স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পরও বর্তমান সরকার নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা সাদ্দামকে কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সবখানে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকের বক্তব্য— সাদ্দামের পরিবার আবেদন করেনি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক স্বীকার করেছে যে, সাদ্দামের পরিবার প্যারোলের আবেদন করেছিলো। তবে প্যারোল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান। তবে আইন এবং ইতিহাস বলছে জেলা প্রশাসক একক সিদ্ধান্তে সাদ্দামের জন্য “এস্কর্টেড লিভ”-এর ব্যবস্থা করতে পারতেন। এমনকি এজন্য কোনো আবেদনেরও প্রয়োজন হয় না।

গত শুক্রবার বিকালে বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের সাবেকডাঙা গ্রাম থেকে কারাবন্দী ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম এবং তার স্ত্রী সুবর্ণা স্বর্ণালী (২২) এবং তাদের নয় মাস বয়সী ছেলে নাজিফের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

বাগেরহাটে ছাত্রলীগের এই নেতার স্ত্রী ও পুত্রের মৃত্যু এবং এর পরেও তাৎক্ষণিক তাকে প্যারোল মুক্তি না দেওয়ার ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে— কারাগারে থাকা স্বামীকে কি জেলা প্রশাসন (ডিসি) সাময়িকভাবে বাইরে আনতে পারতো?
আইন ও প্রশাসনিক বাস্তবতার আলোকে উত্তর হলো
হ্যাঁ, পারতো। পূর্ণ মুক্তি নয়, কিন্তু কঠোর পাহারায় সীমিত সময়ের জন্য বাইরে নেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিলো।
১. “মুক্তি” আর “পাহারায় বাইরে নেওয়া” এক জিনিস নয়।
প্যারোল বা জামিন = আইনগত মুক্তি (আবেদন ও মন্ত্রণালয় লাগে)। কিন্তু Escorted / Guarded Leave = বন্দি অবস্থাতেই বাইরে নেওয়া। এই ঘটনায় যে পথটি প্রযোজ্য ছিলো, তা হলো Escorted Leave। এতে বন্দি কোনোভাবেই মুক্ত হন না। জেলের রেকর্ডে বন্দিই থাকেন, সবসময় পুলিশ/কারারক্ষীর পাহারায় থাকেন।
২. এমন ব্যবস্থা কখন দেওয়া হয়?
বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক চর্চা অনুযায়ী, নিচের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়—
◊ স্ত্রী, সন্তান বা পিতামাতার মৃত্যু;
◊ জানাজা বা দাফনে অংশগ্রহণ;
◊ চরম মানবিক ও অপ্রতিরোধ্য পরিস্থিতি।
এই ঘটনা নিঃসন্দেহে সেই মানবিক মানদণ্ড পূরণ করে।
৩. জেলা প্রশাসনের (ডিসি) ভূমিকা কী?
ডিসিবজেল কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের প্রধান সমন্বয়কারী। জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো
ডিসি এককভাবে প্যারোলে “মুক্তি” দিতে পারেন না, কিন্তু পাহারায় বাইরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে লিখিত আবেদন ছাড়াও প্রশাসনের নিজস্ব উদ্যোগে, ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের মৌখিক/দ্রুত অনুমোদনে এই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বন্দিকে পূর্ণ মুক্তি না দিয়ে সীমিত সময়ের জন্য পাহারায় বাইরে নেওয়া হয়েছে মানবিক কারণে, যেখানে জেলা প্রশাসক (ডিসি) গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারী ভূমিকা রেখেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৫ সালে নরসিংদীতে এক হাজতি রাজনৈতিক কর্মী তার মায়ের শেষ দেখা পাওয়ার জন্য সীমিত সময়ের জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিলো, এবং ২০১২ সালে চুয়াডাঙ্গায় একজন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে সন্তানের জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য কয়েক ঘণ্টার অনুমতি দেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে ডিসি নিজে এককভাবে “মুক্তি” দেননি, বরং জেল সুপার ও পুলিশ সহ প্রশাসনিক সমন্বয় চালু করেছিলেন। বন্দিকে সবসময় পাহারায় রাখা হতো এবং জেল রেকর্ডে তারা আইনগতভাবে বন্দিই ছিলেন। এর চেয়ে অনেক বেশী হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি বাগেরহাটে ঘটেছে, যেখানে ছাত্রলীগ নেতা কারাবন্দী অবস্থায় রয়েছে এবং তার স্ত্রী ও ৯ মাসের পুত্রের মৃত্যু হয়। এক্ষেত্রে ডিসি চাইলে Escorted Leave হিসেবে মানবিকভাবে সীমিত সময়ের জন্য বাইরে নেওয়া সম্ভব ছিলো। বাস্তবে, বাংলাদেশে বহু নজিরে দেখা গেছে যে, ডিসি জরুরি মানবিক পরিস্থিতিতে প্রক্রিয়া চালু করেছেন, যেমন মৃত্যুপথযাত্রী আত্মীয় দেখানো বা দাফনে সীমিত অনুমতি, কিন্তু কেউ আইনগতভাবে এককভাবে মুক্ত হননি। এই ধরনের প্রশাসনিক উদ্যোগ মানবিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য হলেও, আইনগত মুক্তির সমান নয় এবং প্যারোল হিসেবে গণ্য করা যায় না।
