Headlines

বন্ড অডিট হয়েছে, কিন্তু কী যাচাই হয়েছে? Ananta Apparels-এর নথি ঘিরে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক | FollowUpNews

নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠান Ananta Apparels Ltd-এর বন্ড লাইসেন্সের বিপরীতে অডিটের তারিখ ৩০ জুন ২০২৫ দেখাচ্ছে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের অনলাইন ডেটাবেজে। একই রেকর্ডে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্সের স্ট্যাটাস ‘Active’ এবং ‘SCN Demand’ শূন্য প্রদর্শিত হয়েছে। তবে অডিটে কী কী বিষয় যাচাই করা হয়েছে, কোনো আপত্তি উত্থাপিত হয়েছিল কিনা এবং অডিটের পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তি হয়েছে কিনা— এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্য রেকর্ড থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদন, রপ্তানি ও অবশিষ্ট মজুতের হিসাব যাচাইয়ে অডিটের প্রকৃত পরিধি কী ছিল? অডিটের তারিখ নথিভুক্ত থাকলেও তার ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য কেন সহজে পাওয়া যাচ্ছে না?

অনন্ত অ্যাপারেলস লিমিটেড (Ananta Apparels Ltd.) বাংলাদেশের পোশাক খাতের একটি অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং ১০০% রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিটি তৈরি পোশাক খাতের বৃহৎ কর্পোরেট গ্রুপ অনন্ত গ্রুপ (Ananta Group)-এর একটি অন্যতম প্রধান অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান।

বন্ড লাইসেন্সের তথ্য কী বলছে?

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর অনলাইন ডেটাবেজে প্রতিষ্ঠানটির নাম রয়েছে ‘ANANTA APPARELS LTD (FORMER DNV CLOTHING LTD)’ হিসেবে। প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স নম্বর 117/AEPZ/2006 এবং BIN 000320225-0305। ঠিকানা হিসেবে আদমজী ইপিজেডের প্লট ৯৭–১০১ এবং ২৪৬–২৪৯-এর তথ্য পাওয়া যায়।

প্রকাশ্য রেকর্ডে লাইসেন্সের স্ট্যাটাস ‘Active’, SCN Demand শূন্য এবং লাইসেন্স নবায়নের তারিখ ৩০ জুন ২০২৭ প্রদর্শিত হয়েছে। অডিটের তারিখ দেখানো হয়েছে ৩০ জুন ২০২৫।

তবে এসব তথ্যের অর্থ সতর্কতার সঙ্গে বুঝতে হবে। লাইসেন্স ‘Active’ থাকা মানেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি আমদানি, উৎপাদন ও রপ্তানি লেনদেন নিরীক্ষায় সঠিক প্রমাণিত হয়েছে— এমন নয়। একইভাবে SCN Demand শূন্য থাকাও অডিটে কোনো আপত্তি ওঠেনি, অতীতের সব দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে কিংবা প্রতিষ্ঠানের কোনো হিসাবগত অসংগতি নেই— তার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

অডিটের প্রকৃত ফলাফল জানতে প্রয়োজন মূল প্রতিবেদন, পর্যবেক্ষণ, আপত্তি এবং নিষ্পত্তির আদেশ।

শুল্কমুক্ত কাঁচামালের হিসাব কতটা স্বচ্ছ?

রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত শর্তে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা পায়। এ সুবিধার যথাযথতা যাচাইয়ের জন্য আমদানি করা কাঁচামালের ব্যবহার, উৎপাদন, রপ্তানি, অবশিষ্ট মজুত এবং অনুমোদিত অপচয়ের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ।

Ananta Apparels-এর ক্ষেত্রেও অনুসন্ধানের মূল বিষয় তাই সংশ্লিষ্ট বন্ড লাইসেন্সের অধীনে কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি হয়েছে এবং সেই কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদিত পণ্যের কতটুকু রপ্তানি হয়েছে।

এ জন্য আমদানি ঘোষণা বা Bill of Entry, অনুমোদিত কাঁচামাল তালিকা, Utilisation Declaration (UD), উৎপাদন রেজিস্টার, রপ্তানি-সংক্রান্ত নথি এবং মজুতের হিসাব একই সময়সীমায় মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কোনো কাঁচামাল অব্যবহৃত থাকলে তার মজুত, অনুমোদিত অপচয়, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ক্ষয়ক্ষতি এবং রপ্তানির বিপরীতে অবশিষ্ট উপকরণের হিসাবও যাচাই করা দরকার। তবে এসব ক্ষেত্রে কোনো অসংগতি রয়েছে— এমন প্রমাণ এখনো প্রকাশ্য তথ্য থেকে পাওয়া যায়নি।

অডিটে কী কী যাচাই করা হয়েছিল?

প্রতিষ্ঠানটির বন্ড অডিটের তারিখ জানা গেলেও অডিটের পূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ্য অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। ফলে অডিটটি কেবল নথিপত্র পর্যালোচনার মধ্যে সীমিত ছিল, নাকি প্রকৃত মজুত, উৎপাদন সক্ষমতা ও আমদানি-রপ্তানির হিসাবের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করা হয়েছিল— তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এখানে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণঃ

  • অডিটে কোন অর্থবছরের হিসাব পরীক্ষা করা হয়েছিল?
  • আমদানিকৃত কাঁচামালের পরিমাণের সঙ্গে উৎপাদন ও রপ্তানির হিসাব মিলিয়ে দেখা হয়েছিল কি?
  • কোনো কাঁচামালের ঘাটতি, অতিরিক্ত মজুত কিংবা অনুমোদিত অপচয়ের বাইরে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল কি?
  • কোনো অডিট আপত্তি বা শুল্ক-কর দাবির সুপারিশ করা হয়েছিল কি?
  • আপত্তি থাকলে প্রতিষ্ঠানটির জবাব ও নিষ্পত্তির আদেশ কী?
  • অডিটের পর পুনঃপরিদর্শন বা অন্য কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া অডিটের কার্যকারিতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয় বলে দাবী একজন বন্ড অফিসারের।

উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানির হিসাব

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (BGMEA)-এর প্রকাশ্য সদস্যতথ্যে Ananta Apparels-এর প্রধান রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসেবে প্যান্ট, শর্টস, স্কার্ট ও ট্রাউজারের উল্লেখ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মী এবং মেশিনের সংখ্যা সম্পর্কেও সদস্যতথ্যে বিভিন্ন পরিসংখ্যান দেখা যায়।

তবে ভিন্ন সদস্য রেকর্ডে ভিন্ন পরিসংখ্যান থাকায় সেগুলোকে একই কারখানার বর্তমান তথ্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। এ বিষয়ে BGMEA, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (BEPZA) এবং প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে হালনাগাদ, ইউনিটভিত্তিক তথ্য নেওয়া প্রয়োজন।

প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু মোট রপ্তানি আয় নয়, সংশ্লিষ্ট বন্ড লাইসেন্সের অধীনে আমদানিকৃত কাঁচামাল, উৎপাদিত পণ্য, রপ্তানির পরিমাণ এবং অবশিষ্ট মজুতের হিসাব পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

ওয়াশিং প্ল্যান্ট নিয়ে পুরোনো আন্তর্জাতিক প্রকল্প-নথি

আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা International Finance Corporation (IFC)-এর প্রকাশ্য প্রকল্প-নথিতে Ananta Apparels-এর আদমজী ইপিজেড কারখানায় ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনার তথ্য রয়েছে। ২০১৭ সালের একটি প্রকল্প-পর্যালোচনায় প্ল্যান্টটির জন্য সর্বোচ্চ ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়।

ওই প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক পর্যালোচনায় পানির ব্যবহার, বর্জ্যপানি শোধন, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা, বিপজ্জনক বর্জ্য, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল।

এগুলো ঐতিহাসিক প্রকল্প-নথি; এগুলো দিয়ে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কোনো পরিবেশগত অনিয়ম হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। তবে কারখানার বর্তমান কার্যক্রম, পরিবেশগত ছাড়পত্র, Effluent Treatment Plant (ETP)-এর কার্যকারিতা এবং বর্জ্যপানি পরীক্ষার সর্বশেষ প্রতিবেদন যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

একই সঙ্গে ওয়াশিং প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষেত্রে বন্ড সুবিধা প্রযোজ্য কিনা, তা আমদানি ঘোষণা, অনুমোদিত কাঁচামাল তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট শুল্ক-নথি দিয়ে যাচাই করা যেতে পারে। সব রাসায়নিকই শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা হয়েছে— এমন কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

ব্যাংক গ্যারান্টি ও বন্ড দায়ের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের প্রকাশ্য লিয়েন-ব্যাংক অনুসন্ধানেও প্রতিষ্ঠানটির রেকর্ড রয়েছে। সেখানে Prime Bank Limited-এর Elephant Road Branch-এর নাম পাওয়া যায়। তবে এই তথ্য থেকে প্রতিষ্ঠানটি ঋণখেলাপি, শুল্ক বকেয়া রয়েছে কিংবা কোনো আর্থিক অনিয়ম করেছে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

বন্ড লাইসেন্সের বিপরীতে ব্যাংক গ্যারান্টির পরিমাণ, মেয়াদ, নবায়ন, অবমুক্তি এবং কোনো দাবি উত্থাপিত হয়েছিল কিনা— এসব নথি যাচাই করলে বন্ড দায়ের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।

কাস্টমস ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ

অনুসন্ধানের জন্য কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর কাছে ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে প্রদর্শিত অডিটের পূর্ণ প্রতিবেদন, অডিটের পরিধি, পর্যবেক্ষণ, আপত্তি এবং নিষ্পত্তির আদেশ চাওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ২০২৩–২৪, ২০২৪–২৫ ও ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বন্ড লাইসেন্সভিত্তিক আমদানি-রপ্তানির সংকলিত তথ্য সংগ্রহ করা দরকার।

BEPZA-এর কাছে সংশ্লিষ্ট ইউনিটের উৎপাদন ও রপ্তানির হালনাগাদ তথ্য এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে প্রযোজ্য ছাড়পত্র ও পরিদর্শন-সংক্রান্ত নথিও অনুসন্ধানের পরিধিতে আনা যেতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটির কাছেও অডিটের ফলাফল, কাঁচামাল ব্যবহারের হিসাব, উৎপাদন সক্ষমতা এবং ওয়াশিং প্ল্যান্টের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বক্তব্য চাওয়া প্রয়োজন।

প্রশ্ন অডিটের কার্যকারিতা নিয়ে, অভিযোগ নয়

প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী Ananta Apparels-এর বন্ড লাইসেন্স Active এবং SCN Demand শূন্য। কিন্তু অডিটের পূর্ণ প্রতিবেদন ছাড়া এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের সব কার্যক্রম যথাযথ ছিল কিংবা কোনো অনিয়ম ঘটেছে— কোনোটিই নিশ্চিত করে বলা যায় না।

তাই অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন হলো, অডিটে কী যাচাই করা হয়েছিল, তার ফলাফল কী ছিল এবং সংশ্লিষ্ট নথি কতটা স্বচ্ছভাবে পাওয়া যাচ্ছে।

শুল্কমুক্ত কাঁচামালের সুবিধা রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এ সুবিধার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কার্যকর নিরীক্ষা ও জবাবদিহি প্রয়োজন। Ananta Apparels-এর অডিটের পূর্ণ প্রতিবেদন, আমদানি-রপ্তানির হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।