Headlines

মুকসুদপুরে নীলকণ্ঠ মণ্ডলের সিটি গোল্ড কারখানায় ভাঙচুর-লুটপাটের অভিযোগ

প্রায় ২৫ লাখ টাকার মালামাল লুটের দাবি, মামলায় ১০ আসামি; গ্রেপ্তার ৩ — পেছনে জমি নিয়ে বিরোধের অভিযোগও। নীলকন্ঠ মণ্ডলের স্ত্রী বলছেন, তারা হামলার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে।


গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বড় ভাটরা গ্রামে ‘নয়ন এন্টারপ্রাইজ’ নামে সিটি গোল্ডের একটি কারখানায় ঢুকে ভাঙচুর, মালামাল লুট এবং সেখানে থাকা নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগ উঠেছে। কারখানাটির মালিক ব্যবসায়ী নীলকণ্ঠ মণ্ডল। ঘটনায় তিনি মুকসুদপুর থানায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১২ সেপ্টেম্বর সকালে বড় ভাটরা এলাকায় হাসিনা বেগমসহ কয়েকজন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নীলকণ্ঠ মণ্ডলের মালিকানাধীন ও দখলীয় জমিতে প্রবেশ করেন। সেখানে থাকা সিটি গোল্ড তৈরির কারখানায় ঢুকে ভাঙচুর ও সেটি দখলের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরে কারখানায় থাকা সিটি গোল্ড তৈরির মেশিন, জেনারেটর, কাঁচামাল, কেমিক্যাল ও আসবাবপত্রসহ আনুমানিক ২৫ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন নীলকণ্ঠ মণ্ডল। একই ঘটনায় কারখানায় থাকা নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগও করা হয়েছে।

মামলায় ১০ জন, গ্রেপ্তার ৩

ঘটনার পর নীলকণ্ঠ মণ্ডল বাদী হয়ে মুকসুদপুর থানায় মামলা করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মুকসুদপুর থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মোবারক হোসেন জানিয়েছেন, এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আইনগত প্রক্রিয়ায় আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে পুলিশের বরাত দেওয়া প্রতিবেদনে গ্রেপ্তার তিনজনের নাম প্রকাশ করা হয়নি।

মামলা তুলে নিতে হুমকির অভিযোগ

মামলার তিন আসামি গ্রেপ্তারের পর নতুন করে হুমকির অভিযোগও করেছেন নীলকণ্ঠ মণ্ডল।

তার অভিযোগ, নাসির নামে এক ব্যক্তি তার বাড়িতে গিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দিয়েছেন। তবে এই হুমকির অভিযোগের বিষয়ে নাসিরের বক্তব্য কিংবা পুলিশের পৃথক কোনো বক্তব্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পেছনে কি জমি নিয়ে বিরোধ?

কারখানায় হামলার অভিযোগের কয়েক দিন পর একই বড়ভাটরা এলাকায় নীলকণ্ঠ মণ্ডলকে ঘিরে জমি নিয়ে পাল্টা অভিযোগ সামনে এসেছে।

১৭ সেপ্টেম্বরের একটি ঘটনার বিষয়ে লাবনী আক্তার ও তার পরিবার অভিযোগ করেছে, ৩৪ শতাংশ জমির মালিকানা, নামজারি ও বিক্রির উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তাদের বাড়িতে হামলা করা হয়েছে। তাদের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকজন ব্যক্তি লোহার রড, রামদা, বাঁশের লাঠি ও ইট নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে লাবনী আক্তার ও তার স্বামী নাসির উদ্দিন শেখকে মারধর করেন। লাবনীর পরনের কাপড় টানাহেঁচড়া, স্বর্ণের চেইন নিয়ে যাওয়া এবং পিস্তল প্রদর্শনের অভিযোগও করা হয়েছে।

ওই পরিবারের দাবি, বড়ভাটরা মৌজার ৩৪ শতাংশ জমিটি তাদের দাদা বাহের শেখের নামে একসনা বন্দোবস্তের আওতায় ছিল। তাদের আবেদনে জমিটির পুরোনো খতিয়ান নম্বর ৫৪, বর্তমান খতিয়ান ২৯৭, পুরোনো দাগ ১০৪৪ এবং বর্তমান বিআরএস দাগ ১২৪৯ উল্লেখ করা হয়েছে।

তাদের আরও অভিযোগ, নীলকণ্ঠ মণ্ডল ও তার ভাই জাল কাগজপত্র তৈরি করে ওই জমি নিজেদের নামে নামজারি করেছেন এবং পরে জামাল হোসেন বেপারী ও সাবিনা বেগমের কাছে বিক্রি করেছেন। এরপর নতুন ক্রেতাদের মাধ্যমে তাদের ওপর হামলা-মামলা করে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে পরিবারটি। এ বিষয়ে তারা মুকসুদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছে।

তবে জমিটির প্রকৃত মালিকানা, একসনা বন্দোবস্তের বৈধতা, নামজারি, বিক্রয় এবং দখলের বিষয়গুলো এখনো সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে জমি নিয়ে পাল্টা অভিযোগের সঙ্গে ১২ সেপ্টেম্বরের কারখানা ভাঙচুরের ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক আছে কিনা, সেটিও তদন্তসাপেক্ষ।

সাম্প্রদায়িক হামলা নাকি জমি-ব্যবসার বিরোধ?

ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি হিন্দু ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে হামলা হিসেবে আলোচনা হতে পারে। তবে বর্তমানে পাওয়া প্রকাশিত পুলিশি বক্তব্য ও সংবাদ প্রতিবেদনে হামলার উদ্দেশ্য সাম্প্রদায়িক ছিল—এমন কোনো পুলিশি বা তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নীলকণ্ঠ মণ্ডল হিন্দু সম্প্রদায়ের হওয়া এবং হামলাকারীদের উদ্দেশ্য সাম্প্রদায়িক ছিল—এই দুটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ একই এলাকায় জমির মালিকানা, নামজারি ও দখল নিয়ে পৃথক বিরোধের অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে।

ফলে ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র জানতে হলে কারখানার জমির দলিল ও খতিয়ান, নামজারি নথি, মামলা ও এজাহার, লুট হওয়া মালামালের তালিকা, কারখানার মালিকানা এবং দুই পক্ষের বক্তব্য—সবকিছু একসঙ্গে যাচাই করা জরুরি।

পুলিশের বক্তব্য

মুকসুদপুর থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোবারক হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানা ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

তবে কারখানার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, উদ্ধার হওয়া মালামাল, মামলার এজাহারে প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ এবং জমি-সংক্রান্ত পাল্টা অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য এখনো প্রকাশিত সূত্রে পাওয়া যায়নি।

FollowUpNews এখন অনুসন্ধান করবে— ২৫ লাখ টাকার লুটের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, কারখানাটি যে জমিতে স্থাপিত সেটির বৈধ মালিকানা কার, এবং ১২ সেপ্টেম্বরের হামলা ও ১৭ সেপ্টেম্বরের জমি-সংক্রান্ত ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা।

ঘটনাটির পূর্ণ সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও সরকারি নথি যাচাই প্রয়োজন।