কোন পথে বাংলাদেশ? // দিব্যেন্দু দ্বীপ

শেখ মুজিবুর রহমান

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনীতি, এবং সাম্প্রতিক ক্ষমতার পরিবর্তন— সবকিছুকে একসাথে দেখতে হবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বয়ানকে নতুনভাবে সাজিয়ে দিয়েছে। এই পরিবর্তনের ভেতরে একটি বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে: কেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বা মুক্তিযুদ্ধ-সমালোচনামূলক শক্তি আজ বাংলাদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, এবং কেনো প্রায় সবক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ও প্রতীককে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে?

শেখ মুজিবুর রহমান
এআই নির্মিত ছবি।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। সেই সংগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার সংগ্রামের দিকে প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় ঘটে যায় একটি বড় রাজনৈতিক মোড়। ১৯৭৫ সালের Assassination of Sheikh Mujibur Rahman বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাকে আমূল পরিবর্তন করে দেয়। এই ঘটনার পরে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বয়ান ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে।

পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় আসেন সেক্টর-কমান্ডার হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান এবং পরে হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ। তাদের সময় রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভেতরে “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ভূমিকা বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে আগে নিষিদ্ধ থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পুনরায় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল Bangladesh Jamaat-e-Islami, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানপন্থী অবস্থানের জন্য সমালোচিত ছিলো, গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ছিলো।

এই সময় থেকেই বাংলাদেশের সমাজে একটি বিকল্প রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হতে থাকে। একদিকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে ধর্মীয় বা ইসলামভিত্তিক রাজনীতি— এই দুই ধারার মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। শিক্ষা, সামাজিক সংগঠন, ছাত্ররাজনীতি এবং দাতব্য কার্যক্রমের মাধ্যমে ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো ধীরে ধীরে সমাজে প্রভাব বাড়ায়। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে একক বয়ানের বদলে একাধিক ব্যাখ্যা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতা যুক্ত হয়— রাজনীতির দলীয় মেরুকরণ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে দুটি বড় দল মুখোমুখি অবস্থানে থেকেছে: Bangladesh Awami League এবং Bangladesh Nationalist Party। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় ইতিহাসকেও দলীয় ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কখনো কখনো একটি জাতীয় ঐতিহ্যের বদলে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে।

এই দীর্ঘ প্রেক্ষাপটের মধ্যেই আসে ২০২৪ সালের আন্দোলন। জুলাই মাসে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব ঘটে ৫ আগস্ট, যখন ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশ ছাড়েন। এই ঘটনাকে অনেকেই “গণঅভ্যুত্থান” হিসেবে বর্ণনা করেন, আবার অন্যরা এটিকে একটি সাংবিধানিক সরকারের পতন হিসেবে দেখেন।

সরকার পতনের পরে একটি অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক পর্যায় শুরু হয়। সেই সময় রাজনৈতিক প্রতীকের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন দেখা যায়। অনেক জায়গায় ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সঙ্গে যুক্ত প্রতীক, মুরাল বা ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। প্রায় সবক্ষেত্রে Sheikh Mujibur Rahman-এর ভাস্কর্য বা স্মৃতিচিহ্নও আক্রমণের শিকার হয়। এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত হয় এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রতীক নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করে।

এরপর আসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে বড় বিজয় অর্জন করে Bangladesh Nationalist Party। দীর্ঘ সময় পর দলটি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং নতুন সরকার গঠন করে। নির্বাচনে দ্বিতীয় বড় শক্তি হিসেবে উঠে আসে Bangladesh Jamaat-e-Islami, যার ফলে সংসদে ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রভাবও বেড়ে যায়।

নতুন সরকারের ক্ষমতায় আসার পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি নতুন বয়ান দেখা যায়। অনেকেই ৫ আগস্টকে “ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান” হিসেবে তুলে ধরছেন। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ মনে করছে যে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর প্রতীক, স্মৃতিচিহ্ন এবং ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

কেনো কিছু শক্তি বঙ্গবন্ধুর প্রতীককে চ্যালেঞ্জ করতে চায়? এই প্রশ্নের উত্তরও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। Sheikh Mujibur Rahman শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতীক। ফলে তাকে ঘিরে থাকা প্রতীকগুলো জাতীয় ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলায়, তখন অনেক সময় সেই প্রতীকগুলোকেও নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হয়। কেউ কেউ মনে করে দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নাম অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরে প্রতীকগুলোকে পুনর্বিন্যাস করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যদিও এর আগেই অন্তবর্তী পর্যায়ে ঘটে গেছে মহা তাণ্ডব। তবে বাংলাদেশের প্রকৃত বাস্তবতা অনেক জটিল। সমাজের একটি বড় অংশ এখনো বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার স্থপতি হিসেবে শ্রদ্ধা করে। আবার অন্য একটি অংশ রাজনৈতিক বা আদর্শগত কারণে তার ভূমিকা নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে চায়। এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গিই বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ককে তীব্র করে তুলেছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শুধুমাত্র একটি সরকার পরিবর্তনের ফল নয়। এটি ইতিহাস, জাতীয় পরিচয়, রাজনৈতিক প্রতীক এবং ক্ষমতার বয়ানের মধ্যকার দীর্ঘ সংগ্রামের একটি নতুন অধ্যায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন, পরবর্তী দশকগুলোর আদর্শগত দ্বন্দ্ব, এবং সাম্প্রতিক গণআন্দোলন— সবকিছু মিলেই বর্তমান বাস্তবতাকে তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ভবিষ্যতে দেশটি কোন পথে এগোবে, তা নির্ভর করবে এই প্রশ্নের ওপর: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং জাতীয় প্রতীকগুলো কি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে একটি সম্মিলিত জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে, নাকি সেগুলো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবেই থেকে যাবে।