বছরে ১ কোটি ৮৮ লাখ পিস উৎপাদনক্ষমতার দাবি; EPB-তে ১৩টির বেশি গার্মেন্টস HS Code— বন্ড সুবিধার কাঁচামাল ও রপ্তানির হিসাব কতটা স্বচ্ছ?
কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (KEPZ) বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান HKD Outdoor Innovations Ltd.-এর উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম নিয়ে সামনে আসছে বড় একটি প্রশ্ন— বন্ড সুবিধায় যে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করা হয়, তার বিপরীতে প্রকৃত উৎপাদন ও রপ্তানির হিসাব কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
প্রশ্নটি কোনো বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধিতা নয়। বরং রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়া একটি বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কাঁচামাল আমদানি থেকে উৎপাদন এবং উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত হিসাব কতটা স্বচ্ছ— সেটি জানার জনস্বার্থের প্রশ্ন।
টেন্ট থেকে গার্মেন্টস— বদলেছে উৎপাদনের পরিধি
HKD-এর বাংলাদেশে কার্যক্রম পুরোনো। BEPZA-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯০ সালে চট্টগ্রামে কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তী সময়ে কর্ণফুলী EPZ-এ ব্যবসা সম্প্রসারণ করে।
২০১৯ সালে BEPZA জানায়, HKD কর্ণফুলী EPZ-এ আরও ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে নতুন টেন্ট ও গার্মেন্টস উৎপাদন ইউনিট স্থাপন করবে। ওই ইউনিটে টেন্ট ও টেন্ট accessories-এর পাশাপাশি tops, short pant, headwear, neck warmer, lingerie, maskসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়।
এরপর ২০২২ সালে BEPZA আরও বড় একটি প্রকল্পের তথ্য প্রকাশ করে। HKD Bangladesh Limited-এর নামে BEPZA Economic Zone-এ টেন্ট, টেন্ট accessories, camping furniture ও camping equipment উৎপাদনের জন্য US$35.03 million বিনিয়োগের চুক্তির কথা জানানো হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হলো— BEPZA তখন ওই প্রকল্পের বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ১৮.৮ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৮৮ লাখ পিস বলে উল্লেখ করে। তালিকায় ছিল tent, backpack, bag, steel pole, fiberglass pole, traveler’s bag, gazebo, screen house, cot, pet carrier, camping furniture, chair, table, sleeping bagসহ বহু পণ্য।
অর্থাৎ HKD-এর উৎপাদন কার্যক্রমকে শুধু ‘টেন্ট কারখানা’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
EPB-এর তথ্যেও গার্মেন্টসের বিস্তৃত তালিকা
বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) exporter database-এ HKD Outdoor Innovations Limited-এর জন্য একাধিক garment HS Code রয়েছে।
সেখানে নারী ও পুরুষের overcoat, shirts, T-shirts, jerseys/pullovers, women’s blouses, baby garments, tracksuits, swimwear, suits, headgearসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাকের HS Code তালিকাভুক্ত রয়েছে।
অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে tent, outdoor products এবং বিভিন্ন ধরনের ready-made garments রপ্তানি করছে।
এখানেই বন্ড ব্যবস্থাপনার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বছরে ১ কোটি ৮৮ লাখ পিস— কিন্তু বাস্তবে কত?
BEPZA-এর ২০২২ সালের তথ্য একটি নির্দিষ্ট উৎপাদনক্ষমতার কথা বলছে— ১৮.৮ মিলিয়ন পিস বা ১ কোটি ৮৮ লাখ পিস প্রতি বছর।
কিন্তু উৎপাদনক্ষমতা আর প্রকৃত উৎপাদন এক বিষয় নয়।
তাই অনুসন্ধানের প্রয়োজন—
২০২২–২৩ সালে প্রকৃত উৎপাদন কত ছিল?
২০২৩–২৪ সালে কত?
২০২৪–২৫ সালে কত?
২০২৫–২৬ সালে কত?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত উৎপাদনক্ষমতার কত শতাংশ বাস্তবে ব্যবহার হয়েছে?
এই তথ্য পাওয়া গেলে বন্ড সুবিধার কাঁচামাল ব্যবহারের হিসাবও অনেক পরিষ্কার হবে।
বন্ডের হিসাবই হতে পারে আসল চাবিকাঠি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের Customs তথ্য অনুযায়ী, bonded warehouse সুবিধার আওতায় রপ্তানিমুখী শিল্প নির্দিষ্ট শর্তে কাঁচামাল ও packing materials শুল্ক-কর না দিয়ে আমদানি করতে পারে। তবে আমদানির পরিমাণ bond entitlement-এর সীমার মধ্যে থাকতে হয়। উৎপাদনক্ষমতা এবং আগের বছরের export ও raw-material usage-এর ভিত্তিতে entitlement নির্ধারণ করা হয়; আর UD/UP-এর মাধ্যমে কোন পণ্যে কত input ব্যবহারের কথা তা নির্ধারিত হয়।
একই সঙ্গে বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানকে bond register ও সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণ করতে হয় এবং bonded warehouse mandatory yearly audit-এর আওতায় থাকে।
সুতরাং HKD-এর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি খুব নির্দিষ্ট—
এক কোটি ৮৮ লাখ পিস পর্যন্ত উৎপাদনক্ষমতার একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বছরে কত কাঁচামালের entitlement দেওয়া হয়েছে এবং বাস্তবে কত কাঁচামাল আমদানি করা হয়েছে?
এরপর দেখতে হবে—
আমদানি → বন্ডে প্রবেশ → উৎপাদনে ব্যবহার → wastage → finished goods → export।
HKD নিজেও বন্ড কার্যক্রমের কথা বলেছে
HKD-এর বাণিজ্যিক বিভাগের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে Bond License, In-Bond, Ex-Bond, UP, UD Statement, Custom-Bond Register এবং Bond Audit-এর দায়িত্বের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। একই বিজ্ঞপ্তিতে import-export activities এবং Customs/VAT compliance-এর কথাও রয়েছে।
অর্থাৎ বন্ড ব্যবস্থাপনা HKD-এর ব্যবসার বাইরে কোনো বিষয় নয়।
এখন প্রশ্ন হলো— এই বন্ডের হিসাব কেমন?
রপ্তানির বাস্তব চিত্রও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়
আন্তর্জাতিক customs-data ভিত্তিক একটি ডাটাবেসে HKD-এর নামে ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ৩৬,৫৪৯টি import-export record দেখানো হয়েছে। সেখানে ২০২৫ সালে ৬২১টি export entry এবং ৪,৯৮০টি import entry; ২০২৪ সালে ৩৩৫টি export এবং ৪,৬৭৮টি import entry; ২০২২ সালে ২৫৬টি export ও ১৩,০৩৭টি import entry দেখানো হয়েছে।
এগুলো shipment/entry data— সরাসরি উৎপাদন বা সরকারি রপ্তানি আয়ের হিসাব নয়। তাই এখান থেকে কোনো রাজস্ব অনিয়মের সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না।
তবে অনুসন্ধানের জন্য তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একই database-এর সাম্প্রতিক রেকর্ডে HKD-এর রপ্তানি হিসেবে ready-made garments, আবার অন্য চালানে steel/metal-related products-এর তথ্য দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের একটি চালানে recycled polyester shell-এর ready-made garment-এর তথ্যও রয়েছে।
অর্থাৎ উৎপাদনের বহুমুখিতা শুধু পুরোনো BEPZA ঘোষণাতেই নয়, সাম্প্রতিক trade records-এও প্রতিফলিত হচ্ছে।
তাহলে প্রশ্নটা কোথায়?
প্রশ্নটা এই নয় যে HKD কেন এত পণ্য তৈরি করছে।
প্রশ্নটা হলো—
এত ধরনের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য কত ধরনের কাঁচামাল আমদানি করা হচ্ছে?
কোন কাঁচামাল কোন পণ্যে ব্যবহার হচ্ছে?
প্রতি পণ্যের input-output coefficient কী?
কতটুকু wastage অনুমোদিত?
বাস্তবে wastage কত?
বন্ড রেজিস্টারে closing stock কত?
রপ্তানির পর UD/UP কীভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে?
এবং সবশেষে—
বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামালের প্রতিটি অংশের বিপরীতে রপ্তানির হিসাব কি Customs-এর নথিতে পরিষ্কারভাবে মিলে যাচ্ছে?
বিদেশি প্রতিষ্ঠান বলে কি প্রশ্ন করা যাবে না?
HKD দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। BEPZA-এর ২০২৩–২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে HKD Outdoor Innovations Limited-কে কর্ণফুলী EPZ-এর শীর্ষ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ US$28.61 million এবং প্রধান পণ্য হিসেবে Tent উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগ অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান আর স্বচ্ছতার দাবি— দুটি পরস্পরবিরোধী নয়।
বরং যে প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্র বিনিয়োগ ও রপ্তানির জন্য নানা সুবিধা দেয়, তার ক্ষেত্রে হিসাব আরও পরিষ্কার থাকা উচিত।
এখন সবচেয়ে জরুরি যে তথ্যগুলো
HKD নিয়ে প্রকৃত অনুসন্ধান করতে Customs Bond Commissionerate ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অন্তত পাঁচ বছরের তথ্য প্রয়োজন—
১. বর্তমান Bond Licence Number ও status
২. বছরভিত্তিক bond entitlement
৩. বছরভিত্তিক raw-material import quantity ও value
৪. UP/UD অনুযায়ী input-output coefficient
৫. actual production
৬. actual wastage
৭. year-end stock
৮. finished goods export quantity ও value
৯. Bond Audit Report
১০. audit objection, duty demand বা adjudication থাকলে তার বিবরণ।
এই তথ্যগুলো পাওয়া গেলে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসাব দাঁড় করানো সম্ভব হবে—
বন্ডে কত ঢুকেছে → উৎপাদনে কত গেছে → রপ্তানিতে কত বেরিয়েছে → অবশিষ্ট কত
সেখানেই হয়তো HKD-এর বন্ড ব্যবস্থাপনার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।
HKD-এর উৎপাদনক্ষমতা সম্পর্কে সরকারি নথিতে ১ কোটি ৮৮ লাখ পিসের তথ্য আছে। EPB-এর বর্তমান তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানটি একাধিক ধরনের garment পণ্য রপ্তানির জন্য নিবন্ধিত। আবার trade records-এ সাম্প্রতিক সময়েও garments ও অন্যান্য outdoor/metal-related পণ্যের export activity দেখা যাচ্ছে।
তাহলে প্রশ্নটা এখন আরও নির্দিষ্ট—
কর্ণফুলীর HKD-তে বছরে আসলে কত পণ্য তৈরি হচ্ছে? সেই উৎপাদনের জন্য বন্ড সুবিধায় কত কাঁচামাল ঢুকছে? আর সেই কাঁচামালের বিপরীতে কত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে?
হিসাবটি প্রকাশ্যে এলে বোঝা যাবে— বন্ড সুবিধা শুধু রপ্তানি বাড়াচ্ছে, নাকি এর ব্যবস্থাপনায় আরও কিছু প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
