দিব্যেন্দু দ্বীপ
গ্রামের একটি ছোট বাজার। সকালে একজন দিনমজুর দাঁড়িয়ে আছেন কলার দোকানের সামনে। কয়েক বছর আগে যে কলা তিনি ৫ টাকায় কিনতেন, এখন সেটির দাম ১৫ টাকা। প্রথম মুহূর্তে মনে হতে পারে—এই মানুষটির জীবনে আরও একটি চাপ যোগ হলো।
কিন্তু অর্থনীতির গল্প শুধু ভোক্তার পকেট দিয়ে শুরু হয় না, উৎপাদকের হাত দিয়েও শুরু হয়।
এই কলাটি কে উৎপাদন করেছেন? একজন কৃষক। কে জমিতে শ্রম দিয়েছেন? একজন কৃষিশ্রমিক। কে তা বাজারে এনেছেন? একজন পরিবহন শ্রমিক। কে বিক্রি করছেন? একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
যদি কলার দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মানুষগুলোর আয়ও বাড়ে, তাহলে এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু ব্যয়ের চাপ নয়; এটি উৎপাদন ব্যবস্থার ভেতরে নতুন অর্থের প্রবাহ তৈরি করে। সেই অর্থ আবার বাজারে ফিরে আসে, নতুন উৎপাদন সৃষ্টি করে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায়।
অবশ্যই ভাসমান শ্রমিক, দিনমজুর এবং কারখানার শ্রমিকেরা কলার দাম ১৫ টাকা হওয়ার কারণে সাময়িক চাপে পড়বেন। কিন্তু একটি সচল অর্থনীতিতে তারা দ্রুতই নিজেদের শ্রমের মূল্য বা মজুরি সমন্বয় করার চেষ্টা করবেন। একজন রিকশাচালক তার ভাড়া সমন্বয় করবেন, একজন শ্রমিক তার মজুরি নিয়ে নতুন করে দরকষাকষি করবেন। এটি তাদের জীবনের বাস্তব অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার অংশ।
মূল্য ধারাবাহিকভাবে বাড়তে পারে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো— মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি কোন দিক থেকে শুরু হচ্ছে। যদি মূল্যস্ফীতির প্রবাহ নিচ থেকে শুরু হয়, অর্থাৎ কৃষক, ক্ষুদ্র উৎপাদক, দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে, তাহলে সেটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক শক্তি তৈরি করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— মূল্যবৃদ্ধির সুফল কি দরিদ্র মানুষের হাত ধরে উপরের দিকে যাচ্ছে, নাকি বড় পুঁজির হাত ধরে নিচের দিকে চাপ সৃষ্টি করছে?
আমার বক্তব্য হলো— দরিদ্র দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতিকে শুধু একটি সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, এই মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত অর্থ কার হাতে যাচ্ছে এবং তা অর্থনীতির কোন জায়গায় ব্যবহার হচ্ছে।
আমি মনে করি, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিও কিছু পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যদি সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে যায়, মানুষের আয় বাড়ায় এবং অর্থনীতির কোটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে। এই অর্থ যদি কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী বা সম্পদশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতির সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না। বরং তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে, কিন্তু আয় বাড়বে না।
কিন্তু যদি রাষ্ট্র সেই অর্থনৈতিক প্রবাহকে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের দিকে পরিচালিত করতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। পুঁজির নিয়ন্ত্রণ সরকার যদি নিতে পারে, এবং টাকাটা ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীদের হাতে দিতে পারে, তাহলে সুফল পাওয়া যাবে।
সরকার কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ছোট ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে পারে। কৃষি ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে যদি কোটি মানুষের হাতে ছোট ছোট মূলধন পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে সেই ছোট অর্থই বড় উৎপাদন শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
একজন কৃষক কৃষিতে বিনিয়োগ করতে পারেন। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা একটি ছোট যন্ত্র কিনতে পারেন। একজন নারী ঘরে বসে উৎপাদন শুরু করতে পারেন। একজন তরুণ ছোট ব্যবসা দাঁড় করাতে পারেন।
একজনের কাছে এই বিনিয়োগ ছোট মনে হলেও কোটি মানুষের কাছে পৌঁছালে সেটিই জাতীয় উৎপাদনের বড় ভিত্তি তৈরি করে।
আমাদের অর্থনৈতিক চিন্তার একটি বড় সমস্যা হলো— আমরা অনেক সময় দরিদ্র মানুষকে শুধু ভোক্তা হিসেবে দেখি। কিন্তু দরিদ্র মানুষ একই সঙ্গে উৎপাদক, শ্রমিক এবং উদ্যোক্তা। তাদের হাতে অর্থ পৌঁছানো মানে শুধু ভোগ বাড়ানো নয়; বরং উৎপাদনের নতুন সক্ষমতা তৈরি করা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের মূল্যস্ফীতি ভালো। উৎপাদন না বাড়িয়ে শুধু অর্থের পরিমাণ বাড়ালে মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত দরিদ্র মানুষের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করে। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো— অর্থের প্রবাহের সঙ্গে উৎপাদন বৃদ্ধির সমন্বয় করা।
কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে অবশ্যই দায়িত্ব নিতে হবে। চাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য, ওষুধের মতো পণ্য যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিলাসী পণ্য বা অপ্রয়োজনীয় ভোগের ক্ষেত্রে বাজারের স্বাভাবিক মূল্য সমন্বয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর নয়—। কলার দাম বাড়ার সাথে সাথে বার্গারের দাম বাড়বে, রেস্টুরেন্টে খাসির মাংসের পিচটা ডাবল দামে বিক্রি তবে। এটা হতে দিতে হবে। কলার দাম বাড়া যেমন ভালো হয়েছে, আবার বার্গারের দাম বাড়াও ভালো হয়েছে। খেয়াল রাখা জরুরী— চিকিৎসা এবং শিক্ষার দায়িত্ব যেনো রাষ্ট্রের হাতে থাকে; এই ব্যবস্থায় খেয়াল রাখা জরুরী— চাল ডাল ডিমের মতো পণ্যের দাম ভর্তুকী দিয়ে হলেও যেনো কমিয়ে রাখা যায়। মূল্যস্ফিতি বজায় রেখে চালের জন্য ১০টাকা ভর্তুকী কাজু বরফি বা জাফরানি রসগোল্লা থেকে টেনে আনার কথা আমি বলছি। তবে রাজস্ব ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ না করলে সেটি সম্ভব হবে না।
একটি দেশের উন্নয়নের লক্ষ্য শুধু কম মূল্যস্ফীতি নয়; বরং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি। কারণ কম দামের পণ্য তখনই মানুষের কল্যাণে আসে, যখন মানুষের হাতে সেই পণ্য কেনার অর্থ থাকে। টাকা যদি হাতে না থাকে, তাহলে আমের কেজি ৬০ টাকা বা ১০০ টাকা একই কথা। এ ধরনের দেশে মূল্যস্ফিতি → ক্ষুদ্র বিনিয়োগ → কর্মসংস্থান → ক্রয়ক্ষমতা → রাজস্ব আদায় → ভর্তুকী খুবই জরুরী।
তাই প্রশ্ন শুধু মূল্যস্ফীতি কত শতাংশ? নয়।
বরং বড় প্রশ্ন হলো— এই মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে সৃষ্ট অর্থ কার হাতে যাচ্ছে, কত মানুষের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং কত মানুষকে দেশের অর্থনীতির মূল স্রোতে যুক্ত করছে।
দরিদ্র দেশের জন্য উন্নয়নের আসল চ্যালেঞ্জ হলো— অর্থের প্রবাহকে কোটি মানুষের উৎপাদন শক্তিতে রূপান্তর করা।
