কৈশোর বয়স থেকেই বিভিন্ন বয়সী পুরুষদের কাছ থেকে ধারাবাহিক যৌন মনোযোগ (male sexual attention) মেয়েদের আত্মপরিচয় গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। এই মনোযোগ ধীরে ধীরে শরীরকেন্দ্রিক আত্মমূল্যায়ন, যৌন চিন্তার স্বাভাবিকীকরণ এবং পরিচয়ের দ্বৈততা তৈরি করে।

ডিজিটাল যুগে মনোযোগ কেবল সামাজিক স্বীকৃতির বিষয় নয়; এটি ক্রমশ এক ধরনের সামাজিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। কে কতটা দৃশ্যমান, কতবার মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাচ্ছে, কে আলোচনায় কতবার আসে—এসবের মধ্য দিয়েই আজ তরুণীদের আত্মমূল্য নির্ধারিত হচ্ছে। বাংলাদেশে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্ষেত্র হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে Facebook, যেখানে তরুণীরা নিয়মিত সক্রিয় এবং নিজেদের পরিচয় উপস্থাপন করে অন্যের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেষ্টা করে।
মনোযোগের অর্থনীতি মূলত এমন এক প্রক্রিয়া যেখানে সামাজিক স্বীকৃতি মানসিক ও সামাজিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে মনোযোগ আসে ছবি, পোস্ট, মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত বার্তার মাধ্যমে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই মনোযোগ প্রায়শই লিঙ্গভিত্তিক হয়ে ওঠে এবং তরুণীদের আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে শরীর ও উপস্থিতি কেন্দ্রিক মূল্যায়নকে প্রধান স্থান দান করে (Marwick & boyd, 2011; Tiggemann & Slater, 2014)। ফলে আত্মপরিচয় তৈরির প্রক্রিয়ায় বাহ্যিক উপস্থাপন ক্রমশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, ব্যক্তিগত দক্ষতা বা মানসিক গুণের তুলনায়।
তরুণীদের ইনবক্সে বিভিন্ন বয়সের পুরুষদের কাছ থেকে—সমবয়সী হোক বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালী—অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিগত বার্তা আসে। অনেক সময় এমন বার্তাগুলোতে যৌন আগ্রহ বা আকর্ষণের ইঙ্গিত থাকে। বিশেষভাবে দেখা গেছে, উচ্চপদস্থ বা অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পুরুষও এই ধরনের বার্তা পাঠায়। এই ধারাবাহিক, সর্বক্ষণ উপস্থিত পুরুষের দৃষ্টি—যা আমরা এখানে “কনটিনিউয়াস ডিজিটাল মেল গেজ” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছি—ধীরে ধীরে তরুণীদের আত্মমূল্যায়ন ও সামাজিক ধারণায় প্রভাব ফেলে (Tolman, 2002; Ringrose et al., 2013)।
এই অভিজ্ঞতা তরুণীদের মধ্যে এক ধরনের গুরুত্ববোধ তৈরি করে। তারা অনুভব করে যে তাদের উপস্থিতি এবং শরীর অন্যদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম, যা তাদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক ক্ষমতার ধারণাকে প্রভাবিত করে। এই প্রভাব কখনো সচেতন, কখনো অচেতন—কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তরুণীরা মনে করতে শুরু করে যে তারা সবকিছু এবং সবাইকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম। শরীরের গুরুত্ব কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার অনুভূতির একটি উৎস।
বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়াটি আরো জটিল হয়ে ওঠে, কারণ, এখানে তরুণীরা একদিকে প্রকাশ্যভাবে ধর্মীয় ও নৈতিক পরিচয় বজায় রাখে, অন্যদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মনোযোগ-নির্ভর আচরণে অংশগ্রহণ করে। ফলে তরুণীদের আত্মপরিচয় ও নৈতিকতা এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা গ্রহণ করে—একটি প্রকাশ্য, অন্যটি ব্যক্তিগত। এই দ্বৈততা ব্যক্তিগত ভণ্ডামি নয়, বরং এটি ভিন্ন সামাজিক পরিসরে ভিন্ন প্রত্যাশার প্রতিক্রিয়া।
সামগ্রিকভাবে, মনোযোগের অর্থনীতি, কনটিনিউয়াস ডিজিটাল মেল গেজ এবং শরীরকেন্দ্রিক আত্মমূল্যায়ন একত্রে বাংলাদেশের তরুণীদের পরিচয় নির্মাণের নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। এই বাস্তবতা সরলভাবে ভালো বা খারাপ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়া, যা বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং সচেতন আলোচনার মাধ্যমে মোকাবিলা করা জরুরি।
References
-
Marwick, A. & boyd, d. (2011). I tweet honestly, I tweet passionately: Twitter users, context collapse, and the imagined audience. New Media & Society, 13(1), 114–133.
-
Tiggemann, M., & Slater, A. (2014). NetGirls: The Internet, Facebook, and body image concern in adolescent girls. International Journal of Eating Disorders, 47(6), 630–643.
-
Tolman, D. L. (2002). Dilemmas of Desire: Teenage Girls Talk About Sexuality. Harvard University Press.
-
Ringrose, J., Harvey, L., Gill, R., & Livingstone, S. (2013). Teen girls, sexual double standards and ‘sexting’: Gendered value in digital image exchange. Feminist Theory, 14(3), 305–323.
