
উত্তরপ্রদেশের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী যোগেন্দ্র উপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য ভারতের শিক্ষামহল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় এক প্রবল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত ৪ মে ২০২৬ থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক দিনের বিভিন্ন জনসভায় তিনি যেভাবে শিশুদের অতি পরিচিত ইংরেজি ছড়া ‘Rain Rain Go Away’ এবং ‘Johny Johny Yes Papa’-র সমালোচনা করেছেন, তা নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মূলত লখনউ এবং কানপুরের শিক্ষা বিষয়ক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এই প্রশ্ন তোলেন যে, পশ্চিমী সংস্কৃতির এই ছড়াগুলো আদতে ভারতীয় শিশুদের মনস্তত্ত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কি না।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: বৃষ্টির আশীর্বাদ বনাম অভিশাপ
যোগেন্দ্র উপাধ্যায়ের আপত্তির মূল জায়গাটি ছিল ‘Rain Rain Go Away’ ছড়াটির অন্তর্নিহিত অর্থ। তিনি দাবি করেন, ভারতে বৃষ্টিকে একটি আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হয়। কৃষিপ্রধান এই দেশে বৃষ্টি মানেই উর্বরতা এবং সমৃদ্ধি। অথচ এই ছড়াতে বৃষ্টিকে ‘চলে যেতে’ বলা হচ্ছে (Go Away), কারণ একটি শিশু খেলতে চায়। মন্ত্রীর মতে, এটি চরম স্বার্থপরতা বা ‘স্বান্তঃ সুখায়’ (নিজের সুখের জন্য কাজ করা) মানসিকতার পরিচায়ক। ভারতীয় দর্শনে বৃষ্টির সঙ্গে ইন্দ্র বা বরুণ দেবতার সংযোগ বিদ্যমান, তাই বৃষ্টির বিদায় কামনা করা ভারতের হাজার বছরের ঐতিহ্যের পরিপন্থী বলেই তিনি মনে করেন।
পরিসংখ্যান বলছে, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে যেখানে অর্থনীতির প্রায় ৬৫% প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে বৃষ্টির গুরুত্ব অপরিসীম। মন্ত্রী এই পরিসংখ্যানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছেন যে, শৈশব থেকেই যদি শিশুদের শেখানো হয় যে বৃষ্টি তাদের খেলার পথে বাধা, তবে ভবিষ্যতে মাটির সঙ্গে তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে।
‘জনি জনি ইয়েস পাপা’: মিথ্যে বলার হাতেখড়ি?
বিতর্কের দ্বিতীয় ধাপে মন্ত্রী আক্রমণ করেন ‘Johny Johny Yes Papa’ ছড়াটিকে। তাঁর মতে, এই ছড়াটি শিশুদের খুব অল্প বয়স থেকেই মিথ্যে বলতে উৎসাহিত করছে। ছড়াটিতে যখন জনি চিনি খাওয়ার কথা অস্বীকার করে এবং শেষে ধরা পড়ার পর হেসে ওঠে, তখন সেটি একপ্রকার চাতুরিকে উদযাপন করে। উপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি ‘গুরু-শিষ্য’ বা ‘পিতা-পুত্র’ সম্পর্কের যে চিরাচরিত ভারতীয় স্বচ্ছতা, তাকে নষ্ট করছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, পশ্চিমী দেশগুলোর পারিবারিক কাঠামো আলগা হওয়ায় সেখানে এমন ছড়া চলতেই পারে, কিন্তু ভারতের যৌথ পরিবার ও নৈতিক মূল্যবোধের কাঠামোতে এর কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও জনমানসে প্রভাব
মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক ময়দান উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সমাজবাদী পার্টির নেতারা কটাক্ষ করে জানিয়েছেন যে, উত্তরপ্রদেশে বর্তমানে প্রায় ১.৫ লক্ষের বেশি শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে আছে। মৌলিক শিক্ষা পরিকাঠামোর উন্নয়ন না করে নার্সারি রাইম নিয়ে পড়ে থাকাকে তারা ‘মূল ইস্যু থেকে নজর ঘোরানোর কৌশল’ হিসেবে দেখছেন। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, শিশুরা ছড়া পড়ে মিথ্যে শেখে না, বরং তারা বড়দের দুর্নীতির পরিবেশ দেখে বিপথে যায়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় গত এক সপ্তাহে এই বিষয়ে প্রায় ২ লক্ষেরও বেশি পোস্ট শেয়ার হয়েছে। নেটিজেনদের একাংশ মন্ত্রীর কথার যৌক্তিকতা খুঁজে পেয়েছেন। তারা মনে করেন, ১৮৫৭ সালের পর থেকে মেকলে প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার যে প্রভাব ভারতে রয়ে গেছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার এটাই সময়। অন্যদিকে, আধুনিক প্রজন্মের অভিভাবকরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, ছড়াকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করার কী প্রয়োজন? তাদের মতে, ছড়া হলো শব্দের ছন্দ মেলানো এবং শিশুদের আনন্দ দেওয়ার মাধ্যম মাত্র।
শিক্ষানীতির পরিবর্তন ও ‘বালভাটিকা’
যোগেন্দ্র উপাধ্যায়ের এই মন্তব্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখা ভুল হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (NEP 2020)-এর অধীনে উত্তরপ্রদেশ সরকার ইতিমধ্যেই ‘বালভাটিকা’ বা প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ব্যাপক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশের প্রায় ১৮,০০০-এর বেশি স্কুলে ভারতীয় লোকগাঁথা, পঞ্চতন্ত্রের গল্প এবং দেশীয় ধাঁধাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে তিনি ইংরেজি ভাষার বিরোধী নন, বরং সেই ভাষার মাধ্যমে পাচার হওয়া ‘সংস্কৃতি’ নিয়ে তাঁর আপত্তি। তিনি চান ভারতের নার্সারি স্কুলগুলোতে এমন কিছু শেখানো হোক যা পরিবেশবান্ধব এবং সমাজমুখী। উদাহরণস্বরূপ, বৃষ্টির বিদায় প্রার্থনা না করে বৃষ্টির বন্দনা করা কোনো দেশীয় ছড়া যেন শিশুদের মুখে শোনা যায়, এটাই তাঁর লক্ষ্য।
শিক্ষা এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধন সবসময়ই একটি সংবেদনশীল বিষয়। যোগেন্দ্র উপাধ্যায়ের এই পদক্ষেপটি কি সত্যিই এক ‘সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ’ থেকে মুক্তির পথ, নাকি এটি আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে পিছু হটে যাওয়া—তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, উত্তরপ্রদেশের শিক্ষা দপ্তর আগামী দিনে প্রাথমিক পাঠ্যক্রমে বড়সড় রদবদল আনতে চলেছে। শিশুদের মুখে ‘Rain Rain Go Away’ থাকবে নাকি কোনো নতুন ভারতীয় ছড়া জায়গা করে নেবে, তা নির্ভর করবে এই প্রস্তাবিত শিক্ষা সংস্কারের বাস্তবায়নের ওপর। ভারতের মতো এক বৈচিত্র্যময় দেশে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
