Headlines

বন্ড সুবিধায় পিয়ারেজ নিটওয়্যার: ৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকার দাবির পরও কী হয়েছিল?

রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। তবে এই সুবিধার বিপরীতে আমদানি করা পণ্য যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, রপ্তানির সঙ্গে তার হিসাব মিলেছে কি না এবং বন্ডের শর্ত মানা হয়েছে কি না—তা তদারকির দায়িত্ব কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের।

ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের সরকারি অনলাইন ডাটাবেজে এমনই একটি প্রতিষ্ঠানের রেকর্ডে বড় অঙ্কের দাবির তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি Peerage Knitwear Limited

সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স নম্বর 745/CUS-SBW/2007। লাইসেন্সটি ইস্যু করা হয় ২০০৭ সালের ৩ এপ্রিল। প্রতিষ্ঠানটির বন্ড ওয়্যারহাউস নম্বর GB801070745 এবং ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়েছে ঢাকার মিরপুরের ২/এ দারুস সালাম রোডের ৪র্থ থেকে ৭ম তলা।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান লাইসেন্স স্ট্যাটাস ও দাবির ঘরে। ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের ডাটাবেজে প্রতিষ্ঠানটির স্ট্যাটাস ‘Suspended’ এবং ‘Bin_Locked’ দেখানো হয়েছে। একই রেকর্ডে SCN Demand 69,402,827 টাকা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা

সরকারি রেকর্ডে প্রতিষ্ঠানটির অডিটের তারিখ হিসেবে ২ এপ্রিল ২০১৫ এবং গ্যারান্টি বন্ডের (GB) তারিখ হিসেবে ৭ মে ২০১৬ দেখানো হয়েছে। নবায়নের তারিখ হিসেবে রয়েছে ২ এপ্রিল ২০১৮

এখানেই প্রশ্ন উঠছে—২০১৫ সালের অডিটে কী ধরনের অসঙ্গতি বা ঘাটতি ধরা পড়েছিল? সেই অডিটের ভিত্তিতেই কি পরবর্তী সময়ে দাবির অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছিল? ৬ কোটি ৯৪ লাখ ২ হাজার ৮২৭ টাকার দাবিটি কোন কোন আমদানি চালান, কাঁচামাল, উৎপাদন, অপচয় বা রপ্তানি হিসাবের সঙ্গে সম্পর্কিত—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কারণ বন্ড সুবিধা সাধারণ আমদানি সুবিধা নয়। বন্ডেড প্রতিষ্ঠান শুল্ক ও কর পরিশোধ না করেই নির্দিষ্ট শর্তে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পায়। সেই কাঁচামাল নির্ধারিত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করে রপ্তানি করার কথা। ফলে আমদানি করা কাঁচামালের পরিমাণ, উৎপাদনে ব্যবহার, অপচয়, সমাপ্ত পণ্যের পরিমাণ এবং রপ্তানির তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, বন্ড কমিশনারেটের অন্যতম প্রধান কাজ হলো লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে কি না তা মনিটরিং এবং প্রতিবছর লাইসেন্স নবায়ন ও অডিট করা।

Peerage Knitwear-এর ক্ষেত্রে তাই অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—৬ কোটি ৯৪ লাখ ২ হাজার ৮২৭ টাকার দাবির ভিত্তি কী?

এ দাবির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি কোনো আপিল, রিভিউ বা অর্থ পরিশোধ করেছে কি না; কাস্টমসের দাবিটি চূড়ান্ত হয়েছে কি না; বন্ড লাইসেন্স কেন স্থগিত করা হয়েছিল এবং বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড গুদামে কোনো পণ্য বা কাঁচামাল রয়েছে কি না—এসব তথ্য সরকারি নথি পর্যালোচনা করলেই পরিষ্কার হতে পারে।

এদিকে বিজিএমইএর সদস্য তথ্যেও Peerage Knitwear Ltd.-এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠার বছর ২০০১, ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মো. মিজানুর রহমানের নাম এবং একই মিরপুরের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জ্যাকেট, প্যান্ট ও জগিং স্যুট রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে শুধু বন্ড কমিশনারেটের ডাটাবেজে ‘Suspended’ কিংবা বড় অঙ্কের SCN Demand থাকার অর্থই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়া নয়। দাবিটির কারণ, সংশ্লিষ্ট অডিট রিপোর্ট এবং পরবর্তী আইনগত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাচাই করা জরুরি।

ফলোআপ নিউজের অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপ হতে পারে—

১. Peerage Knitwear-এর ২০১৫ সালের পূর্ণ অডিট রিপোর্ট সংগ্রহ।
২. ৬৯,৪০২,৮২৭ টাকার SCN/দাবির নথি সংগ্রহ।
৩. কোন কোন বিল অব এন্ট্রি বা কাঁচামাল আমদানির বিপরীতে দাবি তৈরি হয়েছে তা বের করা।
৪. সংশ্লিষ্ট রপ্তানি বিল/বন্ড রেজিস্টারের সঙ্গে কাঁচামালের হিসাব মিলিয়ে দেখা।
৫. প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স স্থগিতের আদেশ সংগ্রহ।
৬. প্রতিষ্ঠানটি দাবির বিরুদ্ধে কোনো আপিল বা মামলা করেছে কি না তা অনুসন্ধান।
৭. বর্তমান অবস্থায় বন্ড লাইসেন্স পুনরায় চালু হয়েছে কি না, নাকি স্থগিতই আছে—তা নিশ্চিত করা।
৮. Peerage Knitwear কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া।

অর্থাৎ, গল্পটি শুধু ‘৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকার বন্ড দাবি’ নয়; আসল অনুসন্ধান হবে—এই দাবির পেছনে কী ঘটেছিল এবং গত এক দশকে এর নিষ্পত্তি কোথায় দাঁড়িয়েছে।