খুলনায় ভ্যাট ব্যবস্থাপনা নিয়ে মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে একটি জটিল বাস্তবতা সামনে এসেছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ভ্যাট নির্ধারণ হওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা বাস্তবে ভিন্নভাবে নির্ধারিত হয়। ব্যবসায়ী ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ভ্যাটের পরিমাণ নির্ধারণের একটি অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনো প্রায় সবক্ষেত্রে, যা ঘুষের সুযোগ তৈরি করছে।
“ঘুষ আপনারা নেন কেনো”— এ প্রশ্নের বিপরীতে খুলনা-১ সার্কেলের রাজস্ব কর্মকর্তা ওয়াহিদুজ্জামান সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন— “ঘুষ তারা দেয় কেনো?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা এবং নীতিগত কাঠামো—দুটিই বিবেচনায় নিতে হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত বিক্রির পরিমাণের ভিত্তিতে স্বচ্ছভাবে ভ্যাট নির্ধারণ করা হয় না। বরং সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা বা সমঝোতার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক ঠিক করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ঘুষ দিয়ে ভ্যাটের পরিমাণ কমিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ব্যবসায়ী কম ভ্যাট দিয়ে লাভবান হন এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তা ব্যক্তিগত সুবিধা পান। এতে রাষ্ট্রের প্রকৃত রাজস্ব আয় কমে যায়।
তবে সমস্যাটি শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। ভ্যাট নীতিতেও কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করেন। অনেক ক্ষেত্রে বিক্রয়ের ওপর যে নির্দিষ্ট শতাংশ হারে ভ্যাট আদায়ের বিধান রয়েছে, তা বাস্তব ব্যবসায়িক পরিস্থিতির সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ধরা যাক, কোনো একটি ব্যবসায় ভ্যাট নির্ধারণ করা আছে বিক্রয়মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ। দেখা গেলো— ঐ ব্যবসায় নেট প্রফিট ৭ শতাংশ। তাহলে ব্যবসায়ী কেন এবং কীভাবে বিক্রয় মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট দেবে?
এ রকম পরিস্থিতিতে রাজস্ব কর্মকর্তার পলিসির অজুহাতে চাপ দেওয়ার সুযোগ পান, তৈরি হয় অবৈধ লেনদেনের সুযোগ।কারণ যখন নির্ধারিত হার বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তখন ব্যবসায়ীরা অনেক সময় অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার মাধ্যমে কম ভ্যাট নির্ধারণের চেষ্টা করেন। এই সুযোগে দুর্নীতির একটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, কোনো ব্যবসায়ী যদি এই ধরনের সমঝোতায় যেতে না চান, তাহলে অনেক সময় তাদের ওপর প্রশাসনিক চাপ তৈরি হয়। ঘনঘন পরিদর্শন, কাগজপত্রে খুঁত ধরা, নোটিশ বা জরিমানার আশঙ্কা দেখানো—এ ধরনের অভিযোগও রয়েছে।
ফলে একটি ত্রিমুখী সমস্যা তৈরি হয়েছে—
একদিকে প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, অন্যদিকে ঘুষের সংস্কৃতি, আর তৃতীয়দিকে নীতিগত দুর্বলতা। এই তিনটি বিষয় মিলেই ভ্যাট ব্যবস্থাকে জটিল ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
খুলনার অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু দুর্নীতি দমন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ভ্যাট নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করা, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি প্রণয়ন—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সংস্কার প্রয়োজন। তাহলেই “ঘুষ তারা দেয় কেনো?”—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়োজন ধীরে ধীরে কমে আসবে।
