরঞ্জাম আমদানি)
মামলা প্রশাসনিক আপিল পর্যায়ে ঝুলে থাকে।
৪. খুলনা কমিশনারেট
ফেব্রুয়ারি ২০২২ – আব্দুল্লাহ ট্রেডার্স (খুলনা, খাদ্যপণ্য)
কাস্টমস শুল্ক নির্ধারণ সংক্রান্ত মামলা এবং আপিল।
সেপ্টেম্বর ২০২৩ – হুমায়ুন এন্টারপ্রাইজেস (খুলনা, গার্মেন্টস যন্ত্রাংশ)
ভ্যাট হিসাব নিয়ে মামলা দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে।
৫. সিলেট কমিশনারেট
মার্চ ২০২১ – মোহাম্মদ ট্রেডার্স (সিলেট, খাদ্য ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য)
কাস্টমস শুল্ক ও ভ্যাট নির্ধারণ সংক্রান্ত মামলা।
নভেম্বর ২০২২ – সফিক এন্টারপ্রাইজেস (সিলেট, ছোট আকারের আমদানি)
প্রশাসনিক আপিলে মামলা দীর্ঘদিন স্থগিত থাকে।
বিভাগীয় লেভেলের কাস্টমস মামলা অনেক সময় বছরের পর বছর প্রশাসনিক নথিতে ঝুলে থাকে। অধিকাংশ মামলার ফলাফল প্রকাশ পায় না এবং গণমাধ্যমে খবর আসে না।
