বড় ব্যবসায়ীদের ফাঁকি, ছোটদের ওপর চাপ — ভ্যাট–ট্যাক্স জটিলতায় ক্ষতিগ্রস্ত গোপালগঞ্জের ভোক্তারা।
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
গোপালগঞ্জে ভ্যাট ও ট্যাক্স ব্যবস্থাকে ঘিরে বড় ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এতে করে রাজস্ব আদায়ের কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তার ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জেলার অনেক বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রকৃত বিক্রির তথ্য গোপন রেখে ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দিচ্ছে। বিশেষ করে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই নামমাত্র ভ্যাট পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, বিপুল পরিমাণ লেনদেন হওয়া সত্ত্বেও এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
অভিযোগ রয়েছে, স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নিয়মিত নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলের একাংশের দাবি, এ খাতে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার স্বার্থ জড়িত থাকায় কার্যকর তদারকি করা হচ্ছে না।

অন্যদিকে, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, বিভিন্ন অজুহাতে তাদের দোকানে অভিযান চালানো হয় এবং জরিমানার ভয় দেখানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মের স্পষ্ট প্রমাণ না থাকলেও চাপের মুখে আর্থিক সমঝোতায় যেতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবার ভ্যাট বৃদ্ধির অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে তারা কতটুকু ভ্যাট পরিশোধ করছেন, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা নেই। ফলে ভ্যাটের নামে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের।
ভোক্তারা অভিযোগ করে বলেন, অনেক দোকানে ভ্যাট নেওয়া হলেও সঠিক চালান বা রশিদ দেওয়া হয় না। আবার কোথাও কোথাও ভ্যাটের হার বাড়িয়ে দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে।
সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, বড় ব্যবসায়ীদের রাজস্ব ফাঁকি এবং ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ—এই দ্বৈত পরিস্থিতি বাজার ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ জনগণ প্রতিনিয়ত আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট ও ট্যাক্স দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নিয়ম অনুযায়ী রাজস্ব আদায় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তারা দাবি করেন।
এদিকে ভোক্তা অধিকার কর্মীরা স্বর্ণ ব্যবসাসহ বড় ব্যবসা খাতগুলোতে বিশেষ নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভ্যাট আদায়ের পুরো প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তারা।
এ বিষয়ে ফলোআপনিউজ গোপালগঞ্জ জেলা বাজুসের সাবেক সভাপতি রুদ্রলাল এবং সাধারণ সম্পাদক নূরুল আহসান হুসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে ভ্যাট, কাস্টমস ও এক্সাইজ গোপালগঞ্জ জেলার প্রধান— সহকারী কমিশনার মোছাম্মত রাজিয়া সুলতানার বক্তব্যও অস্পষ্ট ও নির্ভরশীল বলে মনে হয়েছে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের কাছে।
ট্যাক্স বিভাগের উপকমিশনার শেখ সালামত উল্লাহ জানান, তার অধীনে প্রায় ৮২ হাজার ফাইল রয়েছে। তদারকি করা কঠিন। গোপালগঞ্জে ২৫ শতাংশ কর স্ল্যাবে কতজন করদাতা রয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আনুমানিক একশো জনের মতো হতে পারে বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, কারো কর সংক্রান্ত বিষয়ে জনসাধারণের সন্দেহ থাকলে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে।
এদিকে গোপালগঞ্জের স্বর্ণ ব্যবসা খাত থেকে ভ্যাট আদায়ের পরিমাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে সার্কেল-১ এর রাজস্ব কর্মকর্তা মোঃ মহসীন জানান, গত অর্থবছরে সমগ্র জেলা থেকে প্রায় ১২ লক্ষ টাকা ভ্যাট আদায় হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জেলার তিন শতাধিক জুয়েলার্স প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুইটি দোকান থেকেই এ পরিমাণ ভ্যাট আদায়ের কথা রয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয় মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বিশ্লেষণে সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশ কিংবা প্রশাসনিক অপারগতা—যে কারণই থাকুক না কেন, এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ জনগণের ওপর। রাজস্ব আদায়ের অনিয়ম, বাজারে মূল্য অস্থিতিশীলতা এবং ভ্যাট ব্যবস্থার অস্বচ্ছতার কারণে শেষ পর্যন্ত বাড়তি আর্থিক চাপ বহন করতে হচ্ছে ভোক্তাদের, যা স্থানীয় অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও ন্যায়সঙ্গত বাজার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
