ভাষা, রাষ্ট্র ও রাজনীতির অনিবার্য দ্বন্দ্ব // দিব্যেন্দু দ্বীপ

ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার প্রশ্নে গভীরভাবে জড়িত। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে ভাষাকে যদি নিছক আবেগের জায়গায় নামিয়ে আনা হয়, তবে তা ইতিহাসকেই অস্বীকার করার শামিল। সাম্প্রতিক বিতর্কগুলোতে বাংলা ভাষাকে ঘিরে যে আলোচনা উঠে আসছে, সেখানে আবেগের চেয়ে বিশ্লেষণের ঘাটতিই বেশি চোখে পড়ে।

ভাষা আন্দোলনই, বা বাংলা ভাষার অস্তিত্বই ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্র গড়ার রাজনৈতিক ভিত্তি ছিলো।

প্রথমত, পাশের বড় দেশে বাংলা ভাষা “বেঁচে নেই”—এই কথাটি নির্মম হলেও বাস্তবতার কাছাকাছি। সেখানে বাংলাভাষীদের অস্তিত্ব আছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে বাংলা নেই। এবং সেটি না থাকার দায়ও সেই রাষ্ট্রের নয়। প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব জাতি-নির্মাণ প্রকল্প অনুযায়ী ভাষানীতি নির্ধারণ করে। ফলে অন্য দেশের কাছে বাংলা ভাষা রক্ষার নৈতিক দায় আরোপ করা একটি দুর্বল যুক্তি।
ভারতের জাতীয় সঙ্গীত জন গণ মন প্রসঙ্গে প্রায়ই বলা হয়—এটি বাংলায় লেখা। কথাটি আংশিক সত্য, কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। গানটির ছন্দ ও বাক্যগঠন বাংলা ঢং-এর হলেও শব্দচয়ন স্পষ্টতই সংস্কৃতনিষ্ঠ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অত্যন্ত সচেতনভাবেই এই ভাষা নির্বাচন করেছিলেন। কারণ, ভারতবর্ষের জাতি-নির্মাণের কেন্দ্রে সংস্কৃতকে “আদি” ও “ঐক্যের” ভাষা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখানে ভাষা ছিল রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির একটি হাতিয়ার, নিছক সাহিত্যিক পছন্দ নয়।
এখানেই ভাষা ও রাজনীতির সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র যখন নিজের পরিচয় নির্মাণ করে, তখন ভাষাকে ব্যবহার করে—কখনো সংহতির জন্য, কখনো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণ পাওয়া যায় পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ায়। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলেও তাদের জাতীয় সঙ্গীত মূলত পার্সিয়ান ভাষাভিত্তিক। মজার বিষয় হলো—পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেই পার্সিয়ান জনগোষ্ঠীর ভাষা নয়। তবুও একটি “ইসলামিক রাষ্ট্র” পরিচয়কে জোরদার করতে গিয়ে তারা এই ভাষাগত বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এটি ছিল একটি আদর্শিক রাষ্ট্রকল্পনা, যেখানে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষাকে গুরুত্ব না দিয়ে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এক ধরনের কৃত্রিম ঐক্য।
এই চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতিই পূর্ব পাকিস্তানে ব্যর্থ হয়। কারণ, এখানে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না; ভাষা ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের অংশ। তাই ভাষাকে মুছে ফেলার চেষ্টা মানে ছিল মানুষের অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা। ফলত, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ভাষার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়, এবং বাংলা ভাষা একটি সাংস্কৃতিক দাবির গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়।
এই কারণেই বলা যায়—বাংলা কেবল এই অঞ্চলের মানুষের ভাষা নয়; বাংলা একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে, রাষ্ট্র যদি জনগণের ভাষাগত বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, তবে সেই রাষ্ট্র টেকসই হয় না।
আজ যখন বাংলা ভাষা নিয়ে আলোচনা হয়, তখন অনেকের মনেই সেই পুরনো রাজনীতির ছায়া অনিবার্যভাবে উঁকি দেয়। প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই রাজনীতিকে বোঝার চেষ্টা করছি, নাকি তাকে অস্বীকার করে আবেগ দিয়ে ঢেকে দিচ্ছি? ভাষার পক্ষে থাকা মানে শুধু ভাষাকে ভালোবাসা নয়; ভাষার পক্ষে থাকা মানে তার ইতিহাস, তার রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং তার সামাজিক বাস্তবতাকে স্বীকার করা।
এই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়—যারা আজ ভাষা নিয়ে উপদেশ দেন, তাদের অবস্থান আসলে কার পক্ষে? ভাষার, নাকি সেই ক্ষমতার কাঠামোর, যা ভাষাকে ব্যবহার করে কিন্তু তার দায় নেয় না?