সমাজতত্ত্ব ও মার্কসবাদী তত্ত্ব অনুসারে, মানুষের নৈতিক চর্চা ও সামাজিক আচরণ অর্থনৈতিক কাঠামো ও শ্রেণী অবস্থানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। বাংলাদেশে দরিদ্র শ্রেণির মধ্যে নৈতিক চর্চার অবনতি এবং লুম্পেন প্রোলেতারিয়েতের বিস্তার একটি তীব্র সামাজিক সমস্যা। লুম্পেন প্রোলেতারিয়েত, যা মার্কসের ভাষায় সমাজের শ্রমজীবী, অপ্রাতিষ্ঠানিক এবং নিয়মবিধির বাইরে থাকা শ্রমিক শ্রেণি। এর বিস্তার মূলত পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রসঙ্গটি তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উদাহরণের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করার সুযোগ রয়েছে।
মার্কসবাদে, শ্রমজীবী শ্রেণী মূলত দুই ভাগে বিভক্ত—প্রোলেতারিয়েত এবং লুম্পেন প্রোলেতারিয়েত। প্রোলেতারিয়েত হলো উৎপাদনশীল শ্রমজীবী, যারা সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থায় সংযুক্ত; অন্যদিকে লুম্পেন প্রোলেতারিয়েত হলো শ্রমের বাজারের বাইরে থাকা বা অনিয়মিত শ্রমিক, যারা বেঁচে থাকার জন্য আইন, নৈতিকতা এবং সামাজিক নিয়ম অগ্রাহ্য করে।
মার্কস বলেন, লুম্পেন প্রোলেতারিয়েতের বৃদ্ধি মূলত পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার বৈষম্যের ফল। দীর্ঘস্থায়ী দরিদ্রতা, বেকারত্ব, এবং সামাজিক সুরক্ষা না থাকার কারণে দরিদ্র জনগণ নৈতিক চেতনা হারাতে থাকে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তাদেরকে অপরাধমূলক, অরাজনৈতিক বা শোষণমূলক কর্মকাণ্ডে প্ররোচিত করে।
বাংলাদেশে নগর ও গ্রামীণ দরিদ্রদের মধ্যে সামাজিক ও নৈতিক অবনতি লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, নগর দরিদ্রদের মধ্যে আনুমানিক ৩০-৪০% পরিবার দৈনন্দিন জীবনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সামাজিক নিয়ম, নৈতিক চর্চা ও শিক্ষার প্রতি মনোযোগ দিতে অক্ষম। হকার, দিনমজুর, বা অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা ও নৈতিক চেতনার অবনতির প্রভাব দৃশ্যমান।
সাম্প্রতিক ঘটনা যেমন সাভারের সিরিয়াল কিলার “মশিউর রহমান সম্রাট” প্রমাণ করে যে, লুম্পেন প্রোলেতারিয়েত শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রভাবের ফল। এই ধরনের কর্মকাণ্ড দরিদ্রদের মধ্যে সামাজিক নিয়ম ও নৈতিকতার অবক্ষয়কে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
বাংলাদেশে দরিদ্র শ্রেণির নৈতিক চর্চা ভাঙার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছেঃ
১. অর্থনৈতিক বৈষম্য: দীর্ঘমেয়াদী দরিদ্রতা ও বেকারত্ব মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য যে কোনো পথ অবলম্বনের দিকে প্ররোচিত করে।
২. শ্রেণী বৈষম্য: পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকদের উৎপাদনের মূল্য কমে যাওয়ায় সামাজিক মর্যাদা ও আত্মসম্মান হারায়।
৩. সামাজিক নিরাপত্তার অভাব: স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব নৈতিক চেতনা ক্ষয় করে।
৪. সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক ভাঙন: দরিদ্র পরিবারের অস্থিতিশীলতা শিশু ও যুব সমাজকে নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করে।
বাংলাদেশে দরিদ্র শ্রেণির নৈতিক চর্চার অবনতি এবং লুম্পেন প্রোলেতারিয়েতের বিস্তার শুধুমাত্র ব্যক্তিগত দোষ নয়; এটি পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব। নৈতিক চেতনা ও সামাজিক নিয়ম পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র, সমাজ এবং নীতি নির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, এবং আয়ের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করাই লুম্পেন প্রোলেতারিয়েতের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।
