বাগেরহাটের ট্র্যাজেডি রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক নিপীড়ন ও সামাজিক অবহেলার ভয়াবহ মূল্য উন্মোচন করে।
বাগেরহাট, বাংলাদেশ
বাগেরহাট জেলায় ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় কানিজ স্বর্ণালী নামে এক তরুণী মা এবং তার নয় মাসের শিশু সন্তান মৃত্যুবরণ করেছে। শিশু সন্তানকে হত্যা করে মা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন বলে বলা হচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, বরং ধারাবাহিক রাজনৈতিক আটক, চরম দারিদ্র্য, সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ব্যর্থতার সরাসরি ফল।
স্বর্ণালীর স্বামী, ২২ বছর বয়সী ছাত্রলীগ কর্মী, দীর্ঘদিন ধরে আটক রয়েছেন। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন, যে দলটি আগে ক্ষমতায় থাকলেও বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে। ক্ষমতার এই পরিবর্তনের পর থেকেই মাঠপর্যায়ের কর্মী ও তাদের পরিবারগুলো পড়েছে চরম অনিশ্চয়তা, প্রতিহিংসা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে।

বিচার ছাড়াই একটি পরিবারের শাস্তি
স্বামীর আটকের পর স্বর্ণালী কার্যত সবকিছু হারান—
◊ উপার্জনের কোনো উৎস;
◊ আইনি সহায়তা;
◊ সামাজিক নিরাপত্তা;
◊ কিংবা কার্যকর কোনো রাষ্ট্রীয় কল্যাণব্যবস্থা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে চরম অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত পরিবারের নারী হওয়ায় এই চাপ আরো বহুগুণ বেড়ে যায়।
রাজনৈতিক পালাবদল, মানবিক বিপর্যয়
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ–সংযুক্ত পরিচয় অনেক জায়গায় হয়ে উঠেছে ঝুঁকির কারণ। মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পালাবদল কার্যত “সমষ্টিগত শাস্তিতে” রূপ নিচ্ছে, যেখানে কর্মীদের পাশাপাশি তাদের পরিবার— বিশেষ করে নারী ও শিশুরা নীরবে মূল্য দিচ্ছে।
দীর্ঘ আটক, সময়মতো বিচার না হওয়া, এবং রাজনৈতিক অপবাদ— সব মিলিয়ে পরিবারগুলোকে ধীরে ধীরে সামাজিক মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।
জামায়াতে ইসলামি ও অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ
নাগরিক সমাজ ও সমালোচক মহল জামায়াতে ইসলামি এবং ড. মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন।
তাদের অভিযোগ—
♣ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলোকে পরিকল্পিতভাবে “ফ্যাসিবাদী” আখ্যা দেওয়া হচ্ছে;
♣ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের গ্রেপ্তার, সামাজিক কলঙ্ক ও অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা হচ্ছে;
♣ আটক ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর জন্য কোনো মানসিক স্বাস্থ্য, আইনি সহায়তা বা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
এই পরিবেশে, সমালোচকদের মতে ভয়, একাকিত্ব ও অসহায়ত্বকে আরো গভীর করে তোলে, যার সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার হন স্বর্ণালীর মতো নারীরা।
এটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, সম্মিলিত ব্যর্থতা মানবাধিকার সংগঠনগুলো জোর দিয়ে বলছে, এটি কোনো একক পরিবারের ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়। এখানে একসঙ্গে কাজ করেছে—
♦ দীর্ঘ রাজনৈতিক আটক;
♦ নারী ও মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি চরম অবহেলা;
♦ কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি
এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি;
♦ ফলে তৈরি হয়েছে একটি অপূরণীয় মানবিক ক্ষতি।
একজন মানবাধিকারকর্মীর ভাষায়,
“এটি শুধু একজন মা ও একটি শিশুর মৃত্যু নয়। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব, রাজনীতির নৈতিকতা এবং মানবিকতার মৃত্যু।”
জবাবদিহির দাবি
এই ঘটনার পর নাগরিক সমাজ থেকে দাবি উঠেছে—
◊ স্বামীর আটক ও তার পরিণতি নিয়ে স্বাধীন বিচারবিভাগীয় তদন্ত;
◊ রাজনৈতিক বন্দিদের পরিবারগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক, আইনি ও মানসিক সহায়তা;
◊ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় রাষ্ট্রীয় মদদ বন্ধ করা।
কানিজ স্বর্ণালীর মৃত্যু আজ একটি নির্মম সত্য সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—
যখন রাজনৈতিক আটক কারাগারের দেয়াল পেরিয়ে পরিবারে পৌঁছে যায়, তখন তা নীরব মৃত্যুদণ্ডে রূপ নেয়।
