রাজস্ব কর্মকর্তারা বললেন মিষ্টির দোকান থেকে ভ্যাট আদায়ে কড়াকড়ি রয়েছে, সোনার দোকানে কড়াকড়ি নেই কেনো?

খালিশপুর

খুলনা খালিশপুরের একটি জনপ্রিয় মিষ্টির দোকান পবিত্র ডেয়ারি। গত চল্লিশ বছর ধরে তিল তিল করে দোকানটি গড়ে তুলেছেন এ দোকানের কারিগর পবিত্র কুমার ঘোষ। সরোজমিনে জানা গিয়েছে— তিনি সুস্বাদু, পরিচ্ছন্ন এবং ভেজালমুক্ত মিষ্টি বানান। মাল ভালো করতে গিয়ে লাভের অংক তার কম। ভালো করেন বলে ছোট দোকান হলেও ক্রেতা আছে।

খালিশপুর
পবিত্র ডেয়ারি। খালিশপুর, খুলনা।

কিন্তু বর্তমানে তিনি ভ্যাট আতঙ্কে ভুগছেন। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন— দিনে গড়ে ৫০০০ টাকা বিক্রি হলে আমি কত লাভ করতে পারি? ঘর ভাড়া, কর্মচারির বেতন, বিদ্যুৎ বিল সহ অন্যান খরচ মিটিয়ে কত শতাংশ লাভ করা সম্ভব? দিনে ১০০০ টাকা নিট লাভ করাও কঠিন বলে তার বক্তব্য। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের তদারকিতে তার ব্যয় আছে বলে জানালেন।

ট্রেড লাইসেন্স, বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স সহ অন্যান্য লাইসেন্স নবায়নে খরচ আছে। মাস্তান এবং রাজনৈতিক উৎপাত আছে। সব মিলিয়ে ব্যবসা করা কঠিন বলে জানালেন। এর সাথে ভ্যাটের অতিরিক্ত চাপ দেওয়ায় তিনি নিপীড়িত বোধ করছেন।

পবিত্র ঘোষ বললেন, মিষ্টির ব্যবসা একটি কৃষিবান্ধব ব্যবসা। মিষ্টির প্রধান কাঁচামাল দুধ হওয়ায় গ্রামের খামারগুলো টিকে আছে মিষ্টির ব্যবসার ফলে। গরুর খামারের সাথে প্রান্তিক মানুষের অনেক ধরনের কর্ম জড়িত। মৃৎশিল্প টিকে আছে দইয়ের মালশার কারণে। ফলে জনবান্ধন এ ব্যবসা চাপে ফেলা জনগণের জন্য ক্ষতিকর বলে তিনি মনে করেন।

মাসে কত টাকা ভ্যাট দেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে ৬০০০ টাকা দিতাম, এখন ৮০০০ টাকা দিই। কর্মকর্তারা আরো বাড়ানোর কথা বলছেন। পবিত্র ঘোষ মিষ্টির ব্যবসা কৃষিবান্ধব ব্যবসার আওতায় নিয়ে ভ্যাটমুক্ত করার দাবী করেন।

ভ্যাট আদায়কারী রাজস্ব কর্মকর্তা শাহাজুল এ প্রসঙ্গে বলছেন, আমরা পদ্ধতিগতভাবে বিক্রয় জেনে নিতে পারি। সেক্ষেত্রে ৭.৫% হিসেবে পবিত্র ডেয়ারির ভ্যাট আরো বেশি আসে। ভ্যাটের অংক আপনিই নির্ধারণ করেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আদিষ্ট হয়ে কাজ করি। সকল দোকানে এবং সকল ব্যবসায় একই ধরনের চর্চা করেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, আমার ওপরের কর্মকর্তারা এ সকল বিষয়ে আরো ভালো বলতে পারবেন।

ভ্যাট দেন ক্রেতারা। সকল শ্রেণির ক্রেতাকেই ভ্যাটের চাপ নিতে হয়। একজন ভিক্ষুক বা রিক্সাচালক সবাই একই হারে ভ্যাট দিচ্ছেন। কিন্তু ভ্যাটের সুফল কি সকল শ্রেণির নাগরিকেরা সমানভাবে পাচ্ছেন? প্রশ্ন করেছেন খুলনা নাগরিক সমাজ-এর আহ্বায়ক সানজিদা খান শ্রাবণী। শ্রাবণী বলেন, দশ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে আট জনই ঘুষ প্রদানের কথা আমাদের বলেছেন। কারা ঘুষ নিচ্ছেন?

প্রসঙ্গত, লাদেশে ৯০ এর দশকে ভ্যাট চালুর যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিলো তা বর্তমানে দেশের রাজস্ব আয়ের অন্যতম বড় একটি উৎস।

২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে মোট মূসক আদায়ের পরিমাণ ছিলো ১ লাখ ২৫ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে, শুধুমাত্র জুন মাসেই আদায় হয়েছিল ১৫ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা (বিডিনিউজ)। ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরের তুলনায় মুসক আদায়ে ১৬% প্রবৃদ্ধি হয়েছে।২০২১-২২ অর্থবছরে মূসক থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিলো ১ লাখ ৮ হাজার ৪১৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা (বিবিসি)। সে বছর মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিলো ৩ লাখ ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এর মানে মোট রাজস্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশই এসেছিলো মূসক থেকে।
প্রশ্ন উঠেছে— প্রভ্যাশালীদের কাছ থেকে ঠিকঠাকভাবে ভ্যাট আদায় করা হলে, এবং দুর্নীতি কমলে ভ্যাট আদায় আরো বাড়াবে। তবে খুনাস-এর আহ্বায়ক সানজিদা খান শ্রাবণী বলছেন, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ব্যবসায়ীদের চাপ দিয়ে ভ্যাট আদায় করার ফলে বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে গেছে।

প্রভাবশালীরা ঠিকমতো ভ্যাট দেন কিনা এবং উচ্চপদস্থ অফিসারদের সাথে তাদের যোগসাজশ হয় কিনা জানতে ফলোআপ নিউজ-এর অনুসন্ধান রয়েছে স্বর্ণের ব্যবসার ওপর। মিষ্টির ব্যবসায় খড়গহস্ত হলেও স্বর্ণের ব্যবসার ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায়ে পুরোপুরি বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে। কেনো? এই ‘কেনো’-এর উত্তর খুঁজলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে।

স্বর্ণের ব্যবসা কীভাবে চলছে জানতে ফলোআপ নিউজ-এ চোখ রাখুন।