বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করা শুধু বাজারের প্রতিযোগিতা বা পুঁজি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি প্রায়শই একটি জটিল প্রশাসনিক ও অনানুষ্ঠানিক খরচের ব্যবস্থার সঙ্গে লড়াই করার নাম। ব্যবসায়ীরা আজ এমন এক বাস্তবতার মধ্যে কাজ করেন যেখানে নিয়মের পাশাপাশি “অদৃশ্য খরচ” ব্যবসার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অতিরিক্ত খরচের বড় একটি অংশ চলে যায় বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর পেছনে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা ক্রমশ সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন।

নীতিগত অসঙ্গতি ও ভ্যাটের বাস্তবতা
বাংলাদেশে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর সাধারণভাবে বিক্রয়মূল্যের ওপর নির্ধারিত হয়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একজন ব্যবসায়ী মাসে ১ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করলেন। যদি ভ্যাটের হার ৫ শতাংশ হয়, তবে তাকে ৫ লাখ টাকা ভ্যাট দিতে হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিক্রয়মূল্য আর প্রকৃত লাভ এক বিষয় নয়। ব্যবসার ভাড়া, শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ, পরিবহন, কাঁচামাল, ব্যাংক সুদ—সব খরচ বাদ দিলে দেখা যেতে পারে ব্যবসায়ী হয়তো ৫ লাখ টাকাও লাভ করতে পারেননি। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, তিনি ৫ লাখ টাকা ভ্যাট দেবেন কীভাবে? অর্থাৎ এখানে পলিসিতে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। বলা যায়— ভ্যাট আদায়ের পলিসি ঘুষ-দুর্নীতি বান্ধব।
এই অবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে কাস্টমস্ প্রশাসনের সঙ্গে “সমঝোতা” তৈরি হয়। নীতিগত সমাধানের পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন বা ঘুষের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার চেষ্টা হয়। ফলে রাষ্ট্র যেমন প্রকৃত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়, তেমনি ব্যবসায়ীর ওপরও অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পড়ে। দিনশেষে ভোক্তারাই ভিত্তি হিসেবে চাপের পুরোটার ভুক্তভোগী হয়।
আয়কর ব্যবস্থার জটিলতা
আয়করের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্নভাবে কাজ করে, কর ফাঁকির প্রবণতা দেখা যায়। কর প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা, অডিটের ভয়, কাগজপত্রের জটিলতা— সব মিলিয়ে একটি অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি হয়। এতে ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের মধ্যে স্বচ্ছ সম্পর্ক গড়ে ওঠার পরিবর্তে এক ধরনের অবিশ্বাসের সংস্কৃতি তৈরি হয়।
বহুমুখী প্রশাসনিক চাপ
কর ব্যবস্থার বাইরেও ব্যবসায়ীদের ওপর নানা ধরনের প্রশাসনিক চাপ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খরচ, স্থানীয় প্রশাসনের নানা দাবি, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার লাইসেন্স ও ফি, ভোক্তা অধিকার সংক্রান্ত অভিযানের খরচ, এমনকি রাজনৈতিক চাঁদাবাজি— সব মিলিয়ে ব্যবসার ওপর একটি বড় আর্থিক বোঝা তৈরি হয়।
ধরা যাক একটি রেস্টুরেন্ট ব্যবসার কথা। এই খাতটি নিয়ন্ত্রণ করে বহু সংস্থা— যেমন, নিরাপদ খাদ্য, স্যানিটেশন, বিএসটিআই, সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ, ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ, অগ্নিনির্বাপন বিভাগসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। কাগজে-কলমে এই তদারকির উদ্দেশ্য নাগরিকের নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ সময় এই তদারকি পরিণত হয় অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থায়।
সমাজকল্যাণমূলক কাজের সংকোচন
এই পরিস্থিতির একটি বড় সামাজিক প্রভাব হলো সমাজকল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যাওয়া। ব্যবসায়ীরা যখন দেখেন যে তাদের আয়ের একটি বড় অংশ অনিবার্য প্রশাসনিক খরচে চলে যাচ্ছে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই দাতব্য বা সামাজিক কাজে ব্যয় কমিয়ে দেন।
এক সময় ব্যবসায়ী সমাজ স্কুল, হাসপাতাল, দাতব্য তহবিল কিংবা দরিদ্র মানুষের সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, আগে টিকে থাকা জরুরি— সামাজিক দায়বদ্ধতা পরে।
একটি ভারী প্রশাসনিক কাঠামো
বাংলাদেশে কয়েক লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থায় কাজ করেন। তাদের একটি বড় অংশের দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিলো নাগরিক সেবা ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা। কিন্তু যখন সেই কাঠামোর বড় একটি অংশ অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন সেটি অর্থনীতির ওপর পাথরের মতো চাপ তৈরি করে।
ফলে ব্যবসায়ী হয়রানির শিকার হন, নাগরিকেরা উচ্চমূল্য ও নিম্নমানের সেবার ভুক্তভোগী হন, এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার
সমস্যাটির সমাধান ব্যক্তিগত পর্যায়ের নৈতিকতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। কর নীতির বাস্তবসম্মত সংস্কার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংখ্যা ও ভূমিকার সমন্বয়, ডিজিটাল ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা, এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা —এসব পদক্ষেপ ছাড়া এই পরিস্থিতি বদলানো কঠিন।
যে পরিবেশে ব্যবসা সহজ হবে, সেখানে রাজস্বও বাড়বে এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজের ক্ষেত্রও প্রসারিত হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তি মূলত উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই শক্তিকে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বোঝার নিচে চাপা না দিয়ে, বরং একটি ন্যায্য ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার মাধ্যমে তাকে বিকশিত করার সময় এখনই।
