কাস্টমস্ অফিসারেরা যেভাবে স্মাগলারদের মনস্তাত্ত্বিক দাসে পরিণত হয়

দুর্নীতি

কাস্টমস অফিসারদের কিছু কিছু ক্ষেত্রে চোরাকারবারিদের (স্মাগলারদের) দাসে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াটি হয় ধাপে ধাপে, একটি দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক প্রলোভনের মাধ্যমে। নিচে ব্যাখ্যা করা হলো কিভাবে একজন কাস্টমস অফিসার ধীরে ধীরে স্মাগলারদের সহযোগীতে বা দাসে পরিণত হয়ঃ


দুর্নীতি
প্রতিকী ছবিঃ

ধাপ ১: প্রথম যোগাযোগ – “সামান্য সুবিধা”

  • স্মাগলাররা প্রথমে কাস্টমস অফিসারদের “সাধারণ” অনুরোধ করে যেমন:
    “এই ট্রাকটা একটু চেক না করে ছেড়ে দেন”, “জিনিসপত্র একটু কম ডিউটি দেখিয়ে পাশ করে দেন”
  • তারা বিনিময়ে দেয় নগদ অর্থ, উপহার, ডিনার, বা পারিবারিক অনুরোধ পূরণ

এটা একধরনের পরীক্ষামূলক ফাঁদ।


ধাপ ২: নিয়মিত লেনদেন

  • অফিসার একবার সুবিধা দিলে, তারা দ্বিতীয়বারও অনুরোধ করে এবং বলে:
    “আপনার জন্য মাসিক ব্যবস্থাও করতে পারি”
  • ধীরে ধীরে, একজন অফিসার স্মাগলারদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কাজ ‘রুটিন’ হিসেবে করতে শুরু করে।

এটা থেকে তৈরি হয় আর্থিক নির্ভরতা এবং “না” বলার ক্ষমতা কমে যায়।


ধাপ ৩: ব্ল্যাকমেইল ও নিয়ন্ত্রণ

  • যদি কখনও অফিসার ‘না’ বলে, স্মাগলার বলে:
    “আপনার আগের ভিডিও/অডিও রেকর্ড আছে”, বা
    “আপনার সিনিয়রকে বলে দেবো আপনি আমাদের টাকা নিয়েছেন”
  • তখন অফিসার পুরোপুরি চোরাকারবারিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

এটি এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব


ধাপ ৪: অর্গানাইজড সিন্ডিকেটে যুক্ত হওয়া

  • স্মাগলিং সিন্ডিকেটে একজন অফিসারকে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়:
    • কে কোন পথে যাবে
    • কখন কন্টেইনার চেক করা হবে না
    • কোন ফাইল ‘গায়েব’ হবে
  • অফিসার হয়ে যান স্মাগলারদেরই একজন সদস্য, শুধু সরকারি পোশাক পরে।

ধাপ ৫: পরিবার ও নিরাপত্তা নিয়ে ভীতি

  • কিছু কিছু ক্ষেত্রে, অফিসারকে হুমকি দেওয়া হয়: “আপনার পরিবার কোথায় থাকে, জানি”
  • তাই তারা চুপচাপ দাসের মতো কাজ করতে বাধ্য হয়।

প্রতিকী
প্রতিকী ছবি।

বাস্তব উদাহরণঃ

  • নাইজেরিয়াঃ সাংবাদিক ছদ্মবেশে স্মাগলার হয়ে দেখেছেন, কাস্টম অফিসাররা টাকা নিয়ে রুট ক্লিয়ার করে দেয়।
  • নেপাল, পাকিস্তান, বাংলাদেশঃ স্থানীয়ভাবে কিছু কাস্টম অফিসার স্মাগলিং সিন্ডিকেটের নিয়মিত বেতনভুক্ত অংশ হয়ে পড়ে।

দুর্নীতি দমন কমিশনে চলমান কয়েকটি মামলার তথ্যের ভিত্তিতে এখানে কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হয়েছেঃ

১. চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ ও শুল্ক ফাঁকিঃ সিরিজ মামলা (২০২২)।

২. নিষিদ্ধ Sweetener ছাড়ঃ কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমঝোতা (২০২৪)

৩. Tk ২৪.৩ কোটি রাজস্বের চুরি ও কারার প্রক্রিয়া (২০১৬–২০২১)।

৪. Tk ৮৫০ কোটি শুল্ক ফাঁকিঃ কর্মকর্তা গ্রুপের কেলেঙ্কারি (২০২১)।

৫. ভুয়া ফর্মের মাধ্যমে গাড়ি আমদানিঃ C&F এজেন্ট–কাস্টমস সমঝোতা (২০১১)

৬. অবৈধ সম্পদ অর্জনঃ অবসরপ্রাপ্ত কাস্টমস কর্মকর্তারা (২০২৩–২০২৪)।


সারসংক্ষেপ

  • কাস্টমস কর্মকর্তারা ইনভয়েস, ঘোষণা ও লেনদেনের তথ্য জালিয়াতি করে রাজস্ব ফাঁকি করানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
  • ACC–এর মামলাগুলোতে স্পষ্ট যে C&F এজেন্ট, আমদানিকারক ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় এবং এই নেটওয়ার্ক কাজ করে ট্যাক্স ফাঁকি নিশ্চিত করতে।
  • বেশির ভাগ কেসে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজকে কেন্দ্র করে ঘটনার ধারা দেখা যায়, যেখানে সিগারেট, গাড়ি, সিএন্ডএফ এজেন্ট, নিষিদ্ধ পণ্য ব্যবহারে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টার তদন্ত হয়েছে।