কাস্টমসে “বন্ড সুবিধা” বলতে এমন একটি শুল্ক সুবিধাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে আমদানিকারকরা শুল্কমুক্ত কাঁচামাল বা পণ্য আমদানি করতে পারেন। এই সুবিধা মূলত একশতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রযোজ্য।
♣ বন্ড সুবিধার মূল উদ্দেশ্য
বন্ড সুবিধার প্রধান লক্ষ্য হলো রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এই সুবিধার আওতায়, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। পরবর্তীতে, উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে বিদেশি মুদ্রা অর্জন করা হয়।
♣ বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত পণ্য
বন্ড সুবিধার আওতায় বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল ও পণ্য আমদানি করা হয়, যেমনঃ
-
কাপড় ও সুতা
-
রং ও প্রিন্টিং উপকরণ
-
প্যাকেজিং আইটেম
-
টেক্সটাইল কেমিক্যাল
-
লেবেলিং উপকরণ ইত্যাদি।
এইসব পণ্য মূলত রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
⚠️ বন্ড সুবিধার অপব্যবহার
দুর্ভাগ্যবশত, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে। তারা ভুয়া তথ্য-ঘোষণার মাধ্যমে অতিরিক্ত কাঁচামাল আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়। এতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয় এবং বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতিযোগিতা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
✅ বন্ড সুবিধার শর্তাবলী
বন্ড সুবিধা পেতে হলে নিম্নলিখিত শর্তাবলী পূরণ করতে হয়ঃ
-
শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি একশতভাগ রপ্তানিমুখী হতে হবে।
-
শুল্কমুক্ত কাঁচামাল শুধুমাত্র উৎপাদন কাজে ব্যবহার করতে হবে।
-
উৎপাদিত পণ্য অবশ্যই রপ্তানি করতে হবে।
-
নিয়মিত নিরীক্ষা ও অডিটের মাধ্যমে কার্যক্রম তদারকি করতে হবে।
এই শর্তাবলী নিশ্চিত করতে কাস্টমস বিভাগ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে।
⚠️ বন্ডে যে কারণে ব্যাপক দুর্নীতি হয়ঃ
১. নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির অভাবঃ যথাযথ মনিটরিং ও অডিটের অভাবে কর্মকর্তারা অনিয়ম করতে পারেন।
২. জটিল নিয়ম-কানুনঃ কাস্টমস ও বন্ড সেকশনের নিয়মাবলী জটিল হওয়ায়, ব্যবসায়ীরা দুর্নীতির আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে পারেন।
৩. দায়বদ্ধতার অভাবঃ কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে দুর্নীতি বেড়ে যেতে পারে।
৪. প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার: ডিজিটাল সিস্টেমের অভাবে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির সুযোগ থাকে।
৫. অভিযোগ নিষ্পত্তির দুর্বলতাঃ দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া দুর্বল হলে অনিয়ম বাড়তে পারে।
♥ ভয়াবহ বন্ড দুর্নীতির কয়েকটি উদাহরণঃ
বাংলাদেশে কাস্টমস বন্ড সেকশনে দুর্নীতি একটি প্রতিষ্ঠিত সমস্যা, যার নানা ধরন এবং পারপেট্রেটরদের (অবৈধ সিন্ডিকেট, কর্মকর্তা-ব্যবসায়ী চক্র) ব্যাপক জড়িততা রয়েছে।
কিছু চিত্র তুলে ধরা হলোঃ
চট্টগ্রামের প্রায় ১০০টি গার্মেন্টস কোম্পানি (Tk ৩৯১ কোটি রাজস্ব ফাঁকি)
-
গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড সেকশন থেকে ৭৯০ কোটি টাকার পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়, যার ফলে প্রায় ৩৭১ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার মামলা হয়।
২. খুলনায় ৫১টি প্রতিষ্ঠান (Tk ৩.২৯ কোটি জরিমানা)
-
২০২০ সালের জুলাই–২০২১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৫১টি কোম্পানি বন্ড লাইসেন্সের মাধ্যমে বেশি পণ্য আমদানি ও ভুল বা ভুয়া HS কোড ব্যবহার করে; Tk ৩.২৯ কোটি জরিমানা করা হয়েছে।
৩. নারায়ণগঞ্জে ১০ টন চিরুনি (Tk ১ কোটি মূল্যের পণ্য)
-
চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের অনুসন্ধানে নারায়ণগঞ্জের Tanbazar‑এ Bismi Yarn Trading এর ১০ টন চিরুনি (যার মূল্য Tk ১ কোটি) সরবরাহ বন্ধ করে রাখা হয়, কারণ এটি Duty‑free আমদানির পর স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা যাচ্ছিল।
৪. চট্টগ্রামে ১০৭ টন ফ্যাব্রিকস উদ্ধার (Tk ৫.১০ কোটি মূল্যের পণ্য)
-
চট্টগ্রামে Goldtex Garments নামে একটি চীনা কোম্পানি সীমাবদ্ধ বন্ডের বাইরে আমদানি করা ফ্যাব্রিকস (টাকা ৫.১০ কোটি মূল্যের), CIID অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করে; যদি এগুলো সাধারণ বাজারে বিক্রি হতো তবে Tk ২.৮৮ কোটি ডিউটি বাকি পড়তো।
৫. Axiom Fashion Ltd (Tk ৩০‑৩১ কোটি জরিমানা & বন্ড লাইসেন্স বাতিল)
-
২০১৬–২০২২ সালের কার্যক্রমে Axiom Fashion Tk ১৩.৫৬ কোটি অডিটে অস্বচ্ছতা ও Tk ৬.৫৬ কোটি রাজস্ব ফাঁকি ধরা পড়ে; Tk ৩১ কোটি জরিমানা ও বন্ড লাইসেন্স বাতিল করা হয়।
সংক্ষিপ্ত চিত্র–টেবিল
উদাহরণ / প্রতিষ্ঠান | অপরাধ কী ছিল? | আর্থিক প্রভাব |
---|---|---|
চট্টগ্রামের গার্মেন্টস | বন্ডে আমদানি পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি | Tk ৩৭১ কোটি ফাঁকি |
৫১ কোম্পানি (চট্টগ্রাম) | অতিরিক্ত পণ্য, ভুল HS কোড ব্যবহার | Tk ৩.২৯ কোটি জরিমানা |
Bismi Yarn Trading | বিক্রি ১০ টন Duty‑free চিরুনি | Tk ১ কোটি মূল্যের পণ্য হারানো |
Goldtex Garments | ফ্যাব্রিকস বিক্রয়ে চলছিল যন্ত্রণা | Tk ৫.১০ কোটি উদ্ধার, Tk ২.৮৮ কোটি শুল্ক এড়ানো |
Axiom Fashion Ltd | অডিট অযোগ্যতা, রপ্তানি প্রমাণ নেই | Tk ১৩‑৩০ কোটি জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল |
⚠️ উদাহরণগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য
১. রপ্তানি শর্ত লঙ্ঘনঃ বন্ড সুবিধা পাওয়া পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা।
২. অনুপযুক্ত বা ভুল HS কোডঃ ভিন্ন কোডের মাধ্যমে লাগামহীন আমদানি করানো।
৩. নিয়ন্ত্রণ ও অডিটের দুর্বলতাঃ যথেষ্ট তদারকি ও স্বচ্ছতা না থাকায়, দুর্নীতি সহজ হয়ে ওঠে।
৪. লোকবল ও মনিটরিং অভাবঃ সীমিত কর্মকর্তা ও অভাবসময় তদারকি সঠিক হয়নি।
✅ প্রতিরোধে কিছু সুপারিশ
-
স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম চালু করাঃ বন্ড লাইসেন্স ইস্যু, Utilization Declaration, MIS রিপোর্ট ইত্যাদি অনলাইনে পরিচালনা করা।
-
ব্যাংকের ও NBR-এর সংহত অডিটঃ আন্তর্জাতিক মানের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োগ করে বন্ড ব্যবহার পর্যবেক্ষণ।
-
বন্ড কমিশনারের পর্যাপ্ত নিয়োগঃ প্রত্যেক কমিসনিয়ারে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও জনবল নিশ্চিত করা।
-
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতাঃ ফৌজদারি মামলা, লাইসেন্স বাতিল এবং জরিমানা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা।