নিজস্ব প্রতিবেদক
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে সাম্প্রতিক সময়ে দফায় দফায় কর্মকর্তা বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত অন্তত একাধিক প্রশাসনিক আদেশে কর্মকর্তাদের কর্মস্থল পরিবর্তন হয়েছে। একই সময়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদেও পরিবর্তন এসেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে কারা দায়িত্ব পেলেন এবং যাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে, তাদের বর্তমান অবস্থান কী— তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন-৪ শাখার নথি অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখের এক আদেশে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের দুই উপপরিচালককে বদলি করা হয়।
সাম্প্রতিক বদলি-পদায়নের চিত্র
| তারিখ | কর্মকর্তা | আগের কর্মস্থল | নতুন কর্মস্থল/দায়িত্ব |
|---|---|---|---|
| ৩০ আগস্ট ২০২৬ | মোঃ সাহজাহান কবির, উপপরিচালক | আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া | ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টার (ডিআরসি), যশোর |
| ৩০ আগস্ট ২০২৬ | হালিমা খাতুন, উপপরিচালক | ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টার (ডিআরসি), যশোর | আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া |
| ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | মোঃ মাকসুদুর রহমান, উপপরিচালক | আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, ঢাকা পশ্চিম (মোহাম্মদপুর) | অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা—উপপরিচালক |
| ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | মেজর জেনারেল মোঃ আলীমুল আমীন | — | মহাপরিচালক, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর |
| ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | একাধিক কর্মকর্তা | বিভিন্ন কর্মস্থল | বদলি/পদায়ন—স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশ |
৩০ আগস্টের সরকারি আদেশে সাহজাহান কবির ও হালিমা খাতুনকে পরস্পরের কর্মস্থলে বদলি করা হয়। আদেশে ৩১ আগস্টের মধ্যে তাদের বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এরপর ২১ সেপ্টেম্বর পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদেও পরিবর্তন আসে। মেজর জেনারেল মো. নুরুল আনোয়ারকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তন করা হয় এবং মেজর জেনারেল মো. আলীমুল আমীনকে প্রেষণে নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে মাকসুদুর রহমান
সাম্প্রতিক বদলি-পদায়নের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মোঃ মাকসুদুর রহমানের পদায়ন। এর আগে তিনি ঢাকা পশ্চিম আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের (মোহাম্মদপুর) উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও তাকে ওই পদে দেখানো হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তাকে অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখার উপপরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসন শাখাটি অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, পদায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় পদটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
মাকসুদুর রহমানকে ঘিরে পুরোনো অভিযোগ
মাকসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, সম্পদের অসংগতিসহ নানা অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে মোহাম্মদপুর পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে দালালচক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং পাসপোর্ট তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। এসব অভিযোগ অবশ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে— এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০২৬ সালের এপ্রিলেও তাকে নিয়ে আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্য কোনো চূড়ান্ত তদন্ত-ফল বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে— যেসব অভিযোগ নিয়ে আগে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়ে থাকলে তার ফল কী এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই বা অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্য প্রকাশ না হওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে তাকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কী কী বিষয় বিবেচনা করেছে?
তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগকে অপরাধ বা দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি তদন্ত, দুদকের অনুসন্ধান, বিভাগীয় তদন্ত কিংবা আদালতের নথি প্রয়োজন।
টাঙ্গাইলের আবজাউল আলমও বদলির আলোচনায়
এর আগে টাঙ্গাইল আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মোঃ আবজাউল আলমকে নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়। একজন পাসপোর্ট আবেদনকারীর সঙ্গে আচরণসংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তার বিরুদ্ধে হয়রানি, ঘুষ ও দালালচক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের পর তাকে টাঙ্গাইল থেকে বদলি করা হয় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তালিকাতেও বর্তমানে আবজাউল আলমকে রাজবাড়ী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
বদলি কি কেবল রুটিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিতে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের একাধিক বদলি-পদায়নের আদেশ পাওয়া যাচ্ছে। ৩০ আগস্টের আদেশে দুই কর্মকর্তা এবং ২৩ সেপ্টেম্বরের আদেশে আরও কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়নের তথ্য সরকারি তালিকায় রয়েছে।
অন্যদিকে, অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের বদলি বা নতুন দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বদলি নিজেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কিনা— তা আদেশের ভাষা থেকে সবসময় বোঝা যায় না। একইভাবে কোনো কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে মানেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত— এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
তাই সাম্প্রতিক বদলির সঙ্গে পুরোনো অভিযোগগুলো মিলিয়ে দেখতে হলে প্রয়োজন হবে বদলি-পদায়নের সরকারি আদেশ, বিভাগীয় তদন্তের নথি, দুদকের অনুসন্ধান/তদন্তের তথ্য, সম্পদ বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মতো সরাসরি নাগরিকসেবা-নির্ভর প্রতিষ্ঠানে এসব নথি প্রকাশ্য হলে বদলি-পদায়নের প্রকৃত কারণ ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অবস্থাও পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
