কক্সবাজার সদর সাবরেজিস্টার অফিসঃ নীরবে দুর্নীতির মহাকাব্য রচিত হয় যেখানে

গত বিশ বছরে এমনকি অনেক সরকারি জমিও হয়ে গিয়েছে ব্যক্তি নামে। গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, হোটেল।


কক্সবাজারে ভূমি দুর্নীতি: সরকারি জমি থেকে ব্যক্তির নামে মালিকানায় বইছে কোটি কোটি টাকার জমি — নীরবে তৈরি হচ্ছে দুর্নীতির মহাকাব্য।
কক্সবাজারঃ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের জেলা হিসেবেও খ্যাত এই অঞ্চলের ভৌত সম্পদ ও সরকারি জমির ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গত প্রায় দশ বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি দফতরের ভূমি দালালচক্র, নথি জালিয়াতি, আর আমলাদের সহায়তায় সরকারি জমি ব্যক্তির নামে হয়ে যাচ্ছে, এবং ফলস্বরূপ অনেক জায়গায় বহুতল ভবন, হোটেল বা বাণিজ্যিক সম্পত্তি তৈরি হচ্ছে — অথচ প্রকৃত মালিকের সংখ্যা অজানা বা বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই এখনো ক্ষতিপূরণ পায়নি।

সরকারি ভূমি ও জমি নথি জালিয়াতি

স্থানীয় ভূমি অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে জমি রেজিস্ট্রেশন-সহ নথি যাচাই-বোঝাই প্রক্রিয়ায় ঘুষের অভিযোগ বহুদিন ধরেই রয়েছে। সরকারি নথির অভাবে বা দুর্নীতির মাধ্যমে ভুল খতিয়ান/দাগ নম্বর ব্যবহার করে জমি বিভিন্ন ব্যক্তি/উৎসে বিক্রি বা দখল হয় — ফলে সরকারের কাছ থেকে যথাযথ রাজস্ব পর্যন্ত আদায় হয় না।

সরকারি জমি দখল ও অনিয়ম

সম্প্রতি স্থানীয় ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার সরকারি খাস জমি স্বল্প সময়ে ব্যক্তিগত দখলে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে সরকারি নথিতে খালি থাকা জমিতে বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রাচীর দেখা গেছে।

অনেকে অভিযোগ করেন, জমি অফিসে নথি সংশোধন করে বা নথি যাচাই না করে দালিল প্রদান করা হয়, যার ফলে অনেক জায়গা অবৈধ দখলে রয়ে গেছে।

গড়ে ওঠা বহুতল ভবন, হোটেল ও ব্যবসায়ী সম্পত্তি
কক্সবাজার সদর ও আশপাশের এলাকাগুলোতে যে জমিগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর অনেক জায়গায় হোটেল বা বহুতল ভবন বা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ হয়েছে, অথচ সেই জমিগুলো এক সময় সরকার বা সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্দেশ্যে থাকলেও এখন বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন — সরকারি জমি দ্রুত ব্যক্তিগত মালিকানায় রূপান্তরিত হচ্ছে এবং সেই কারণে স্থানীয়দের জন্য সুলভ আবাসন বা প্রকৃত মালিকদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ ক্ষীণ হচ্ছে।

দূদক, আদালত ও সরকারের পদক্ষেপ

তবে নিয়ম ভঙ্গ, ভূমি জালিয়াতি এবং সরকারি জমি ব্যক্তিগত মালিকানায় রূপান্তর সংক্রান্ত কিছু মামলা এবং তদন্ত হয়েছে। কক্সবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক ও জেলা ও দায়রা জজসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ভূমি অধিগ্রহণ ও নথি জালিয়াতি-সম্পর্কিত মামলায় অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়, এবং আদালতে শুনানি হয়।

জনদূর্ভোগ ও ক্ষতিগ্রস্তরা কী চান?

ভুক্তভোগী জমি মালিকরা জানান — তারা বছরের পর বছর প্রতীক্ষা করে চলেছেন সঠিক ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার পেতে, কিন্তু সেই পথে নানা প্রশাসনিক জট, দুর্নীতি, গড়ে ওঠা দালালচক্র এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কারণে তারা আজও ক্ষতিগ্রস্ত।

সমস্যা কোথায়?

জমি রেজিস্ট্রেশন ও নথি যাচাইয়ের দুর্বলতা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ ও দালাল ব্যবস্থা, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির সুযোগ, বাস্তবে মালিকের প্রকৃত সম্পত্তির সঙ্গে সম্পত্তি ব্যবহারের তারতম্য।

এই সকল মিলিত কারণে দালালচক্র ও অসাধু কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারে ভূমি দুর্নীতি করে যাচ্ছে — যার ফলে অনেক সরকারি জমি ব্যক্তির নামে চলে গেছে। স্থানীয় মালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং দুর্নীতির এ মহাকাব্য নীরবে রচিত হয়ে কক্সবাজার হয়ে গেছে কতিপয় দখলদারের। আমলারা দুর্নীতি করে নীরবে বদলী হয়েছে। অনেকে চলে গিয়েছে অবসরে।