রাশিয়া এবং ভারত কেনো কৌশলগতভাবে ইরানের বর্তমান সরকারকে সমর্থন দেয়?

ইরান

রাশিয়া ও ভারত নৈতিক কারণে নয়, বরং কৌশলগত স্বার্থে ইরানের বর্তমান (খোমেনিবাদী) সরকারকে সমর্থন বা অন্তত সমালোচনা থেকে বিরত থাকে।

ইরান
ইরানের মানবাধিকার প্রশ্নে ভারত ও ইরান কেনো নিশ্চুপ।

কেনো রাশিয়া ইরানের বর্তমান সরকারকে সমর্থন দেয়?

রাশিয়া–ইরান সম্পর্ক মূলত দাঁড়িয়ে আছে পশ্চিমবিরোধী কৌশলগত জোটের ওপর।

১. অভিন্ন শত্রুঃ যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব

রাশিয়া ও ইরান— দু’টিই দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য।
ইরানের সরকার দুর্বল হলে বা পশ্চিমাপন্থী সরকার এলে,
➝ রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হারাবে।
তাই রাশিয়ার কাছে খোমেনিবাদী সরকার টিকে থাকা মানেই
➝ পশ্চিমের প্রভাব ঠেকানো।

২. সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা

ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া ইরান থেকে ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তি পেয়েছে।
বিনিময়ে রাশিয়া ইরানকে দিয়েছেঃ
♦ অস্ত্র প্রযুক্তি
♦ কূটনৈতিক সুরক্ষা (জাতিসংঘে ভেটো বা নরম অবস্থান)
খোমেনিবাদী সরকার না থাকলে এই সহযোগিতা ভেঙে পড়বে।

৩. সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণ

সিরিয়ায় আসাদ সরকার টিকে আছে মূলত রাশিয়া–ইরান জোটের কারণে।
ইরানে সরকার পরিবর্তন হলেঃ
রাশিয়ার মধ্যপ্রাচ্য কৌশল দুর্বল হবে
ইসরায়েল ও পশ্চিমা প্রভাব বাড়বে
➡️ তাই রাশিয়ার কাছে ইরানের মানবাধিকার লঙ্ঘন অপ্রাসঙ্গিক;
রাষ্ট্র টিকে থাকাই মুখ্য।

ভারত কেন ইরানের বর্তমান সরকারকে সমর্থন বা সহনশীলতা দেখায়?

ভারতের অবস্থান আরও সূক্ষ্ম। এটি সরাসরি সমর্থন নয়, বরং কৌশলগত নীরবতা ও ভারসাম্য।

১. চাবাহার বন্দর: ভারতের জন্য জীবনরেখা

ইরানের চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই বন্দর ব্যবহার করে ভারত:
পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় পৌঁছায়।
খোমেনিবাদী সরকার না থাকলে বা সরকার অস্থির হলে:
চাবাহার প্রকল্প অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তাই ভারত ইরানের সরকারকে প্রকাশ্যে চাপ দেয় না।

ইরানের চাবাহার বন্দর।

২. জ্বালানি নিরাপত্তা
ইরান ঐতিহাসিকভাবে ভারতের বড় তেল সরবরাহকারী।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ভারত কৌশলে সম্পর্ক ধরে রাখে।
সরকার পরিবর্তন বা গৃহযুদ্ধ হলে জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়বে।

৩. চীন-পাকিস্তান ভারসাম্য

ইরান যদি পুরোপুরি চীনের বলয়ে চলে যায় ভারত কৌশলগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাই ভারত চায়ঃ

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে, কিন্তু প্রকাশ্যে খোমেনিবাদ সমর্থনও না দিতে।

৪. “Non-interference” নীতি

ভারত ঐতিহ্যগতভাবে বলেঃ

“অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়”

এই নীতির আড়ালে ভারত মানবাধিকার প্রশ্নে নীরব থাকে,যা বাস্তবে ক্ষমতাসীন সরকারকে সুবিধা দেয়।

তাহলে মানবাধিকার প্রশ্নে তারা নীরব কেন?

কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠিন সত্য হলো মানবাধিকার তখনই গুরুত্বপূর্ণ, যখন তা কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।

রাশিয়ার জন্য ইরান = পশ্চিমবিরোধী দুর্গ
ভারতের জন্য ইরান = ভূরাজনৈতিক করিডর ও শক্তির ভারসাম্য।

তাহলে আদর্শবাদ আসলে কোথায়?

এসব বিষয় এই রাষ্ট্রগুলোর কাছে নৈতিক উদ্বেগ,
কিন্তু নীতিনির্ধারণী অগ্রাধিকার নয়। রাশিয়া ইরানকে সমর্থন দেয় পশ্চিমা প্রভাব ঠেকাতে ও সামরিক জোট বজায় রাখতে। ভারত ইরানকে সহনশীলতা দেখায় চাবাহার, জ্বালানি ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য।খোমেনিবাদী সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন— দু’টো দেশের কাছেই গৌণ বিষয়। এর ফলেই ইরানের রাষ্ট্রীয় দমননীতি আন্তর্জাতিকভাবে কার্যত দায়মুক্ত থাকে।