চট্টগ্রাম কাস্টমসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা আদায়, তবে লক্ষ্যমাত্রার ঘাটতি ২০ হাজার ৮২৪ কোটি।
নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের রাজস্ব আদায় আবারও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সবচেয়ে বড় রাজস্ব আদায়কারী এই কাস্টমস স্টেশন ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি। তবে ১ লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ২০ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা কম।
প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়— রাজস্ব বাড়ার পেছনে আমদানি পরিস্থিতি ঠিক কতটা ভূমিকা রেখেছে?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে শুল্কায়ন করে খালাস হওয়া আমদানি পণ্যের পরিমাণ প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে আমদানি পণ্য খালাস হয়েছিল ১০ কোটি ১৬ লাখ টন, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৭৫ লাখ টনে।
কিন্তু একই সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে দেখা গেছে উল্টো চিত্র।
এই আমদানি পণ্যের শুল্কায়িত মূল্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রায় ৭ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আমদানি পণ্যের পরিমাণ বাড়লেও শুল্কায়িত মূল্য কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।
অন্যদিকে, এসব আমদানি পণ্যের ওপর চট্টগ্রাম কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট কাস্টমস স্টেশনগুলোর মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৭৮ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে— প্রায় ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
তবে এই ৮৬ হাজার কোটি টাকা এবং চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের নিজস্ব ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা একই হিসাব নয়। প্রথমটি চট্টগ্রাম কাস্টমস, কমলাপুর কাস্টমস, পানগাঁও কাস্টমস ও চট্টগ্রাম ইপিজেড কাস্টমস স্টেশনের মাধ্যমে আদায়কৃত রাজস্বের সম্মিলিত হিসাব; আর ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের নিজস্ব রাজস্ব।
তিন সূচকের তিন ধরনের চিত্র
| সূচক | ২০২৪-২৫ | ২০২৫-২৬ | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে শুল্কায়ন করে খালাস হওয়া আমদানি পণ্য | ১০.১৬ কোটি টন | ১০.৭৫ কোটি টন | প্রায় ৬% বৃদ্ধি |
| এসব পণ্যের শুল্কায়িত মূল্য | ৭.৩১ লাখ কোটি টাকা | ৫.৮৫ লাখ কোটি টাকা | প্রায় ২০% কম |
| সংশ্লিষ্ট কাস্টমসগুলোর রাজস্ব | ৭৮,৩৯৭ কোটি টাকা | প্রায় ৮৬,০০০ কোটি টাকা | প্রায় ১০% বৃদ্ধি |
| চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের নিজস্ব রাজস্ব | ৭২,৫০২.৪১ কোটি টাকা | ৮১,৪৭১.৩৭ কোটি টাকা | ১২.৩৭% বৃদ্ধি |
এখানে ‘শুল্কায়িত মূল্য’ বলতে পণ্যের মূল্য ছাড়াও জাহাজভাড়া, বিমা ও ল্যান্ডিং চার্জসহ কাস্টমসের হিসাব করা মূল্য বোঝানো হয়েছে।
তাহলে রাজস্ব বাড়ল কীভাবে?
চট্টগ্রাম কাস্টমসের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজস্ব বৃদ্ধির পেছনে আমদানির ধারাবাহিকতা, কঠোর নজরদারি, উন্নত কাস্টমস প্রশাসন এবং শুল্ক ফাঁকি ও ভুল ঘোষণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ভূমিকা রেখেছে। কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ রাজস্ব প্রদানকারী পণ্যের মধ্যে হাই-স্পিড ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, পাম অয়েল, গাড়ি ও যন্ত্রাংশ, ব্যাটারি, ক্লিংকার, স্টিল, সিরামিক, ইলেকট্রনিক পণ্য, দুধের গুঁড়া, আপেল, স্ক্র্যাপ ও পাথর রয়েছে।
অর্থাৎ শুধু আমদানির মোট টনেজ দিয়ে রাজস্বের হিসাব ব্যাখ্যা করা যায় না। কোন ধরনের পণ্য কত পরিমাণে আমদানি হয়েছে, সেগুলোর ওপর কী হারে শুল্ক-কর প্রযোজ্য হয়েছে, কী মূল্যে শুল্কায়ন হয়েছে এবং ভুল ঘোষণা বা শুল্ক ফাঁকির বিরুদ্ধে কতটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে— এসব বিষয়ও রাজস্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এখানেই অনুসন্ধানের জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ।
আমদানি পণ্যের পরিমাণ প্রায় ৬ শতাংশ বাড়লেও শুল্কায়িত মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। এরপরও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের রাজস্ব ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়েছে।
এই ব্যবধানের পেছনে ঠিক কোন কোন পণ্যের আমদানি বেড়েছে, কোন পণ্যে শুল্ক-কর বেশি আদায় হয়েছে, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কী পরিবর্তন এসেছে এবং অনিয়ম বা ভুল ঘোষণার বিরুদ্ধে কত টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে— সেই হিসাবই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি
রাজস্ব প্রবৃদ্ধি থাকলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টমস তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। ১ লাখ ২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ঘাটতি ২০ হাজার ৮২৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছেও বিপুল পরিমাণ শুল্ক বকেয়া রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বকেয়ার পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে পেট্রোবাংলার কাছেই বকেয়া ২১ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে ৩ হাজার ৯২২ কোটি টাকা।
বন্দরের কার্যক্রমও বেড়েছে
আমদানি পণ্যের শুল্কায়িত মূল্যের পতনের বিপরীতে চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক অপারেশনাল সূচকেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দর ৩৫ লাখ ১৮ হাজার ৮৪১ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডল করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। একই সময়ে মোট কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়ে হয়েছে ১৩ কোটি ৭৭ লাখ ৪০ হাজার টন, যা ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি।
অর্থাৎ বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রম কমেনি; বরং বেড়েছে। কিন্তু শুল্কায়িত আমদানি মূল্যের পতন এবং কাস্টমস রাজস্বের প্রবৃদ্ধির মধ্যকার সম্পর্কটি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন— চট্টগ্রাম কাস্টমসের বাড়তি রাজস্ব কি মূলত আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধির ফল, নাকি পণ্যের ধরন, শুল্কহার, মূল্যায়ন, নজরদারি ও বকেয়া আদায়ের মতো বিষয়গুলো এতে বড় ভূমিকা রেখেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পণ্যভিত্তিক আমদানি, শুল্কায়ন ও রাজস্ব আদায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করাই হতে পারে পরবর্তী অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

পরবর্তী অনুসন্ধান যেখান থেকে শুরু
বকেয়া ও জরিমানায় বাড়তি রাজস্বের হিসাব মেলে না
চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব বৃদ্ধির ব্যাখ্যায় বকেয়া আদায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জরিমানার বিষয়টি সামনে এলেও পরিসংখ্যান বলছে, এতে বাড়তি রাজস্বের বড় অংশই ব্যাখ্যা হয় না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাস্টমস ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা বকেয়া আদায় করেছে। একই সময়ে ৫৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা জরিমানা এবং ৫২ কোটি ৮ লাখ টাকা ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই তিন খাত থেকে আদায় প্রায় ১ হাজার ১২৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। অথচ আগের অর্থবছরের তুলনায় চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব বেড়েছে প্রায় ৮ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ বকেয়া, জরিমানা ও ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব উদ্ধার— সবকিছু যোগ করেও বাড়তি রাজস্বের মাত্র ছোট্ট একটি অংশের হিসাব মেলে; প্রায় ৭ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্বের উৎস এখনো প্রশ্নের মুখে। বিশেষ করে যখন একই সময়ে আমদানি পণ্যের শুল্কায়িত মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে, তখন এই বিপুল রাজস্ব প্রবৃদ্ধির প্রকৃত উৎস কী— তা পণ্যভিত্তিক রাজস্ব ও শুল্কায়নের তথ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা জরুরি।
তাহলে এতদিন কি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে?
বকেয়া আদায়, জরিমানা ও ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব উদ্ধারের হিসাব দিয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের প্রায় ৮ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকার বাড়তি রাজস্বের ব্যাখ্যা মেলে না। বরং এই হিসাব নতুন একটি প্রশ্ন সামনে আনে—কাস্টমসের কঠোর নজরদারি ও উন্নত মূল্যায়নের কারণে যদি বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব এখন আদায় হয়ে থাকে, তাহলে এতদিন কি আমদানি পণ্যের একটি বড় অংশে যথাযথ শুল্ক-কর আদায় হয়নি? চট্টগ্রাম কাস্টমস নিজেই বলছে, কঠোর তদারকি, সঠিক মূল্যায়ন এবং অনিয়ম ঠেকানোর মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি রোধ করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, আগের বছরগুলোতে কি একই পণ্য বা একই ধরনের আমদানিতে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ ছিল? নাকি ২০২৫-২৬ সালে পণ্যভিত্তিক আমদানি, শুল্কায়ন ও আদায় ব্যবস্থায় এমন কোনো পরিবর্তন হয়েছে, যার কারণে হঠাৎ করে এত বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়েছে? এর উত্তর পেতে বছরভিত্তিক ও পণ্যভিত্তিক শুল্কায়ন এবং আদায়ের তথ্য প্রকাশ জরুরি।
