আইফোন, ‘লাইফস্টাইল’ ও এক শিশুর হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে যত প্রশ্ন।

কুমিল্লার ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একদিকে উঠে আসছে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার বয়ান, অন্যদিকে ৫ হাজার টাকার কথিত বিরোধ, অপ্রতিমের সঙ্গে বয়সে বড়দের মেলামেশা, তথাকথিত ‘অসম বন্ধুত্ব’ এবং তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের মতো নানা প্রসঙ্গ।
কিন্তু FollowUpNews-এর কাছে এই আলোচনার মধ্যেই আরও একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দৃশ্যমান—একটি শিশু হত্যার শিকার হওয়ার পর এখন তার জীবনযাপন, বন্ধুত্ব, চলাফেরা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
এটা কি হত্যার তদন্তের অংশ, নাকি ধীরে ধীরে ভিকটিম ব্লেইমিংয়ের দিকে চলে যাচ্ছি?
অপ্রতিম কি কোনো অপরাধের আসামি ছিল?
না।
সে ছিল ১৩ বছরের একটি শিশু।
তার সঙ্গে কার বন্ধুত্ব ছিল, সে কার সঙ্গে কথা বলত, টিকটক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করত কিনা, বয়সে বড় কারও সঙ্গে তার পরিচয় ছিল কিনা—এসব তথ্য কোনোভাবেই তাকে হত্যার জন্য দায়ী করে না।
একটি শিশুর আচরণে ভুল থাকতে পারে। তার কোনো সিদ্ধান্ত অভিভাবকের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। সে এমন কারও সঙ্গে মিশতে পারে, যাকে পরিবার পছন্দ করে না। কিন্তু এসব কোনো কিছুই তাকে হত্যা করার কারণ হতে পারে না।
একটি শিশুর ‘ভুল’ থাকলেও তার হত্যার দায় শিশুটির নয়।
তদন্ত হোক—কিন্তু নিহত শিশুকে আসামি বানিয়ে নয়
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে পুলিশ যে বয়ান দিয়েছে, তা অনুযায়ী আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। পুলিশ জানিয়েছে, তুহিনের বাড়ি থেকে অপ্রতিমের মায়ের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। তিন আসামির আদালতীয় জবানবন্দিতেও আইফোনের কথা এসেছে।
এসব অবশ্যই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
কিন্তু এখানেই তদন্ত থেমে যাবে কেন?
অপ্রতিমকে কেন নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নেওয়া হয়েছিল?
তুহিনের সঙ্গে তার পূর্বপরিচয় কী?
৫ হাজার টাকার কথিত বিরোধের সঙ্গে হত্যার কোনো সম্পর্ক ছিল কি?
ঘটনার মাত্র কয়েকদিন আগে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে এক আসামির চাকরি নেওয়ার বিষয়টির কোনো গুরুত্ব আছে কি?
অপ্রতিমের মা যে অতীতের কিছু ঘটনার সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন, সেগুলো কি তদন্তকারীরা যাচাই করেছেন?
আনাসকে কেন আটক করা হয়েছিল এবং পরে কেন ছেড়ে দেওয়া হলো?
এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় অপ্রতিমের ‘লাইফস্টাইল’কে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়োজন কোথায়?
শিশুটি কেমন ছিল—এটা নয়, তাকে কেন হত্যা করা হলো—এটাই মূল প্রশ্ন
কোনো হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ভিকটিমের জীবনযাপন সম্পর্কে তথ্য কখনো প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কিন্তু সেই তথ্যের উদ্দেশ্য হতে হবে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও পরিস্থিতি বোঝা, নিহত ব্যক্তির ওপর নৈতিক দায় চাপানো নয়।
অপ্রতিমের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নয়। সে একজন শিশু।
তার সামাজিক যোগাযোগ, বন্ধুত্ব কিংবা ব্যক্তিগত আগ্রহ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে সেটি অভিভাবক, পরিবার, শিক্ষক বা শিশুসুরক্ষা ব্যবস্থার আলোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু হত্যার পর সেই বিষয়গুলো সামনে এনে যদি এমন একটি আবহ তৈরি হয় যে—‘সে এমন ছিল বলেই বিপদে পড়েছে’, তাহলে আমরা অজান্তেই হত্যাকারীর দায়কে ভুক্তভোগীর ওপর সরিয়ে দিচ্ছি।
এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সামাজিক ন্যারেটিভ।
একটি মেয়ে রাতে বাইরে ছিল বলে ধর্ষণের দায় তার নয়।
একজন মানুষ কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিল বলে তাকে হত্যা করার অধিকার কারও হয় না।
একটি শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেছিল বলে তাকে হত্যা করার দায় তার নয়।
অপ্রতিমের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য।
অপ্রতিম শিশু—তার আবার ‘ভুল-শুদ্ধ’ কী?
এই প্রশ্নটি হয়তো আরও সরাসরি করা দরকার।
আমরা যখন বলি, ‘শিশুটির লাইফস্টাইল কেমন ছিল’, তখন আমরা আসলে কী খুঁজছি?
তার হত্যার কারণ?
নাকি তার চরিত্রের ব্যাখ্যা?
এই দুটো এক জিনিস নয়।
অপ্রতিমের জীবনে যদি কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্ক থেকেও থাকে, তাহলে সেটি আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করে—কেন একজন ১৩ বছরের শিশুকে এমন ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা গেল না?
তার নিরাপত্তা কোথায় ছিল?
তার সঙ্গে কারা মিশত?
কারা তাকে প্রভাবিত করত?
কে তাকে কোথায় নিয়ে যেত?
কারা তার আস্থা অর্জন করেছিল?
এগুলো তদন্তের প্রশ্ন হতে পারে।
কিন্তু ‘সে এমন ছিল’—এমন একটি সামাজিক রায় দিয়ে শিশুটির ওপর দায় চাপানো কোনো তদন্ত নয়।
অপ্রতিমের মায়ের বক্তব্যও তাই গুরুত্বপূর্ণ
অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম তদন্তে কয়েকটি সম্ভাব্য দিক খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন। তিনি অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে হত্যার আগে এক আসামির চাকরি নেওয়া এবং তার নিজের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে কয়েকজন কিশোর অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এগুলো মায়ের বক্তব্য ও সন্দেহ—প্রমাণিত তথ্য নয়।
কিন্তু তদন্তের স্বার্থে এগুলো যাচাই করা যেতে পারে।
একইভাবে ৫ হাজার টাকার কথিত বিরোধ, অপ্রতিমের সঙ্গে বয়সে বড়দের যোগাযোগ এবং আইফোনের ঘটনাও যাচাই হওয়া দরকার।
কোনো সম্ভাবনাই শুধু অনুমান হিসেবে সত্য হয়ে যায় না। আবার কোনো সম্ভাবনাকে শুধু ‘অসম্ভব’ বলেও বাদ দেওয়া যায় না।
তদন্তের কাজ হলো প্রমাণ দিয়ে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা।
গ্রেপ্তাররাই কি হত্যাকারী—সেটিও তদন্তেই প্রমাণিত হবে
তুহিনসহ তিনজন গ্রেপ্তার হয়েছে এবং তাদের আদালতীয় জবানবন্দির কথা পুলিশ জানিয়েছে। তুহিনের বাড়ি থেকে অপ্রতিমের মায়ের আইফোন উদ্ধারের কথাও এসেছে।
এগুলো গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত-উপাদান।
তবে একটি মামলার প্রকৃত সত্য নির্ধারণে জবানবন্দির পাশাপাশি ফরেনসিক আলামত, ডিজিটাল প্রমাণ, সিসিটিভি, কল রেকর্ড, ঘটনাস্থলের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং অন্যান্য স্বাধীন প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ।
FollowUpNews কোনো গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে নির্দোষ ঘোষণা করছে না।
আবার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাদের ঘিরে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে—এমন দাবিও করছে না।
আমাদের প্রশ্ন একটাই:
যে শিশুটি আর নিজের পক্ষে কোনো কথা বলতে পারবে না, তার হয়ে তদন্ত কি যথেষ্ট গভীরভাবে করা হচ্ছে?
গণপতির পরিবারের মতো আরেকটি রহস্য?
FollowUpNews মনে করে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডকে এখনই কোনো নির্দিষ্ট ষড়যন্ত্র বা বিকল্প উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক হবে না।
তবে ঘটনাটিকে শুধু ‘আইফোন ছিনতাইয়ের জন্য হত্যা’ বলে শেষ করার আগে তদন্তের সব সম্ভাব্য দিক যাচাই করা প্রয়োজন।
গণপতি পরিবার হত্যাকাণ্ডের মতো রহস্যঘেরা কোনো ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যার সরাসরি মিল আছে—এমন প্রমাণ এখনো সামনে নেই।
তবে সাংবাদিকতার জায়গা থেকে প্রশ্নটি করা যায়:
দৃশ্যমান কারণের আড়ালে আর কোনো কারণ আছে কিনা, সেটি কি যথেষ্ট গভীরভাবে খোঁজা হয়েছে?
FollowUpNews-এর প্রশ্ন
অপ্রতিমের হত্যার তদন্তে তাই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে থাকা প্রয়োজন—
১. আইফোন কি হত্যাকাণ্ডের একমাত্র উদ্দেশ্য?
২. অপ্রতিমকে নির্জন এলাকায় নেওয়ার পরিকল্পনা কার ছিল?
৩. তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের পূর্বপরিচয়ের প্রকৃতি কী?
৪. ৫ হাজার টাকার কথিত বিরোধের কোনো ভূমিকা ছিল কি?
৫. অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে হত্যার আগে এক আসামির চাকরি নেওয়ার বিষয়টি কি তদন্তে যাচাই হয়েছে?
৬. অপ্রতিমের মা যে সম্ভাব্য যোগসূত্রগুলোর কথা বলেছেন, সেগুলো কীভাবে যাচাই করা হয়েছে?
৭. আনাসকে কেন আটক করা হয়েছিল এবং কেন ছেড়ে দেওয়া হলো?
৮. গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জবানবন্দির বাইরে হত্যার উদ্দেশ্যের স্বাধীন প্রমাণ কী?
৯. ঘটনাস্থল ও ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তে কী কী পাওয়া গেছে?
১০. এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তদন্তের কেন্দ্রে কি হত্যাকারী ও হত্যার উদ্দেশ্য আছে, নাকি ধীরে ধীরে নিহত শিশুটির জীবনযাপনই আলোচনার কেন্দ্রে চলে যাচ্ছে?
অপ্রতিমের কোনো ‘লাইফস্টাইল’ তার হত্যার দায় তৈরি করে না।
তার কোনো ভুল থাকলে সেটি তার পরিবারের সঙ্গে, তার শিক্ষক-অভিভাবকদের সঙ্গে কিংবা শিশুসুরক্ষা ব্যবস্থার আলোচনার বিষয় হতে পারে।
কিন্তু একজন শিশুকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই।
অপ্রতিমের চরিত্র বিশ্লেষণ নয়—তার হত্যার সত্য উদঘাটনই এখন সবচেয়ে জরুরি।
কারণ মৃত শিশুটি আর নিজের পক্ষে বলতে পারবে না—
সে কী দেখেছিল, কার ওপর বিশ্বাস করেছিল, কোথায় গিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কেন তাকে হত্যা করা হলো।
এই উত্তরগুলো এখন রাষ্ট্রের তদন্ত, পুলিশের পেশাদারিত্ব এবং সমাজের বিবেকের কাছেই।
