ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আদর্শিক রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের অবস্থান: সমাজবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন দীর্ঘদিন ধরেই আদর্শিক বিভাজন ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। এই দ্বন্দ্ব অনেক সময় ঐতিহাসিক স্মৃতি, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষত, একদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর মতো রাজনৈতিক শক্তিকে কেন্দ্র করে সমাজে যে মতাদর্শিক অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা শুধু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সামাজিক ক্ষমতা কাঠামো, সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
সমাজবিজ্ঞানের আলোকে দেখা যায়, রাজনৈতিক বা আদর্শিক সংঘাত প্রায়শই ক্ষমতা অর্জন ও ক্ষমতা ধরে রাখার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের ক্ষমতার ধারণা অনুযায়ী, ক্ষমতা হলো এমন একটি সামাজিক সক্ষমতা, যার মাধ্যমে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যদের ওপর নিজেদের ইচ্ছা আরোপ করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা বুদ্ধিজীবীরা রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেন— যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, তখন তা শুধুমাত্র মতাদর্শিক অবস্থান নয়, বরং সামাজিক প্রভাব বিস্তার এবং প্রতীকী ক্ষমতা অর্জনের একটি ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

শেহরীন আমিন মোনামি (বামে) এবং ফারহানা ইন্দ্রা। মোনামী জামায়াতে ইসলামির হয়ে এবং ইন্দ্রা আওয়ামী লীগের নামে জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করে থাকেন।

বাংলাদেশের সমসাময়িক বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় অনেক সময় একই চিন্তার এবং ইচ্ছার বা পেশাগত পরিচয়ের ব্যক্তিরাও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। উদাহরণস্বরূপ, আলোচনায় উঠে আসে মোনামী নামের একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, যাকে কেউ কেউ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা আদর্শিক অবস্থানের সমর্থক হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে ফারহানা ইন্দ্র নামে আরেকজন ব্যক্তিকেও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের পক্ষে সক্রিয় বলে আলোচিত হতে দেখা যায়। এখানে একটি দার্শনিক ও সমাজবৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— একই চরিত্রের এবং একই লোভের মানুষ কীভাবে বিপরীত আদর্শে ভাগ হয়ে যায়। অর্থাৎ ব্যক্তিগত প্রবৃত্তি, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা বা সামাজিক স্বীকৃতির লোভ অনেক সময় আদর্শের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দিক ধরে প্রকাশ পায়। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এ ধরনের ঘটনা ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং আদর্শিক বিভাজনের জটিল সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়— যখন একই সামাজিক শ্রেণি, ইচ্ছা বা পেশাগত অবস্থানের মানুষ ভিন্ন মতাদর্শিক শিবিরে অবস্থান নিয়েও মূলত ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন, তখন সেই সংঘাত কতটা সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
সমাজবিজ্ঞানে “এলিট থিওরি” বা অভিজাত তত্ত্ব বলে, সমাজের ক্ষমতা মূলত সীমিত কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। এই তত্ত্ব অনুসারে দেখা যায়, রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব অনেক সময় সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করলেও বাস্তবে তারা নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে জনগণের বাস্তব সমস্যা— দারিদ্র্য, শিক্ষা বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবা সংকট কিংবা কর্মসংস্থানের অভাব রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে সরে যায়।
অন্যদিকে, আন্তোনিও গ্রামশির সাংস্কৃতিক আধিপত্য তত্ত্ব অনুসারে, ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী কেবল রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের মাধ্যমেও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিতর্ক অনেক সময় নৈতিকতা, ইতিহাস বা আদর্শিক পরিচয়ের প্রশ্নে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষ বাস্তব উন্নয়নমূলক নীতির পরিবর্তে প্রতীকী ও আবেগভিত্তিক রাজনীতির অংশ হয়ে যায়।
এছাড়া আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে “পারফরমেটিভ অ্যাক্টিভিজম” বা প্রদর্শনমূলক সক্রিয়তার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই ধারণা অনুযায়ী, অনেক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সামাজিক বা রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করে মূলত সামাজিক স্বীকৃতি, জনপ্রিয়তা বা অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য। এতে রাজনৈতিক আন্দোলন অনেক সময় বাস্তব পরিবর্তনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং বা সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
তবে সমাজবিজ্ঞানের বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ নেতিবাচক নয়। রাজনৈতিক মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব গণতান্ত্রিক সমাজে একটি প্রয়োজনীয় উপাদানও হতে পারে। বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির প্রতিযোগিতা অনেক সময় নীতিনির্ধারণে ভারসাম্য সৃষ্টি করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতা তখনই জনকল্যাণে সহায়ক হয়, যখন তা জনগণের বাস্তব সমস্যার সমাধান এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দিকে পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, যখন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে, তখন সমাজ লাভবান হয়। কিন্তু যখন এই সংঘাত শুধুমাত্র ক্ষমতা, প্রভাব ও ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্জনের লড়াইয়ে পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশগ্রহণকারী না হয়ে বরং একটি দর্শকগোষ্ঠীতে পরিণত হয়।
সবশেষে বলা যায়, সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মূল্যায়ন নির্ভর করে তার সামাজিক প্রভাবের ওপর। যদি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব জনগণের কল্যাণকে কেন্দ্র করে কাজ করে, তবে তা সামাজিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি হতে পারে। আর যদি তা ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও স্বার্থের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে তা সমাজে বিভাজন ও স্থবিরতা সৃষ্টি করে এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অপূর্ণই থেকে যায়।