Headlines

ভারত কি ইসলামি উগ্রবাদের মোকাবেলায় হিন্দুত্ববাদকে এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করতে চাইছে?—ইতিহাসের ছায়ায় বর্তমানের প্রশ্ন

সহাবস্থান
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি আবারও এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে পরিচয়, নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ভারতে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় মেরুকরণ এবং আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে উগ্রবাদের উপস্থিতি— এই দুইয়ের সংযোগ থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: ভারত কি ইসলামি উগ্রবাদের মোকাবেলায় হিন্দুত্ববাদকে একটি পাল্টা মতাদর্শ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়।

পরিচয়ের নির্মাণঃ প্রাচীন থেকে আধুনিক

ভারতীয় উপমহাদেশ ঐতিহাসিকভাবে বহুত্বের ভূখণ্ড। “হিন্দু” পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে ছিলো একটি সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক চিহ্ন, কোনো একক রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়। কিন্তু উনিশ ও বিশ শতকে এই পরিচয় নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হয়, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো Hindutva, যা ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক সংগঠনের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

অন্যদিকে, ইসলামের আগমনও ছিলো বহুমাত্রিক—বাণিজ্য, সুফি প্রভাব এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের মধ্য দিয়ে। সহাবস্থান যেমন ছিলো, তেমনি সংঘাতও ছিলো। কিন্তু ইতিহাসকে একমাত্র সংঘাতের বয়ানে সীমাবদ্ধ করলে বাস্তবতা বিকৃত হয়।

ঔপনিবেশিকতা ও বিভাজনের রাজনীতি

ব্রিটিশ শাসন দক্ষিণ এশিয়ার পরিচয় রাজনীতিকে কাঠামোবদ্ধ করে। ধর্মীয় বিভাজন রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়, যার চূড়ান্ত প্রকাশ “দুই জাতি তত্ত্ব” এবং ১৯৪৭ সালের বিভাজন।

পাকিস্তানের সৃষ্টি দেখায় ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন একটি স্থায়ী সমাধান নয়; বরং নতুন দ্বন্দ্বের সূচনা। ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নে সেই রাষ্ট্র ভেঙে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম হয়। কিন্তু বাংলাদেশও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি।

এই অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেঃ
পরিচয়ের প্রশ্নে ধর্মকে কেন্দ্র করলে সংকট মিটে না—বরং রূপ বদলায়।

ভারতে বর্তমান প্রবণতা

এই আঞ্চলিক ইতিহাসের পটভূমিতে ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানকে দেখতে হয়। Bharatiya Janata Party-এর রাজনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে একটি বয়ান শক্তিশালী হয়েছে, যেখানে জাতীয় পরিচয়, নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারণা একসূত্রে গাঁথা।

এই বয়ানের একটি অন্তর্নিহিত যুক্তি হলো— একটি “হুমকি”র বিপরীতে একটি শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয় দরকার। এখানেই ইসলামি উগ্রবাদের প্রশ্নটি সামনে আসে। কিছু ক্ষেত্রে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয় যে, এই হুমকির মোকাবেলায় হিন্দুত্ববাদ একটি কার্যকর প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো।

প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি ও তার ঝুঁকি

কিন্তু ইতিহাস এবং সমসাময়িক অভিজ্ঞতা, দুটিই সতর্ক করে দেয়ঃ
উগ্রতা দিয়ে উগ্রতার মোকাবেলা করা গেলে সংঘাত কমে না, বরং বেড়ে যায়।

যখন একটি রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক শক্তি পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেঃ

  • তখন তা সমাজে স্থায়ী বিভাজন তৈরি করে;

  • পাল্টা উগ্রতাকে বৈধতা দেয়;

  • এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে।

এই প্রক্রিয়াটি একটি “mirror conflict” তৈরি করে, যেখানে প্রতিপক্ষের উগ্রতা নিজস্ব উগ্রতার যুক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

আঞ্চলিক প্রতিধ্বনি

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতির প্রভাব ক্রমাগত দৃশ্যমান। এতে একটি আঞ্চলিক প্রতিধ্বনি তৈরি হয়, যেখানে এক দেশের মেরুকরণ অন্য দেশের রাজনীতিকেও প্রভাবিত করে।

ফলে, প্রশ্নটি শুধু ভারতের নয়, পুরো অঞ্চলের।

সমাধানের দিকনির্দেশ

ভারত যদি সত্যিই ইসলামি উগ্রবাদের মোকাবেলা করতে চায়, তবে সেটি কোনো প্রতিপক্ষীয় ধর্মীয় মতাদর্শ দিয়ে সম্ভব নয়। আর হিন্দুত্ববাদী উগ্রতা পুরোেপুরি ইসলামি উগ্রতার মিরর ইমেজ, সেটি ভারতের ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিবেচনায়,নিলে যুক্তির নিরিখে অগ্রহণযোগ্য। হিন্দুত্ববাদ নয় ভারতে উগ্র ইসলামকে মোকাবেলা করাী কার্যকর পথগুলো বহু আগেই চিহ্নিতঃ

  • আইনের শাসন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা;

  • অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক পরিচয়;

  • শিক্ষা ও সমালোচনামূলক চিন্তার প্রসার;

  • এবং রাজনৈতিকভাবে মেরুকরণের বদলে সংহতির কৌশল।

সহাবস্থান
শান্তির জন্য সহাবস্থানের কোনো বিকল্প নেই।

ভারতের সামনে আজ একটি মৌলিক নির্বাচনী প্রশ্ন—
সে কি তার বহুত্ববাদী ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করবে, নাকি পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণের পথে এগোবে?

ইসলামি উগ্রবাদের মোকাবেলা যদি হিন্দুত্ববাদ দিয়ে করার চেষ্টা করা হয়, তবে সেটি সমাধান নয়, বরং সংঘাতের পুনরুৎপাদন। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, এই পথ শেষ পর্যন্ত কারো জন্যই স্থিতিশীলতা বয়ে আনে না।

দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই অঞ্চল কি অতীতের বিভাজনকে পুনরাবৃত্তি করবে, নাকি সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে।