১৯৮৪ সালের বন্ড লাইসেন্স এখনো সক্রিয়—২০২৫-২৬ অর্থবছরেও আমদানি প্রাপ্যতা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পুরোনো অডিটে অতিরিক্ত আমদানির অভিযোগ, নতুন নথিতে প্রতিষ্ঠানের নামের অসংগতি এবং বিপুল আমদানি রেকর্ড ঘিরে উঠছে স্বচ্ছতার প্রশ্ন।
ফলোআপ নিউজ অনুসন্ধান
ঢাকার গুলশানে অবস্থিত মেসার্স ইস্টার্ন ডিপ্লোমেটিক সার্ভিসেস লিমিটেড (Eastern Diplomatic Services Ltd.) দেশের ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলোর একটি। প্রতিষ্ঠানটি কূটনীতিক ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানি ও সরবরাহের কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স ১৯৮৪ সালের। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এর প্রকাশিত সক্রিয় লাইসেন্স তালিকায় এখনো প্রতিষ্ঠানটির নাম রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রকাশিত নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি একাধিক অর্থবছরে বার্ষিক আমদানি প্রাপ্যতা পেয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আমদানি প্রাপ্যতা সংক্রান্ত নথি প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তথ্য সরবরাহকারী একটি বেসরকারি ডেটাবেসে প্রতিষ্ঠানটির আমদানি কার্যক্রমের দীর্ঘ রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে। এসব তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত আমদানি, পণ্য খালাস, বিক্রয় এবং শুল্কমুক্ত সুবিধার ব্যবহারের হিসাব মিলিয়ে দেখা জরুরি।

আমদানি প্রাপ্যতার ধারাবাহিক রেকর্ড
এনবিআরের Bond Entitlement তালিকায় ইস্টার্ন ডিপ্লোমেটিক সার্ভিসেসের নামে একাধিক প্রাপ্যতার নথি পাওয়া যায়। প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য রেকর্ডগুলো হলো:
| ক্রমিক | প্রকাশের তারিখ | নথির বিবরণ |
|---|---|---|
| ১ | ১২ মার্চ ২০২৩ | আমদানি প্রাপ্যতা |
| ২ | ১১ মার্চ ২০২৪ | আমদানি প্রাপ্যতা |
| ৩ | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | আমদানি প্রাপ্যতা-সংক্রান্ত রেকর্ড |
| ৪ | ৩১ আগস্ট ২০২৫ | ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক আমদানি প্রাপ্যতা |
| ৫ | ২১ জানুয়ারি ২০২৬ | সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক আমদানি প্রাপ্যতা |
এনবিআরের Bond Entitlement তালিকায় ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের নথিটি ৯১ নম্বর ক্রমিক হিসেবে রয়েছে। ৩১ আগস্ট ২০২৫ তারিখের নথিটি ৮০ নম্বর ক্রমিক।
তবে তালিকায় প্রকাশের তারিখ পাওয়া গেলেও প্রতিটি নথির পূর্ণ বিবরণ, অনুমোদিত পণ্যের পরিমাণ এবং অর্থমূল্য এক নয়। তাই শুধু প্রকাশের তারিখ দেখে মোট আমদানি প্রাপ্যতা বা প্রকৃত আমদানির পরিমাণ নির্ধারণ করা যাবে না।

১৯৮৪ সালের লাইসেন্স এখনো সক্রিয়
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এর সক্রিয় বন্ড লাইসেন্স তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান পাওয়া গেছে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| প্রতিষ্ঠানের নাম | Eastern Diplomatic Services Ltd. |
| লাইসেন্স নম্বর | 125/CUS-SBW/84 |
| লাইসেন্স ইস্যুর সাল | ১৯৮৪ |
| লাইসেন্সের ধরন | PB |
| তালিকায় অবস্থান | ক্রমিক ৩৭২ |
| সার্কেল | ১ |
| ঠিকানা | প্লট ২৩, রোড ১০৮, গুলশান-২ |
| বর্তমান স্ট্যাটাস | Active |
অর্থাৎ প্রায় চার দশক আগে ইস্যু করা লাইসেন্সটি উত্তর বন্ড কমিশনারেটের তালিকায় এখনো সক্রিয়। তবে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের অনলাইন এনটাইটেলমেন্ট তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির নামে আলাদা লাইসেন্স পাওয়া যায়নি। এটিকে দক্ষিণে লাইসেন্স নেই— এমন চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
২০২৫ সালের নথিতে প্রতিষ্ঠানের নামে প্রশ্ন
২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট তারিখে ইস্টার্ন ডিপ্লোমেটিক সার্ভিসেস লিমিটেডের নিজস্ব লেটারহেডে এনবিআরে একটি আবেদন করা হয়। আবেদনটির নিচে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আহমেদ মাইহুল বারীর স্বাক্ষর রয়েছে।
কিন্তু নথিটির বিষয়বস্তুতে প্রতিষ্ঠানটির নাম লেখা হয়েছে Inter Diplomatic Services Limited।
আবেদনে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য তাদের আমদানি প্রাপ্যতার মেয়াদ ৩০ অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সেখানে এনবিআরের দুটি প্রজ্ঞাপনের উল্লেখ রয়েছে:
- প্রজ্ঞাপন নং ৭২/২০২৫/কাস্টমস/৬৫৫, তারিখ ২৮ জানুয়ারি ২০২৫।
- প্রজ্ঞাপন নং ৮৬/২০২৫/কাস্টমস/১১১, তারিখ ২৫ জুন ২০২৫।
প্রতিষ্ঠানটি ২৯ আগস্ট ২০২৫ তারিখে এনবিআরের ওয়েবসাইটে মেয়াদ বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশের অনুরোধ জানায়।
একই ঠিকানায় দুটি প্রতিষ্ঠানের নামের ব্যবহার কেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এটি টাইপজনিত ভুল, নাকি অন্য কোনো আইনগত বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে, তা কোম্পানির নিবন্ধনপত্র, বন্ড লাইসেন্স ও এনবিআরের অনুমোদন দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
আমদানিতে কী ধরনের পণ্য রয়েছে?
বেসরকারি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তথ্যভান্ডার NBD Trade Data-তে প্রতিষ্ঠানটির আমদানির তথ্য পাওয়া যায়।
সেখানে প্রকাশিত সাম্প্রতিক রেকর্ডে কয়েকটি পণ্যের নাম রয়েছে:
| পণ্য | HS Code | উৎস দেশ |
|---|---|---|
| Glenlivet Whisky | 22083000 | যুক্তরাজ্য |
| Chivas Regal Whisky | 22083000 | যুক্তরাজ্য |
| Smirnoff Vodka Red | 22086000 | ইতালি |
| Absolut Vodka Vanilla | 22086000 | সুইডেন |
এ ছাড়া ওই ডেটাবেসে Martens Beer, Absolut Vodka Lime এবং Absolut Vodka Raspberry আমদানির রেকর্ডও পাওয়া গেছে।
NBD-এর সাম্প্রতিক সার্চ ইনডেক্সে ২৬ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ২ হাজার ৪৩৭টি রেকর্ডের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত খোলা পৃষ্ঠায় ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ২৮৩টি রেকর্ড দেখানো হচ্ছে। এই অসংগতি থাকায় ২ হাজার ৪৩৭-কে যাচাইকৃত মোট আমদানি চালান হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
এ ছাড়া পণ্যের তালিকা থেকে আমদানির মোট অর্থমূল্য নির্ধারণ সম্ভব নয়। কাস্টমসের বিল অব এন্ট্রি, ইনভয়েস ও শুল্কায়নের নথি প্রয়োজন।
পুরোনো অডিটে অতিরিক্ত আমদানির অভিযোগ
ইস্টার্ন ডিপ্লোমেটিক সার্ভিসেসকে ঘিরে অতীতেও প্রশ্ন উঠেছিল।
দ্য ডেইলি স্টারের ২০১৮ সালে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘Given by Ghosts’-এ ২০১২ সালের একটি বিশেষ অডিটের তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে ২০১০-১১ অর্থবছরের আমদানি প্রাপ্যতার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির ৪৫ হাজার মার্কিন ডলারের অতিরিক্ত পণ্য আমদানির কথা উল্লেখ করা হয়।
একই অডিটে তিনটি বেসরকারি ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের অতিরিক্ত আমদানির তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ইস্টার্ন ডিপ্লোমেটিক সার্ভিসেস ওই অডিটের ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল এবং প্রাপ্যতার অতিরিক্ত আমদানির অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। পুরোনো অভিযোগকে বর্তমান কোনো অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। তবে বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। অডিটের চূড়ান্ত ফলাফল, পরবর্তী তদন্ত এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কিনা, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
ডিপ্লোমেটিক বন্ডের সুবিধা কারা পেতে পারেন?
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কূটনীতিকরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইস্যু করা Tax Exemption Certificate-এর ভিত্তিতে ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে শুল্কমুক্ত পণ্য কিনতে পারেন।
বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কাস্টমস পাসবুকের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব সুবিধার উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য শুল্কমুক্ত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা।
এ কারণে এই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:
১. কোন কূটনৈতিক মিশন বা আন্তর্জাতিক সংস্থার কতজন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানটি থেকে পণ্য কেনার অনুমতি পেয়েছেন?
২. তাদের বিপরীতে কী পরিমাণ পণ্য বরাদ্দ ছিল?
৩. বাস্তবে কত পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে?
৪. আমদানির পর পণ্যের মজুত ও বিক্রির হিসাব কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
৫. কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে পণ্য বিক্রির ঘটনা ঘটেছে কিনা?

এনবিআর ও বন্ড কমিশনারেটের কাছে যেসব তথ্য চাওয়া প্রয়োজন
| ক্রম | প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি |
|---|---|
| ১ | ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অনুমোদিত আমদানি প্রাপ্যতা |
| ২ | প্রতিটি অর্থবছরে পণ্যভিত্তিক আমদানি সীমা |
| ৩ | ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের প্রকৃত আমদানি মূল্য |
| ৪ | পণ্যভিত্তিক বিল অব এন্ট্রি ও HS Code |
| ৫ | আমদানিকৃত পণ্যের মজুত ও বিক্রয় রেজিস্টার |
| ৬ | কূটনীতিক ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নামে পণ্য সরবরাহের হিসাব |
| ৭ | ২০১২ সালের অডিট ও পরবর্তী তদন্তের ফলাফল |
| ৮ | সর্বশেষ বন্ড অডিটের প্রতিবেদন |
| ৯ | কোনো শুল্ক দাবি, জরিমানা, শোকজ বা মামলা রয়েছে কি না |
| ১০ | Inter Diplomatic Services Limited ও Eastern Diplomatic Services Limited-এর নামের সম্পর্ক ও আইনগত ব্যাখ্যা |
অনুসন্ধানের সারকথা
ইস্টার্ন ডিপ্লোমেটিক সার্ভিসেস লিমিটেডের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে অনুসন্ধানযোগ্য।
প্রথমত, ১৯৮৪ সালের বন্ড লাইসেন্স এখনো সক্রিয় এবং প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালেও আমদানি প্রাপ্যতা পেয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পুরোনো অডিটে অতিরিক্ত আমদানির অভিযোগ উঠেছিল, যা প্রতিষ্ঠানটি অস্বীকার করেছিল। সেই তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এবং পরবর্তী সময়ে কোনো সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কিনা, তা জানা জরুরি।
তৃতীয়ত, ২০২৫ সালের আবেদনপত্রে Eastern Diplomatic Services-এর লেটারহেডে Inter Diplomatic Services Limited-এর নামে আমদানি প্রাপ্যতার উল্লেখ পাওয়া গেছে। এর আইনগত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বর্তমান সময়ে শুল্ক ফাঁকি বা পণ্য পাচারের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত কিনা তা বলা হচ্ছে না। তবে আমদানি প্রাপ্যতা, প্রকৃত আমদানি, মজুত ও বিক্রির হিসাবের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা ছাড়া ডিপ্লোমেটিক বন্ডের সুবিধার ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ, তা নিশ্চিত হওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।
প্রতিবেদনটির ব্যবহৃত সূত্র ও নথি
১. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড— Bond Entitlement তালিকা।
২. ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট— Active Bond License List।
৩. ইস্টার্ন ডিপ্লোমেটিক সার্ভিসেসের ২৯ আগস্ট ২০২৫ তারিখের আবেদনপত্র।
৪. NBD Trade Data— Eastern Diplomatic Services Ltd.-এর আমদানি তথ্য।
৫. কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট— ডিপ্লোমেটিক বন্ডের কার্যপদ্ধতি।
৬. The Daily Star— Given by Ghosts, ২০১৮।
