বাংলাদেশের গণমাধ্যমে লুম্পেন অপরাধের উপস্থাপনা: একটি মার্কসবাদী বিশ্লেষণ

ব্যক্তিকরণ, নৈতিক আতঙ্ক ও কাঠামোগত অস্বীকার

বাংলাদেশের গণমাধ্যমে লুম্পেন অপরাধের উপস্থাপনা: একটি মার্কসবাদী বিশ্লেষণ

এই প্রবন্ধে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমে সহিংস ও চরম অপরাধের উপস্থাপনা মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং নৈতিক আতঙ্ক সৃষ্টিমুখী। এর ফলে অপরাধকে একটি বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত বিকৃতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, কিন্তু যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো এই ধরনের লুম্পেন সাবজেক্ট উৎপাদন করে, তা আড়ালেই থেকে যায়। মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতি ও মিডিয়া তত্ত্বের আলোকে এই প্রবন্ধ দেখাতে চায়— গণমাধ্যম কীভাবে লুম্পেন ব্যক্তিকে দৃশ্যমান করে, কিন্তু লুম্পেনাইজেশন প্রক্রিয়াকে অদৃশ্য রাখে।

১. ভূমিকা

আধুনিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যম কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শিক প্রতিষ্ঠান (ideological institution), যা সামাজিক বাস্তবতার অর্থ নির্মাণ করে (Althusser, 1971)। সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রে এই ভূমিকা আরও প্রকট হয়ে ওঠে, কারণ এখানে মিডিয়া ভাষা, প্রতীক ও ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে ভয়, নৈতিকতা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বৈধতা পুনর্গঠন করে।
বাংলাদেশের শহরতলিভিত্তিক অপরাধসংক্রান্ত মিডিয়া কভারেজে এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়, যেখানে অপরাধী ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে বর্ণনা নির্মিত হলেও কাঠামোগত দারিদ্র্য, নগরায়নের বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় কল্যাণ ব্যর্থতা প্রশ্নের বাইরে থেকে যায়।

২. তাত্ত্বিক কাঠামো: লুম্পেন প্রোলেতারিয়েত ও হেজেমনি

মার্কস (1852) লুম্পেন প্রোলেতারিয়েতকে এমন একটি শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, যারা উৎপাদন সম্পর্কের বাইরে অবস্থান করে এবং সংগঠিত শ্রমিক রাজনীতির সাথে যুক্ত নয়। পরবর্তী মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন যে, এই শ্রেণি প্রায়শই ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর দ্বারা রাজনৈতিক ও দমনমূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় (Gramsci, 1971)।
গ্রামশির হেজেমনি ধারণা অনুযায়ী, শাসন কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমেও কার্যকর হয়। গণমাধ্যম এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা নির্দিষ্ট সামাজিক ব্যাখ্যাকে “স্বাভাবিক” ও “স্বতঃসিদ্ধ” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

৩. অপরাধের ব্যক্তিকরণ ও দানবায়ন

বাংলাদেশের মিডিয়ায় সহিংস অপরাধ প্রায়শই “পিশাচ”, “অমানুষ”, “মানসিকভাবে বিকৃত” ইত্যাদি শব্দচয়নের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়। এই ভাষা অপরাধীকে সামাজিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি ব্যতিক্রমী সত্তা হিসেবে নির্মাণ করে।
সমাজতাত্ত্বিকভাবে এই প্রক্রিয়াকে individualization of crime বলা যায় (Hall et al., 1978)। এর ফলে— অপরাধ সামাজিক উৎপাদনের ফল হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত বিকৃতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
কাঠামোগত দারিদ্র্য ও শ্রেণি-বৈষম্য অদৃশ্য থাকে;
রাষ্ট্রের নীতিগত দায় আলোচনার বাইরে চলে যায়।

৪. নৈতিক আতঙ্ক (Moral Panic) ও ভয় উৎপাদন

Cohen (1972) নৈতিক আতঙ্ককে এমন একটি সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সমাজের জন্য হুমকি হিসেবে নির্মাণ করা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, শহরতলির দরিদ্র ও ভবঘুরে মানুষদের এই আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়। মিডিয়া ভয় উৎপাদনের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সম্ভাব্য অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে রাষ্ট্রের নজরদারি ও দমনমূলক নীতিকে বৈধতা দেয়। কিন্তু পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান বা মানসিক স্বাস্থ্য অবকাঠামোর প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় অপরাধ “সমাধান” হয় দমনমূলক ব্যবস্থায়, সামাজিক রূপান্তরে নয়।

৫. লুম্পেন সাবজেক্ট বনাম লুম্পেনাইজেশন প্রক্রিয়া

এই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় যুক্তি হলো গণমাধ্যম লুম্পেন ব্যক্তিকে দৃশ্যমান করে, কিন্তু লুম্পেনাইজেশনকে একটি ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করে না। Harvey (2005) দেখিয়েছেন যে নব্য-উদারনৈতিক নগরায়ন শ্রমিক শ্রেণিকে ভেঙে দিয়ে ব্যাপক সামাজিক অনিশ্চয়তা তৈরি করে, যার ফল হিসেবে শহরে একটি বড় লুম্পেন জনসংখ্যা গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশে শিল্পায়নহীন নগরায়ন, ট্রেড ইউনিয়নের দুর্বলতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এই লুম্পেনাইজেশনকে আরও তীব্র করেছে, যা মিডিয়া আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত।

৬. উপসংহার

এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সহিংস লুম্পেন অপরাধের উপস্থাপনা একটি নিরপেক্ষ সাংবাদিক চর্চা নয়; বরং এটি একটি মতাদর্শিক প্রক্রিয়া, যা ব্যক্তিকে অপরাধী বানিয়ে কাঠামোকে দায়মুক্ত করে।
প্রবন্ধটির সারকথা হলো গণমাধ্যম অপরাধীকে দৃশ্যমান করে তোলে, যাতে অপরাধ উৎপাদনকারী সামাজিক কাঠামো অদৃশ্য থাকে। এই কাঠামোগত অস্বীকার অব্যাহত থাকলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয়; বরং লুম্পেনাইজড সাবজেক্টের ধারাবাহিক উৎপাদনই স্বাভাবিক সামাজিক পরিণতি হয়ে থাকবে।

রেফারেন্স (References)

১. Althusser, L. (1971). Ideology and Ideological State Apparatuses. London: Verso.
২. Cohen, S. (1972). Folk Devils and Moral Panics. London: Routledge.
৩. Gramsci, A. (1971). Selections from the Prison Notebooks. New York: International Publishers.
৪. Hall, S., Critcher, C., Jefferson, T., Clarke, J., & Roberts, B. (1978). Policing the Crisis. London: Macmillan.
৫. Harvey, D. (2005). A Brief History of Neoliberalism. Oxford: Oxford University Press.
৬. Marx, K. (1852). The Eighteenth Brumaire of Louis Bonaparte.