Headlines

ক্ষমতার ছায়ায় বন্দি প্রশাসন: ভয়, চাপ ও দুর্নীতির অবিচ্ছেদ্য বৃত্ত

offices of Bangladesh

বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসনে দুর্নীতিকে অনেকেই কেবল নিচের স্তরের সমস্যা হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন—এখানে দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে, এবং তা এক ধরনের “ভয়ের সংস্কৃতি”র ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বড় কর্মকর্তারা ছোট কর্মকর্তাদের ওপর এমন এক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যেখানে ট্রান্সফার, পদোন্নতি আটকে রাখা কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির ভয় দেখিয়ে তাদের কার্যত জিম্মি করে রাখা হয়।

offices of Bangladesh
বাংলাদেশের সরকারি অফিসগুলোর চিত্র।

একজন নিম্ন বা মধ্যম স্তরের কর্মকর্তা যখন তার দায়িত্ব পালন করতে যান, তখন তিনি শুধু নিয়ম-কানুনের মধ্যে থাকেন না—তার মাথার ওপর ঝুলতে থাকে বদলির শঙ্কা, ক্যারিয়ার থেমে যাওয়ার আশঙ্কা, কিংবা কোনো অজুহাতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ভয়। এই ভয় তাকে স্বাধীনভাবে সৎ থাকার সুযোগ কমিয়ে দেয়। বরং অনেক সময় তাকে বাধ্য করে এমন কাজ করতে, যা তার নৈতিকতার বিরুদ্ধে।

ফলে নিচের স্তরের দুর্নীতি আসলে অনেক ক্ষেত্রেই উপরের স্তরের চাপেরই প্রতিফলন। ছোট কর্মকর্তারা জনগণের কাছ থেকে ঘুষ নেন—কিন্তু সেই অর্থের বড় অংশটি বা সুবিধা উপরের দিকেও পৌঁছায় বলে অভিযোগ রয়েছে বহুদিনের। এই অদৃশ্য চেইনটি ভাঙা কঠিন, কারণ এখানে সবাই কোনো না কোনোভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িত।

এই ব্যবস্থায় বড় কর্মকর্তারা নিজেদের সরাসরি দৃশ্যমান না রেখে, নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের ব্যবহার করেন। আর ছোট কর্মকর্তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে, চাকরি বাঁচাতে, এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন। ফলে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়—যেখানে উপরের ভয় নিচের দুর্নীতিকে জন্ম দেয়, আর সেই দুর্নীতি আবার পুরো কাঠামোকে আরো শক্ত করে তোলে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এই প্রক্রিয়াটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে “স্বাভাবিক” হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। নতুন কর্মকর্তারা এই সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়েই বুঝে যান—টিকে থাকতে হলে নিয়মের বাইরে যেতে হবে, অথবা উপরের নির্দেশ মেনে চলতে হবে, যাই হোক না কেন।

এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রশাসনিক কাঠামোয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে—শুধু নিচে নয়, উপরের স্তরেও। ট্রান্সফার ও প্রমোশন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নীতিনির্ভর করতে হবে, যাতে তা আর কোনো চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দেওয়াও জরুরি।

নয়তো “উপরের চাপ, নিচের দুর্নীতি”—এই ভয়ভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি দেশের সুশাসনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে থেকেই যাবে।