ইতিহাসের কলঙ্কঃ নিদারাবাদ হত্যাকাণ্ড—শিশু সম্তানদের সামনে মাকে হত্যা করার পর হত্যা করা হয় পাঁচ শিশু সন্তানকে

ব্রাহ্মণবাড়ীয়া

১৯৮৭ সাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা বর্তমানে বিজয়নগর উপজেলার নিদারাবাদ গ্রামের শশাঙ্ক দেবনাথকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। গ্রামবাসী বা তার পরিবার কেউ জানতো না শশাঙ্ক কোথায়। দুই বছর পর ১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এবার হঠাৎ উধাও হয়ে গেলো শশাঙ্কের পুরো পরিবার। এক রাতেই হাওয়া শশাঙ্ক দেবনাথের স্ত্রী বিরজাবালা ও তার ৫ সন্তান।

দেবনাথ পরিবার
নিদারাবাদ হত্যাকাণ্ড। প্রতীকী ছবি।

 

গ্রামের দুতিনজন প্রচার করে বেড়াচ্ছিলো যে, শশাঙ্ক আগেই ভারতে চলে গিয়েছে। তারপর সুযোগ মতো তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের অতি সঙ্গোপনে নিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে গ্রামের কয়েক জন দাবী করে বলতে থাকে যে, শশাঙ্ক নিজে তার বাড়ীঘর ও জায়গাজমি দাবীকৃতদের কাছে বিক্রি করে গেছে। দাবীকৃতদের একজন পাশের গ্রামের তাজুল কসাই। শশাঙ্কের সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দাবীকৃতদের মধ্যে একাধিকবার ঝগড়াঝাটি হলেও এক সময় তা আবার মিটে যায়।

এই ঘটনায় নিদারাবাদ গ্রামের লোকজন শশাঙ্ককে গালাগালও করতে থাকে। শালা মালাউন এক সম্পত্তি ৩ জনের কাছে বিক্রি করে গেছে। বেঈমান, মীরজাফর দেশদ্রোহী ইত্যাদি বলে। কিছুদিন পরে স্কুল শিক্ষক আবুল মোবারক একদিন পড়ন্ত বিকেলে স্কুল থেকে বাড়ী ফেরার পথে ধোপাজুড়ি বিলের পানিতে দুর্গন্ধযুক্ত তেল ভাসতে দেখেন। মাস্টার তার নৌকার গতিপথ একটু ঘুড়িয়ে নিতেই হঠাৎ কী যেন একটায় নৌকাটি আটকে যায়। নৌকা সরাতে গিয়ে মাঝির বৈঠায় এক ধরনের খটখটে আওয়াজ হয়। এতে মাস্টার আবুল মোবারকের সন্দেহ আরো ঘনিভুত হতে থাকে। মাস্টারের নির্দেশে মাঝি বৈঠা দিয়ে পানির নীচে খটখট করতেই ভেসে ওঠে একটি ড্রাম। এ ঘটনায় আবুল মাস্টার ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার ও গণ্যমান্যদের দ্রুত খবর দেন।

চেয়ারম্যানের নির্দেশে ড্রাম তুলে খোলার সাথে সাথে সবাই হতভম্ব ও স্তব্ধ হয়ে যায়। তেলের ড্রামের মধ্যে টুকরো করা ৩টি লাশ। এরপর সন্ধান চালিয়ে আরও একটি ড্রাম উদ্ধার করে তাতে টুকরো করা আরও ৩টি লাশ মোট ৬ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়। এরাই ছিলো নিদারাবাদ গ্রামের নিরীহ হতভাগ্য শশাঙ্ক দেবনাথের স্ত্রী বিরজাবালা ও তার অবুঝ ৫ সন্তানের লাশ। বিরজাবাল (৪৫) কন্য নিয়তিবালা (১৭) প্রণতিবালা (১০) পুত্র সুভাষ দেবনাথ (১৪) সুপ্রসন্ন দেবনাথ সুমন (৫) ও সুজন দেবনাথ (২)।

এই শিশুদের সামনেই প্রথমে মাকে কেটে হত্যা করা হয়েছিলো। মাকে যখন হত্যা করছিলো শিশুরা তখন থরথর করে কাঁপছিলো এবং শিশুদের প্রাণভিক্ষা করছিলো। এরপর একে একে শিশুদেরকেও হত্যা করা হয়। কী নির্মম!

শশাঙ্ক দেবনাথের বাড়ীঘর, জায়গাজমি দখল করার নিকৃষ্ট পরিকল্পনা থেকে তাজুল কসাই তার সঙ্গীদের নিয়ে প্রথমে শশাঙ্ককে খুন করে গুম করে ফেলে। তারপরে এক রাতে পুরো পরিবারের সদস্যদের (বিরজাবালা ও তার ৫ সন্তানকে) নৌকায় তুলে মধ্য বিলে নিয়ে হত্যা করে ৬ টি লাশ টুকরো করে ২টি তেলের ড্রামে ভরে লাশ পচনের জন্য চুনা দিয়ে ড্রামের মুখ আটকিয়ে পাথর বেঁধে বিলের পানিতে ডুবিয়ে রেখেছিলো। সম্পত্তি গ্রাসের লোভে একটি নিরীহ সংখ্যালঘু পরিবারের ৭ জন নারী শিশুসহ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে আবার গ্রামবাসী মিলে দেওয়া হয় সাম্প্রদায়িক অপবাদ! কী অভিনব নাটক সাজিয়ে ছিলো— গ্রামের মানুষ খুনিদের বিশ্বাস করে উল্টো হতভাগ্য শশাঙ্ককেই গালাগাল দিচ্ছিলো।


লেখকঃ শ্যামল কুমার রায়, সাবেক ছাত্রনেতা