মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও ‘ম্যানেজমেন্ট সংস্কৃতি’: এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা

দুর্নীতি

বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ের কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে সাংবাদিকেরা প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তা অনেক সময় দুর্নীতির অবসান নয়, বরং নতুন একটি দরকষাকষির সুযোগ তৈরি করে—এমন অভিযোগ এখন সাংবাদিক ও সচেতন মহলে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা সাময়িকভাবে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়লেও বাস্তব চিত্র হলো—পরবর্তীতে তারা আরও ‘ভালো’ বা ‘লাভজনক’ পোস্টিং পেয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় মূল ভূমিকা রাখেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। কারণ, মাঠপর্যায়ের মতো জনগণের কাছ থেকে সরাসরি অর্থ নেওয়ার সুযোগ বড় কর্মকর্তাদের নেই। ফলে তারা অধীনস্থদের দুর্নীতিকেই নিজেদের আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেন—এমন ধারণাই এখন ব্যাপকভাবে আলোচিত।

এই প্রক্রিয়াকে অনেকেই এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ঘুষ-ব্যবস্থাপনা (institutionalized corruption management) হিসেবে দেখছেন।

খাদ্য অধিদপ্তরের একটি উদাহরণ

খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা অনিন্দ্য দাস-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। সাংবাদিকদের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলার তথ্যও রয়েছে। তবুও বাস্তবতা হলো—এই কর্মকর্তাই বর্তমানে মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পোস্টিংগুলোর একটি পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—দুর্নীতির অভিযোগ কি আদৌ শাস্তির কারণ, নাকি এটি কেবল ‘ম্যানেজমেন্ট ফি’ বাড়িয়ে দেওয়ার একটি উপলক্ষ?

সাব-রেজিস্টার অফিসগুলোতেও একই অভিযোগ

একই ধরনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে সাব-রেজিস্টার অফিসগুলো নিয়েও। গোপালগঞ্জের সাব-রেজিস্টার অকরাম হোসেন রিয়াদ এবং খুলনা সদরের সাব-রেজিস্টার তন্ময় মণ্ডল—এই দুই কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও সাংবাদিক মহলে আলোচনা রয়েছে যে, তারা নাকি অর্থের বিনিময়ে সবকিছু ‘ম্যানেজ’ করে নিয়েছেন।

যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করতে পারেন, তবে একাধিক সূত্র ও ধারাবাহিক প্রতিবেদনের কারণে বিষয়টি জনমনে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সাংবাদিকতা কি তাহলে দুর্নীতির হাতিয়ার হয়ে যাচ্ছে?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এই পরিস্থিতিতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উদ্দেশ্যই উল্টো পথে হাঁটছে কি না। যেখানে একটি প্রতিবেদন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তৈরি করার কথা, সেখানে সেটি যদি ঊর্ধ্বতন মহলের জন্য নতুন ঘুষ আদায়ের সুযোগ হয়ে ওঠে, তবে তা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির জন্য ভয়াবহ সংকেত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দুর্নীতির অভিযোগের পর প্রকৃত তদন্ত, শাস্তি ও স্বচ্ছ বদলি নীতি কার্যকর না হয়, তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন মহল পর্যন্ত সবাই এই ‘ঘুষ-চক্রে’ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই সম্ভব নয়। বরং প্রশ্ন তুলতে হবে—কারা এই দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, কারা এর সুবিধাভোগী, এবং কেন অভিযুক্তরা শাস্তির বদলে পুরস্কৃত হচ্ছে।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না মিললে, দুর্নীতিবিরোধী সাংবাদিকতা একসময় দুর্নীতিরই একটি অনানুষ্ঠানিক অংশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।