দালালদের ছবি টাঙিয়ে নাগরিকদের সতর্ক করছে অধিদপ্তর; অথচ দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেন, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ, পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা এবং বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন—প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির জবাবদিহি কোথায়?
নিজস্ব প্রতিবেদক | FollowUpNews
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের সামনে সাতজন ব্যক্তির ছবি টাঙানো হয়েছে। লাল ব্যানারে লেখা, ‘চিহ্নিত এই দালালসহ অন্য প্রতারকদের থেকে সতর্ক থাকুন।’ অর্থাৎ পাসপোর্ট করতে এসে সাধারণ মানুষ যেন দালালদের খপ্পরে না পড়েন।
কিন্তু ব্যানারটি সামনে আসার পর আরও বড় একটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে— পাসপোর্টের দালালরা যাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেন, সেই অর্থের শেষ গন্তব্য কোথায়? দালালরা নিজেরা তো পাসপোর্ট অনুমোদন করেন না, বায়োমেট্রিক যাচাই করেন না, সরকারি সার্ভারে তথ্য সংশোধন করেন না কিংবা পাসপোর্ট প্রিন্ট করেন না। এসব কাজের দায়িত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
তাহলে দালালদের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয় কীভাবে? কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সহযোগিতা ছাড়া একটি দালাল সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সেবা ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে কি?
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা, শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব এবং বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদায়নের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সমস্যাটি শুধু অফিসের বাইরের দালালদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদের উৎস অনুসন্ধানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দালালদের ছবি, কিন্তু ঘুষের টাকা যায় কার কাছে?
একজন আবেদনকারী সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে পাসপোর্টের কাজ করাতে চাইলে দালাল তার কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন। কিন্তু দালালের প্রতিশ্রুত বিশেষ সুবিধা যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় কারা ভূমিকা রাখেন, সেটি অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
দালালদের মাধ্যমে ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি, তথ্য সংশোধন, ব্যাকডেটে পাসপোর্ট তৈরি কিংবা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা যাচাই না করে শুধু দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়।
দালালদের ফোনকল, আর্থিক লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ফাইল নিষ্পত্তির সময় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পরীক্ষা করলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব।
অথচ সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার জন্য সাতজনের ছবি টাঙানো হলেও তাদের সঙ্গে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা, সে বিষয়ে ব্যানারে কোনো তথ্য নেই। এই সাতজন আদলতে প্রমাণিত অপরাধী না হলে এভাবে ছবি টানিয়ে দেওয়ার আইনগত ভিত্তি কী?
কেস স্টাডি–১: দুদকের অভিযানে দালালদের পাশাপাশি উঠে আসে কর্মচারীদের সংশ্লিষ্টতা
২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে অভিযান চালায় দুদক। সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ঘুষ দাবি ও হয়রানির অভিযোগ যাচাই করতে দুদকের কর্মকর্তারা ছদ্মবেশে অফিসে অবস্থান করেন।
অভিযানের সময় কয়েকজন দালাল অর্থের বিনিময়ে পাসপোর্টের কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তারা পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথাও জানান।
অভিযানে অফিসের ভেতরে দালালদের উপস্থিতি এবং অনিয়মের বিষয় সামনে আসে।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালেও আগারগাঁওসহ বিভিন্ন পাসপোর্ট অফিসে দুদকের অভিযান পরিচালিত হয়। একটি অভিযানে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রিন্টিং শাখার দুই কর্মচারীর নামও মামলার অভিযোগে উঠে আসে।
দিনাজপুরের পাসপোর্ট অফিসে অভিযোগ ছিল, একজন কর্মচারী আবেদনপত্রে ভুল না থাকা সত্ত্বেও নানা অজুহাতে আবেদনকারীদের ফিরিয়ে দিতেন। এতে সেবাগ্রহীতারা দালালের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হতেন।
অর্থাৎ, সেবাগ্রহীতাকে হয়রানি করে দালালের কাছে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগও তদন্তের বিষয় হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
কেস স্টাডি–২: সাবেক মহাপরিচালক আবদুল মাবুদের ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকার সম্পদের অভিযোগ
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. আবদুল মাবুদ ও তার স্ত্রী নাসিমা খানের বিরুদ্ধে ৪ কোটি ৭২ লাখ ৩৬ হাজার ২১৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২১ সালের ১৬ জুন মামলা করে দুদক।
দুদকের অনুসন্ধানে তাদের নামে ৪৩টি এফডিআরে ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৯৪ হাজার ৯৪৩ টাকা থাকার তথ্য উঠে আসে।
এ ছাড়া ধানমন্ডিতে স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাট কেনা, জমি ক্রয়, পাঁচতলা বাড়ি নির্মাণ এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ করা ফ্ল্যাটের অর্থ পরিশোধের বিষয়েও প্রশ্ন তোলে দুদক।
অভিযোগে সম্পদের উৎস বৈধ দেখাতে কথিত দান ও ঋণের নথি জালিয়াতির বিষয়ও উঠে আসে।
একজন সাবেক মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে এত বিপুল সম্পদের অভিযোগ ওঠার পর পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি প্রতিরোধে কী ধরনের সংস্কার হয়েছিল, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: প্রথম আলো, ২০২১ সালের ১৬ জুনের দুদক মামলাসংক্রান্ত প্রতিবেদন।
কেস স্টাডি–৩: আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৮১ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৮১ লাখ ২ হাজার ১০৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৫৬ লাখ ৭১ হাজার ৯৪৯ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি দুদক অভিযোগপত্র অনুমোদন করে।
দুদকের তদন্তে তার ঘোষিত সম্পদের তুলনায় অনেক বেশি সম্পদের তথ্য পাওয়া যায় বলে জানানো হয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলাতেও আব্দুল্লাহ আল মামুনের নাম ছিল।
অর্থাৎ, পাসপোর্ট ইস্যুতে অনিয়মের অভিযোগ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ— দুটি পৃথক অনুসন্ধানের বিষয় সামনে আসে।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫।
কেস স্টাডি–৪: সাইদুল ইসলাম ও স্ত্রীর ২ কোটি ৬৩ লাখ টাকার সম্পদের অভিযোগ
২০২৫ সালের ২০ মে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিচালক মো. সাইদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী শায়লা আক্তারের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক।
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, সাইদুল ইসলামের নামে ১ কোটি ১৯ লাখ ৪ হাজার ২৪০ টাকা এবং তার স্ত্রীর নামে ১ কোটি ৪৪ লাখ ৭০ হাজার ৮৯৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ রয়েছে।
দম্পতির বিরুদ্ধে মোট অভিযোগের পরিমাণ ২ কোটি ৬৩ লাখ ৭৫ হাজার ১৩৬ টাকা।
২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি আদালত তাদের নামে থাকা বিভিন্ন জমি ক্রোকের আদেশ দেন।
এখানে উল্লেখযোগ্য, সম্পদ ক্রোকের আদেশ কোনো চূড়ান্ত দণ্ড নয়। তবে একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার সম্পদের উৎস নিয়ে দুদকের এমন অনুসন্ধান পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
সূত্র: বিডিনিউজ২৪, ২০ মে ২০২৫; বাসস, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬।
কেস স্টাডি–৫: মোহাম্মদপুর থেকে কক্সবাজার, তারপর সদরদপ্তর— মাকসুদুর রহমানের পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির প্রশ্নে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি উপপরিচালক মো. মাকসুদুর রহমানের কর্মস্থল পরিবর্তন ও পদায়ন।
অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের ৫ মে ঢাকা পশ্চিম আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, মোহাম্মদপুরে উপপরিচালক হিসেবে যোগ দেন।
মোহাম্মদপুরে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দালাল সিন্ডিকেট পরিচালনা, গ্রাহক হয়রানি এবং অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
ডেইলি ভয়েস নিউজের ১১ জানুয়ারি ২০২৬-এর একটি প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে প্রায় ৫০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে একাধিক ব্যাংক হিসাব, মোবাইল আর্থিক সেবায় লেনদেন, ঢাকায় জমি ও ফ্ল্যাট এবং স্ত্রীর নামে সম্পদের তথ্য প্রকাশ করা হয়।
পরবর্তী সময়ে News Next-এর ২৯ জুন ২০২৬-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও তার ও স্ত্রী নাসরিন আক্তারের নামে বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাটের তথ্য প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে এসব সম্পদের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়।
তবে ৫০ কোটি ও ৬০ কোটি টাকার হিসাব দুটি পৃথক সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী দাবি। এগুলোকে দুদকের প্রমাণিত সম্পদের হিসাব হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। সম্পদের দলিল, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব এবং দুদকের তদন্তের মাধ্যমে এগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
কক্সবাজারে বদলি, সেখানেও অভিযোগের প্রশ্ন
মোহাম্মদপুর থেকে বদলি হয়ে মাকসুদুর রহমান কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। কক্সবাজারে তার দায়িত্বকালেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে বলে FollowUpNews-এর অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কক্সবাজারে তার দায়িত্বকালীন নির্দিষ্ট অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট দুদক তদন্ত এবং প্রমাণিত অনিয়মের নথি আলাদাভাবে সংগ্রহ করা জরুরি। ২০২৩ সালের কক্সবাজার পাসপোর্ট অফিসে দুদকের অভিযান তার দায়িত্ব গ্রহণের আগের ঘটনা; সেটিকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬: সদরদপ্তরের প্রশাসন শাখায় পদায়ন
FollowUpNews-এর অনুসন্ধানে পাওয়া অধিদপ্তরের পদায়নসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মো. মাকসুদুর রহমানকে ঢাকা পশ্চিম আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে অধিদপ্তরের সদরদপ্তরের প্রশাসন শাখায় উপপরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদায়ন। কারণ প্রশাসন শাখার সঙ্গে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, বদলি ও পদায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কার্যক্রমের সম্পর্ক রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, মোহাম্মদপুরে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত গুরুতর অভিযোগগুলো যাচাই করা হয়েছিল কি? কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনের সময় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনো তদন্ত হয়েছিল কি? এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি না হলে সদরদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী ছিল?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— এই পদায়নের সুপারিশ কে করেছিলেন? সুপারিশের আগে তার সম্পদ ও পূর্ববর্তী কর্মস্থলের অভিযোগ যাচাই করা হয়েছিল কি?
কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাকে অপরাধী বলা যায় না। কিন্তু অভিযোগগুলো যাচাই না করে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
এমন পদায়ন কি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নাকি দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত কর্মকর্তাদের জন্য আরও ভালো কর্মস্থলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে?
টাকা দিয়ে পদায়ন কেনার অভিযোগের কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে পদায়নের সুপারিশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ এবং অভিযোগ যাচাইয়ের নথি প্রকাশ করা হলে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।
দুর্নীতির অভিযোগে বদলি, নাকি জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ?
সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়ন স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে অন্য কর্মস্থলে পাঠানো হলে অভিযোগের তদন্ত বন্ধ হয়ে যেতে পারে না।
বরং নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার আগে আগের কর্মস্থলের অভিযোগগুলোর অগ্রগতি যাচাই করা উচিত।
কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাঁকে বদলি করাই শাস্তি নয়। আবার সদরদপ্তরে পদায়ন করাও অপরাধের প্রমাণ নয়। কিন্তু অভিযোগের তদন্ত, সম্পদের উৎস যাচাই এবং বিভাগীয় জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে প্রশাসনিক বদলি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ক্ষেত্রে তাই একটি প্রশ্ন সামনে আসে— দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ যাচাইব্যবস্থা আছে কি?
দালালদের ছবি টাঙানোর আগে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করবে কে?
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সামনে সাতজনের ছবি টাঙানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, কী প্রমাণ এবং কী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে— সেটি নাগরিকদের জানানো প্রয়োজন। ছবির ভিত্তিতে তাদের নেশাগ্রস্ত বা অপরাধী বলারও সুযোগ নেই; সেটি পৃথকভাবে যাচাই করতে হবে।
কিন্তু অধিদপ্তরের নিজস্ব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যখন কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মামলা হয়, পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় কর্মকর্তাদের নাম আসে এবং দালালদের সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের যোগসাজশের অভিযোগ ওঠে, তখন শুধু বহিরাগতদের ছবি প্রদর্শন করে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান তুলে ধরা যথেষ্ট নয়।
দালালরা ঘুষের টাকা সংগ্রহ করলে সেই অর্থের গন্তব্য কোথায়, কারা সুবিধাভোগী এবং কোন পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা রয়েছে— তা বের করতে হবে।
অধিদপ্তরের প্রতিটি আঞ্চলিক অফিসে দালালদের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগাযোগ, অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি, ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক লেনদেন এবং ফাইল নিষ্পত্তির ধরন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে FollowUpNews-এর প্রশ্ন
১. অধিদপ্তরের সামনে প্রদর্শিত সাতজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী? তাদের বিরুদ্ধে মামলা বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?
২. গত পাঁচ বছরে দালালদের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে কতজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
৩. দুদকের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া দালালদের কাছ থেকে পাওয়া মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড ও আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে কোনো কর্মকর্তা শনাক্ত হয়েছেন কি?
৪. সাবেক মহাপরিচালক আবদুল মাবুদ এবং পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সম্পদসংক্রান্ত মামলাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে অধিদপ্তরে কোনো বিশেষ দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?
৫. মো. মাকসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুরে দায়িত্ব পালনকালে প্রকাশিত সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে কি?
৬. কক্সবাজারে তার দায়িত্বকালীন অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছে কি?
৭. ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তাকে সদরদপ্তরের প্রশাসন শাখায় পদায়নের সুপারিশকারী এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ কারা?
৮. তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগগুলো পদায়নের আগে যাচাই করা হয়েছিল কি?
৯. দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়িত হলে সেই সিদ্ধান্তের কারণ ও তদন্তের অবস্থা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে কি?
দালালদের ছবি নয়, দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সামনে সাতজনের ছবি টাঙানো হয়েছে। নাগরিকদের বলা হচ্ছে, তাদের থেকে সতর্ক থাকুন। কিন্তু নাগরিকদের আরও বড় প্রশ্ন— যে সরকারি প্রতিষ্ঠানে পাসপোর্ট ইস্যু হয়, সেখানে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে কতটা?
সাবেক মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের মামলা, পরিচালকদের বিরুদ্ধে সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগ, বেনজীর আহমেদের পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় চার কর্মকর্তার নাম এবং মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোতে দালালদের সঙ্গে কর্মচারীদের যোগাযোগের অভিযোগ— এসব ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোহাম্মদপুর থেকে কক্সবাজার এবং সেখান থেকে সদরদপ্তরের প্রশাসন শাখায় মাকসুদুর রহমানের পদায়ন ঘিরে প্রশ্ন। অভিযোগের তদন্ত ও নিষ্পত্তির আগে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
দালালরা ঘুষের টাকা সংগ্রহ করে, কিন্তু সরকারি সেবার দরজা খুলে দেন কারা? দালালদের ছবি টাঙানো হয়েছে; এবার পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ভেতরে দুর্নীতির অভিযোগে যাদের জবাবদিহি করা প্রয়োজন, তাদের বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করুক কর্তৃপক্ষ।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হওয়া উচিৎ প্রতিষ্ঠানের নিজের ভেতর থেকেই।
