নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
দেশের সবচেয়ে বড় রাজস্ব আহরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। আমদানি-নির্ভর এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ শুল্ক-কর আদায় করে সরকার। তবে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়লেও গত পাঁচ অর্থবছরের হিসাব বলছে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাঁচ বছরে আদায় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রতিটি বছরেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
পাঁচ বছরের লক্ষ্যমাত্রা ও আদায়
| অর্থবছর | লক্ষ্যমাত্রা | আদায় | ঘাটতি | অর্জনের হার |
|---|---|---|---|---|
| ২০২১-২২ | ৬৪,০৯৯.৯৭ কোটি | ৫৯,১৬০ কোটি | ৪,৯৩৯.৯৭ কোটি | ৯২.৩৩% |
| ২০২২-২৩ | ৭৪,২০৬ কোটি | ৬১,৪৬৪ কোটি | ১২,৭৪২ কোটি | ৮২.৮৩% |
| ২০২৩-২৪ | ৭৭,৬১৬ কোটি | ৬৮,৫৬২.৭২ কোটি | ৯,০৫৩.২৮ কোটি | ৮৮.৩৪% |
| ২০২৪-২৫ | ৮৩,৪৩২ কোটি | ৭২,৫০২.৪১ কোটি | ১০,৯২৯.৫৯ কোটি | ৮৬.৯০% |
| ২০২৫-২৬ | ১,০২,২৯৫ কোটি | ৮১,৪৭১.৩৭ কোটি | ২০,৮২৩.৬৩ কোটি | ৭৯.৬৪% |
২০২১-২২ অর্থবছরে এনবিআরের হিসাবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৪ হাজার ৯৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা এবং আহরণ হয় ৫৯ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।
পরের অর্থবছর ২০২২-২৩-এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয় ৬১ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা কম আদায় হয়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। সে বছর আদায় হয় ৬৮ হাজার ৫৬২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ৯ হাজার ৫৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৩ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বছরের শেষ ছয় মাসেই প্রতিষ্ঠানটি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে ছিল। বছর শেষে আদায় দাঁড়ায় ৭২ হাজার ৫০২ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৮২৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তবে আগের বছরের তুলনায় আদায় বেড়েছে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
লক্ষ্যমাত্রা বাড়লেও কমেছে অর্জনের হার
পাঁচ বছরের হিসাবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—রাজস্ব আদায় ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার একইভাবে বাড়েনি।
২০২১-২২ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ছিল ৯২ শতাংশের বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৮২ শতাংশের ঘরে। ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে আসে প্রায় ৮০ শতাংশে।
বিশেষ করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা প্রথমবারের মতো এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও প্রকৃত আদায় আট হাজার কোটি টাকার বেশি বৃদ্ধি পায়নি—আগের বছরের ৭২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা থেকে ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি টাকায় উঠেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, রাজস্ব আদায় মূলত আমদানি-নির্ভর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাম অয়েল, ডিজেল, ক্রুড অয়েল, তাজা ও শুকনো ফল, ক্যাপিটাল মেশিনারি ও খাদ্যপণ্য থেকে বেশি রাজস্ব এসেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বকেয়া রয়েছে। অর্থবছর শেষে বকেয়ার পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা।
এই পাঁচ বছরে নেতৃত্বে ছিলেন যারা
রাজস্বের এই পাঁচ বছরের সময়টিতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার পদেও পরিবর্তন এসেছে।
মোহাম্মদ ফখরুল আলম
২০২১-২২ অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার ছিলেন মোহাম্মদ ফখরুল আলম। ২০২২ সালের জুলাইয়ে তাঁকে চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে সরিয়ে ঢাকা শুল্ক, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক করা হয়। তার সময়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫৯ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয় বলে সে সময়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান
ফখরুল আলমের স্থলাভিষিক্ত হয়ে মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান ২০২২ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন।
তার দায়িত্বকালে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬১ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৮ হাজার ৫৬২ কোটি ৭২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টমসের ইতিহাসে তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বার্ষিক রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড তৈরি হয়েছিল।
মো. জাকির হোসেন
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে মো. জাকির হোসেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের নতুন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন।
তার সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৩ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। বছর শেষে আদায় হয় ৭২ হাজার ৫০২ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
মোহাম্মদ শফি উদ্দিন
২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাকির হোসেন সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর মোহাম্মদ শফি উদ্দিনকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন তিনি চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার ছিলেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বড় একটি সময় তার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস পরিচালিত হয়। ওই অর্থবছরে ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়।
মুহাঃ মাহবুবুর রহমান
২০২৬ সালের ৭ মে মুহাঃ মাহবুবুর রহমান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার হিসেবে যোগ দেন।
অর্থাৎ, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে বর্তমান সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের নেতৃত্ব তার হাতে।
রাজস্বের এই হিসাব কী বলছে?
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের পাঁচ বছরের হিসাব বলছে, রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ছে, কিন্তু লক্ষ্যমাত্রাও দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রকৃত আদায় বৃদ্ধির পাশাপাশি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হারও আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা আদায় নিঃসন্দেহে আগের বছরের তুলনায় বেশি। কিন্তু একই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। ফলে ওই বছর লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২০ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে।
এই ব্যবধানের কারণ খুঁজতে হলে শুধু কমিশনার পরিবর্তনের দিকে তাকালে হবে না। আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম, ডলারের বিনিময় হার, এলসি পরিস্থিতি, শুল্কহার, পণ্যের মূল্যায়ন, বন্ড সুবিধা, মামলা ও বকেয়া রাজস্ব—এসব বিষয়ও বছরভিত্তিক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের পাঁচ বছরের এই হিসাব তাই শুধু রাজস্ব আদায়ের গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, আদায় সক্ষমতা এবং বিশাল অঙ্কের বকেয়া রাজস্বের একটি চিত্রও তুলে ধরে।
