২০১৬ সালের ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সিকিমকে সম্পূর্ণ অর্গানিক স্টেট বা কেমিক্যাল ফ্রি রাজ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
প্রায় পাঁচ বছর আগে সবুজ বিপ্লবের যখন সূচনা হয়েছিলো সেখানে একই সাথে কীটনাশক বাদ দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিলো।

ভারতের প্রথম রাজ্য হিসেবে সিকিমকেই রাসায়নিক মুক্ত বা অর্গানিক রাজ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো আরো দু’বছর আগে, ২০১৬ সালে। যদিও যখন সিকিম সরকার প্রথম তাদের পরিকল্পনা ঘোষণা করে তখন বিষয়টি এতো সহজ ছিলো না।
২০০৩ সালে প্রথম যখন কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা নেয়া হয় তখন তার প্রতি সেখানকার কৃষকরাও খুব একটা আস্থাশীল ছিলো না।
কৃষকদের একজন কারমা ভুটিয়া যেমন বলছিলেন যে অনেকে কৃষক আসলে ভীত হয়ে পড়েছিলো সরকারের উদ্যোগে।
তিনি বলেন, “প্রথম দু তিন বছরে চাষবাসই নাটকীয়ভাবে কমে গিয়েছিলো। এটা আমাদের ভেঙ্গে দিয়েছিলো। আমরা তখন তরুণ কৃষক। আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম যে অর্গানিকের দিকে যাওয়া হয়তো সঠিক সিদ্ধান্ত হচ্ছেনা। সেসময়ই সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের আশ্বস্ত করা হল যে তারা আমাদের লোকসানের জন্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেবে। এরপর আমরা চেষ্টা শুরু করলাম এবং দু তিন বছর পর বুঝলাম যে চাষাবাদ হচ্ছে আগের মতোই। এবং তাতে আমরা অভ্যস্ত হলাম”।
এখন সিকিমে চাষবাসে কীটনাশকের ব্যবহার রীতিমত অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। কেউ জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করলে এক হাজার চারশো ডলার বা সমপরিমাণ পর্যন্ত অর্থ জরিমানা হতে পারে। এমনকি জেল হতে পারে প্রায় তিন মাসের জন্য।
কিন্তু কেন সরকার রাসায়নিক মুক্ত চাষবাসে এতোটা আগ্রহী হল। রাজ্যের কৃষি সচিব খরলো ভুটিয়া বলছেন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল জনস্বাস্থ্য।
“মূলত মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখা এবং জনগণের কাছে মানসম্পন্ন খাবার পৌঁছে দেয়া। এরপর মানুষের জন্য রাসায়নিক মুক্ত বাতাস ও পানি নিশ্চিত করা এবং এর সাথে রাজ্যটির সমৃদ্ধ জৈববৈচিত্র রক্ষা করা”।

বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যটির দিকে নজর পড়ে কমই। যদিও হিমালয় পর্বতমালার সৌন্দর্যে সিকিম হয়ে উঠেছে অসাধারণ।
কিন্তু এখন সেই সৌন্দর্যের পাশাপাশি রাজ্যটির অর্গানিক ফিল্ডগুলোও মানুষকে টানছে।
আর এর ফলে রাজ্যে বাড়ছে পর্যটকের সংখ্যাও। কর্তৃপক্ষের হিসেবে পর্যটক বেড়েছে সত্তর ভাগের মতো।
এখন ভারত সরকার চাইছেন দেশটির সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ুক সিকিম মডেল।কিন্তু এজন্য আস্থায় নিতে হবে দেশটির লক্ষ লক্ষ কৃষককে, আবার কীটনাশক উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোও এতে খুব একটা খুশী হবেনা সেটিও নিশ্চিত করেই বলা যায়।
তারপরেও এখন সবার দৃষ্টি সিকিমের দিকেই কারণ এই অর্গানিক মিশন জাতিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য এনে দিতে পারে।
সিকিম অর্গানিক রাজ্য হয়েছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে, যা পরিবেশবান্ধব কৃষিকে উৎসাহিত করে। এটি করার জন্য, ২০০৩ সালে সিকিম অর্গানিক মিশন (SOM) গঠন করা হয় এবং একটি কর্মপরিকল্পনা ও রোডম্যাপ তৈরি করা হয়, যেখানে কৃষকদের রাসায়নিকের বিকল্প ও জৈব চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সিকিম বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ জৈব রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে, যা ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।
৬. পুরস্কার ও স্বীকৃতিঃ এই পদক্ষেপগুলির ফলস্বরূপ, সিকিম ২০১৮ সালের মধ্যে ভারতের প্রথম এবং বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ অর্গানিক রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
সিকিম প্লাস্টিকমুক্ত হয়েছে বিভিন্ন নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে, যার মধ্যে ছিলো ১৯৯৮ সালে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ করা এবং ১ জানুয়ারি, ২০২২ থেকে প্লাস্টিকের বোতলের পানি বিক্রি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। এর পরিবর্তে, বাঁশের বোতল এবং অন্যান্য পরিবেশবান্ধব পাত্র ব্যবহারের প্রচলন করা হয়েছে।
-
১৯৯৮ সালে সিকিম ভারতের প্রথম রাজ্য হিসেবে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ করে একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
-
১ জানুয়ারী, ২০২২ থেকে রাজ্য সরকার প্লাস্টিকের পানির বোতল বিক্রি ও ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে।
-
বিকল্পের ব্যবহারঃ
প্লাস্টিকের পরিবর্তে পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য বাঁশের বোতল এবং অন্যান্য পরিবেশবান্ধব পাত্রে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
-
জনসচেতনতা বৃদ্ধিঃপ্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দারাও এই পরিবর্তনে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।