বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ইতিহাসে এ কে এম সেলিম ওসমানের নাম এক অনন্য ও বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে। ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৪ বছর তিনি বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে শেষ সাতটি মেয়াদে তিনি ও তার প্যানেল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখেন। তবে তার এই একাধিপত্য কেবল একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বেই সীমাবদ্ধ ছিল না; রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সাংগঠনিক সমঝোতার সেই সমীকরণকে কাজে লাগিয়ে তিনি তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।
একেএম সেলিম ওসমান। বিকেএমই-এর সভাপতি। ছবিঃ টেক্সটাইলটুডে থেকে নেওয়া।
১. ওসমান পরিবারের আঞ্চলিক প্রভাব ও ‘সমঝোতার’ নেতৃত্ব
সেলিম ওসমানের এই একচ্ছত্র প্রভাবের সবচেয়ে বড় ভিত্তি ছিল নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ও প্রভাবশালী ‘ওসমান পরিবার’। তিনি নিজে ২০১৪ সাল থেকে জাতীয় পার্টির টিকেটে আওয়ামী লীগ জোটের সমর্থনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ছিলেন। তার ভাই শামীম ওসমান ছিলেন একই অঞ্চলের আওয়ামী লীগের অত্যন্ত ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। রাজপথ এবং স্থানীয় রাজনীতি ও প্রশাসনে এই পরিবারের যে চুনোপুঁটি থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল, তার ছায়া সরাসরি এসে পড়েছিল বিকেএমইএ-র ওপর।
সাধারণ সদস্যদের একাংশের অভিযোগ ছিল, সেলিম ওসমানের মেয়াদে সংগঠনটিতে কোনো গণতান্ত্রিক বা প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হতো না। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলেও, ভোটের আগেই সেলিম ওসমানের ঢাকার গুলশানের বাসায় কিংবা নারায়ণগঞ্জের প্রধান কার্যালয়ে বসে সমঝোতার মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদ চূড়ান্ত করা হতো। এই সমঝোতার সংস্কৃতি এমন এক অবস্থা তৈরি করেছিল যেখানে কার্যনির্বাহী কমিটির ৩৫টি পদের বিপরীতে কেবল তার প্যানেলের প্রার্থীরাই মনোনয়নপত্র জমা দিতেন। ফলে নির্বাচন কমিশন প্রতিবারই সেলিম ওসমানের প্যানেলকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করতে বাধ্য হতো।
ইতালির তৎকালীন রাষ্ট্রদূত এনরিকো নুনজিয়াটার সাথে বিকেএমই-এর সভাপতি সেলিম ওসমান।
২. সভাপতি হওয়ার আগে: মাঝারি সারির ‘উইজডম’
১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু করা সেলিম ওসমানের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান উইজডম অ্যাটায়ার্স লিমিটেড (Wisdom Attires Ltd.) ২০১০ সালে তিনি বিকেএমইএ-এর হাল ধরার আগে ছিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা অঞ্চলের একটি সাধারণ ও মাঝারি সারির ১০০% রপ্তানিমুখী নিট পোশাক কারখানা। তখন কারখানাটির উৎপাদন ক্ষমতা এবং ক্রেতা সংখ্যা ছিল সীমিত। মূলত ইউরোপ ও আমেরিকার অল্প কিছু সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের জন্য তারা সাব-কন্ট্রাক্ট বা সরাসরি ছোট-মাঝারি আকারের তৈরি পোশাক (যেমন টি-শার্ট, পোলো শার্ট) রপ্তানি করত। নিট কাপড়ের সুতা ও ডাইং কেমিক্যালের জন্য তখন প্রতিষ্ঠানটিকে অন্যান্য টেক্সটাইল ও ডাইং মিল এবং বিদেশের আমদানির ওপর বেশ নির্ভর করতে হতো।
৩. নেতৃত্বের ক্ষমতায় ‘উইজডম’-এর রাজকীয় রূপান্তর
২০১০ সালে বিকেএমইএ-এর শীর্ষ পদে বসার পর এবং পরবর্তীতে সংসদ সদস্য (এমপি) হওয়ার পর সেলিম ওসমানের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবের সুবর্ণ সময় শুরু হয়। একই সাথে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ নেতা এবং ক্ষমতাসীন জোটের সংসদ সদস্য হওয়ায় সেলিম ওসমানের হাতে ছিল দ্বিমুখী ক্ষমতা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চমহলে তার সরাসরি এক্সেস ছিল।
ব্যবসায়ী খাতের নীতি নির্ধারণী সুবিধা, ক্যাশ ইনসেন্টিভ বা নগদ সহায়তা আদায়, এবং ব্যাংক লোনের ক্ষেত্রে লবিংয়ের ক্ষমতা সরাসরি কাজে লাগে তার নিজস্ব ব্যবসায়। গত ১৪ বছরে উইজডম অ্যাটায়ার্স একটি সাধারণ কারখানা থেকে বিশাল কম্পোজিট বা ভার্টিক্যালি ইন্টিগ্রেটেড (Vertically Integrated) শিল্প গ্রুপে রূপান্তরিত হয়।
সেলিম ওসমান এবং তার প্রতিষ্ঠান উইজডম এটায়ারস্ লিঃ
বিশ্বব্যাপী ক্রেতাদের বিশাল নেটওয়ার্ক: বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), যুক্তরাজ্য (UK) এবং কানাডাসহ বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশের ৮৭টিরও বেশি গ্লোবাল ব্র্যান্ডের কাছে তাদের উৎপাদিত পোশাক সরাসরি রপ্তানি হচ্ছে।
বিশাল রপ্তানি প্রবৃদ্ধি: বর্তমানে উইজডম অ্যাটায়ার্স লিমিটেড বার্ষিক ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি (৩৫ মিলিয়ন+) পোশাক বিশ্ববাজারে রপ্তানি করছে।
আমদানি নির্ভরতা হ্রাস ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা: কারখানাটি এখন ২ লাখ ৬৪ হাজার বর্গফুটের একটি বিশাল আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন কমপ্লিট সেটআপ। সুতা ও কাপড় ডাইং থেকে শুরু করে ফিনিশিং— সব এখন নিজস্ব কারখানায় ইন-হাউস (In-house) করা হয়। ফলে কাঁচামাল আমদানির খরচ ও পরনির্ভরতা বহুলাংশে কমে এসেছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও গ্রিন ফ্যাক্টরি: তার মেয়াদে কারখানাটি পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হিসেবে গড়ে ওঠে। এটি বর্তমানে LEED Gold সার্টিফাইড গ্রিন ফ্যাক্টরি। এছাড়াও ISO 9001:2015, OEKO-TEX স্ট্যান্ডার্ড ১০০ এবং BSCI-এর মতো শীর্ষ গ্লোবাল কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেশন অর্জন করেছে।কর্মসংস্থান: ৫০০-এর বেশি আধুনিক মেশিন এবং ২,৫০০-এর বেশি শ্রমিকের এক বিশাল বহর এখন এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে।
৪. সংকট মোকাবিলায় ‘ত্রাতা’ বনাম একচ্ছত্র রাজত্ব
নারায়ণগঞ্জ ও ফতুল্লা অঞ্চলের পোশাক কারখানায় প্রায়ই শ্রমিক অসন্তোষ বা বেতন-ভাতা নিয়ে যে ঝামেলার সৃষ্টি হতো, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তির জোরে সেলিম ওসমান তা কঠোর হস্তে সামাল দিতে পারতেন। মালিকপক্ষের স্বার্থ রক্ষা এবং শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণে তার এই কার্যকারিতা পোশাক শিল্প মালিকদের কাছে তাকে অপরিহার্য করে তুলেছিল। অনেকেই মনে করতেন, তৈরি পোশাক খাতের স্বার্থ সুরক্ষায় তার মতো “শক্তিশালী” নেতার বিকল্প নেই, যার সুবাদে তার নিজের ব্যবসাও দিন দিন ফুলেফেঁপে উঠেছিল।
অবসান এবং বর্তমান বাস্তবতা
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেলিম ওসমানের এই দীর্ঘমেয়াদী রাজত্বের পতন ঘটে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, ২৫ আগস্ট তিনি আত্মগোপনে থাকা অবস্থা থেকেই বিকেএমইএ-র সভাপতি ও পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় ও একাধিক ছাত্র-জনতা হত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রেকর্ড অনুযায়ী পলাতক বা আত্মগোপনে রয়েছেন। সম্প্রতি পুলিশ তার মালিকানাধীন উইজডম অ্যাটায়ার্স কারখানাতেও গ্রেপ্তারি অভিযান চালিয়েছে। সেলিম ওসমানের এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটেছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংগঠনটি আঁকড়ে রাখার এক দীর্ঘ একচ্ছত্র অধ্যায়ের, এবং বিকেএমইএ-তে প্রথমবারের মতো খোলে মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক নেতৃত্বের নতুন দুয়ার।