Headlines

৮৭ টাকার মাল্টা ৫২০ টাকা: করের পর ১৯৩, এরপর কোথায় বাড়ে আরও ৩২৭ টাকা?

আমদানি মূল্য থেকে খুচরা বাজার— মাল্টার দামের পুরো হিসাব কোথায় আটকে আছে?

FollowUpNews অনুসন্ধান

বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আমদানি হচ্ছে যে মাল্টা, তার প্রতি কেজির গড় আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা। কিন্তু চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে সেই মাল্টাই বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ ৮৭ টাকার পণ্য ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ছয় গুণ। অর্থাৎ ধনী দেশের মানুষ যে জিনিস খাচ্ছে ৬০/৭০ টাকা কেজিতে, আমরা খাচ্ছি ৫০০ টাকা কেজিতে!

একই সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান কাস্টমস ট্যারিফের তথ্যও দেখাচ্ছে, তাজা কমলা, মাল্টা ও সংশ্লিষ্ট সাইট্রাস ফল আমদানিতে মোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বাংলাদেশ কাস্টমসের বর্তমান ডিউটি ক্যালকুলেটরেও কমলা ও ম্যান্ডারিনজাতীয় ফলের জন্য একই মোট করভার দেখা যাচ্ছে।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—

৮৭ টাকার মাল্টা বন্দরে কর-শুল্ক পরিশোধের পর প্রায় ১৯৩ টাকা হলে, সেখান থেকে খুচরা বাজারে ৫২০ টাকা হওয়ার পথে আরও প্রায় ৩২৭ টাকা কোথায় যোগ হচ্ছে?

FollowUpNews-এর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মাল্টার উচ্চ খুচরা দামের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। করভার, মুদ্রার বিনিময়মূল্য, আমদানি ও বন্দর ব্যয়, পচন/ক্ষতি, পরিবহন, সরবরাহের ঘাটতি, পাইকারি বাজার এবং খুচরা পর্যায়ের মূল্যবৃদ্ধি— সবগুলো স্তর একসঙ্গে কাজ করছে।কমলা, ম্যান্ডারিন, মাল্টাসহ সংশ্লিষ্ট তাজা ফলের ওপর মোট Tax Incidence ১২১.৭৮ শতাংশ।

এই হারটি সরাসরি ২৫+২০+৩০+১৫+৫ যোগ করে পাওয়া যায় না। কারণ আমদানি পর্যায়ে বিভিন্ন করের ভিত্তিমূল্য আলাদাভাবে নির্ধারিত হয় এবং পরবর্তী করের ভিত্তিতে আগের কিছু শুল্ক যোগ হয়। এনবিআরের ব্যাখ্যাতেও আমদানি পর্যায়ে VAT ও supplementary duty নির্ধারণে এ ধরনের ধাপভিত্তিক হিসাবের কথা বলা হয়েছে।

বর্তমান কাঠামোটি মোটামুটি এমন—

কর/শুল্ক হার
Customs Duty (CD) ২৫%
Regulatory Duty (RD) ২০%
Supplementary Duty (SD) ৩০%
VAT ১৫%
Advance Income Tax (AIT) ৫%
মোট কার্যকর করভার (TTI) ১২১.৭৮%

বাংলাদেশ কাস্টমসের ২০২৫–২৬ ট্যারিফ ডকুমেন্টেও এই কাঠামোর জন্য ১২১.৭৮ শতাংশ TTI দেখানো হয়েছে।

৮৭ টাকার মাল্টায় হিসাব করলে

যদি প্রতি কেজি মাল্টার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৮৭ টাকা ধরা হয়, তাহলে—

৮৭ × ১২১.৭৮% = প্রায় ১০৬ টাকা

অর্থাৎ—

পর্যায় টাকা/কেজি
আমদানি মূল্য ৮৭
আমদানি পর্যায়ের শুল্ক-কর ≈১০৬
শুল্ক-করসহ মূল্য ≈১৯৩

অর্থাৎ বন্দরে খালাসের সময়ই ৮৭ টাকার মাল্টার মূল্য প্রায় ১৯৩ টাকা হয়ে যায়।

এখানে সরকারের করের অংশই মূল আমদানি মূল্যের চেয়ে বেশি।

কিন্তু ১৯৩ টাকা থেকে ৫২০ টাকা কেন?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

৮৭ টাকা থেকে ১৯৩ টাকা হওয়ার হিসাবটি কাস্টমস কাঠামো দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু ১৯৩ টাকা থেকে ৫২০ টাকা হওয়ার পুরো হিসাব কেবল কর দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্দরের পর গুদাম, কনটেইনার, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় যোগ হয়। আমদানিকারকদের বক্তব্য অনুযায়ী, পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে পণ্য নষ্ট হওয়া, বন্দর ও কনটেইনার-সংক্রান্ত ব্যয়সহ প্রকৃত ব্যয় কেজিতে ২৩০–২৪০ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে।

অর্থাৎ একটি সম্ভাব্য চিত্র দাঁড়ায়—

স্তর আনুমানিক মূল্য
আমদানি মূল্য ৮৭ টাকা
শুল্ক-করসহ ≈১৯৩ টাকা
পরিবহন/বন্দর/কনটেইনার/অন্যান্য ব্যয় +১০–১৫ টাকা বা বেশি
পচন, ক্ষতি ও অন্যান্য প্রকৃত ব্যয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে মোট ≈২৩০–২৪০ টাকা
খুচরা বাজার ৪৮০–৫২০ টাকা
খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত ব্যবধান ≈২৪০–২৯০ টাকা

তবে মাত্রাতিরিক্ত এই ব্যবধানকে সরাসরি “মুনাফা” বলা যাবে না।

কারণ এর মধ্যে থাকতে পারে—

  • পাইকারি পরিবহন
  • গুদাম ভাড়া
  • শ্রমিকের মজুরি
  • পচন ও ওজনজনিত ক্ষতি
  • ব্যাংক ঋণের সুদ
  • ব্যবসায়িক মূলধনের খরচ
  • বাজারের আড়ত খরচ
  • খুচরা দোকানের ভাড়া ও শ্রম
  • বিদ্যুৎ ও সংরক্ষণ ব্যয়
  • বিক্রয় না হওয়া ফলের ক্ষতি
  • পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার মার্জিন

কিন্তু একই সঙ্গে এই পুরো ব্যবধানের স্বচ্ছ হিসাবও জনসমক্ষে নেই।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা দেখা যায়।

প্রকাশিত NBR-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছরে দেশে মাল্টা আমদানি হয়েছিল প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার ৯৭৯ টন। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৫ টনে নেমে আসে।

অর্থাৎ তিন অর্থবছরের ব্যবধানে আমদানি কমেছে প্রায় ৪৩ শতাংশ।

একই সময়ে আপেল, আঙুর ও অন্যান্য আমদানি করা ফলের ক্ষেত্রেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী—

ফল ২০২১–২২ ২০২৪–২৫ পরিবর্তন
মাল্টা ২,৯৪,৯৭৯ টন ১,৬৮,৮২৫ টন ↓ প্রায় ৪৩%
আপেল ২,৫৮,৩৪৩ টন ১,৬১,৮৬৩ টন ↓ প্রায় ৩৭%
আঙুর ১,৩৭,৯৮২ টন ৮৯,৫৪১ টন ↓ প্রায় ৩৫%
নাশপাতি ৯,৯৫৯ টন ৭,৪৯৯ টন ↓ প্রায় ২৫%

এটি অবশ্য এককভাবে করের কারণে হয়েছে— এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না।

কারণ একই সময়ে ডলারের বিনিময়মূল্য, মূল্যস্ফীতি, আমদানি অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক বাজারদর এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাতেও পরিবর্তন হয়েছে।

তবে করভার বৃদ্ধির সঙ্গে আমদানি কমার সময়গত সম্পর্কটি অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

ফলের আমদানি শুল্ক-কর কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

প্রকাশিত NBR-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছরে আমদানি করা তাজা ফলের মোট করভার ছিল প্রায় ৮৯.৩২ শতাংশ। ২০২২–২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ১১৩.৮০ শতাংশ হয়।

২০২৪–২৫ অর্থবছরের এক পর্যায়ে তা ১৩৬.২০ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরে কাঠামোর কিছু পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট অনেক তাজা ফলের TTI ১২১.৭৮ শতাংশ।

২০২৫ সালের মার্চে NBR আমদানি করা তাজা ফলের Advance Income Tax ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করেছিল। এর আগে BTTC আমদানি করা ফলের ওপর কর কমানোর সুপারিশও করেছিল।

অর্থাৎ সরকারও বিভিন্ন সময়ে ফলের উচ্চ মূল্য এবং আমদানি কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কর কাঠামোয় পরিবর্তন করেছে।

১০০ টাকার ফল কেন ২২১ টাকা হয়ে যায়?

বর্তমান ১২১.৭৮ শতাংশ TTI-এর অর্থ হলো, শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১০০ টাকা হলে আমদানি পর্যায়ে মোট করভার প্রায় ১২১.৭৮ টাকা।

অর্থাৎ—

১০০ টাকা + ১২১.৭৮ টাকা = প্রায় ২২১.৭৮ টাকা।

এর সঙ্গে তখনও যুক্ত হয়নি—

  • জাহাজ/কনটেইনার ব্যয়
  • বন্দর মাশুল
  • খালাস
  • পরিবহন
  • গুদাম
  • পচন
  • ব্যবসায়িক অর্থায়ন
  • পাইকারি ও খুচরা ব্যয়

তাই করভার যে আমদানি মূল্যকে দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তবে এখানেও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ— ১২১.৭৮ শতাংশকে সরল যোগফল হিসেবে দেখা যাবে না। এনবিআরের নিয়ম অনুযায়ী কিছু কর আগের কর যুক্ত মূল্যকে ভিত্তি

৮৭ টাকা শুল্কাবে—

সরকারি শুল্ক-কর ≈১০৬ টাকা।

অর্থাৎ ৫২০ টাকা খুচরা দামের মধ্যে আমদানি মূল্যের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করলে—

  • আমদানি মূল্য: ৮৭ টাকা
  • আমদানি পর্যায়ের কর: ≈১০৬ টাকা
  • কর-পরবর্তী প্রাথমিক মূল্য: ≈১৯৩ টাকা
  • খুচরা মূল্য: ৫২০ টাকা

অর্থাৎ ৮৭ থেকে ৫২০ = ৪৩৩ টাকা বৃদ্ধি।

এর মধ্যে প্রায় ১০৬ টাকা আমদানি পর্যায়ের শুল্ক-কর হিসেবে যায়।

বাকি প্রায় ৩২৭ টাকা ১৯৩ টাকা থেকে ৫২০ টাকায় যাওয়ার পথে বিভিন্ন খরচ, ক্ষতি, পাইকারি ও খুচরা মার্জিনের মধ্যে পড়ে।

এখানে মূল প্রশ্ন:

এই ৩২৭ টাকার মধ্যে প্রকৃত ব্যয় কত এবং ব্যবসায়িক মার্জিন কত— তার কোনো স্বচ্ছ বাজারভিত্তিক হিসাব কি সরকারি কোনো 

মাল্টা পচনশীল পণ্ সময়ের মধ্যে পণ্য বাজারজাত করতে হয়। কোল্ড স্টোরেজে রাখতে হয়।

সরবরাহ কমে গেলে দুটি বিষয় একসঙ্গে ঘটে।

প্রথমত, একই পরিমাণ চাহিদার বিপরীতে বাজারে ফল কম থাকে।

দ্বিতীয়ত, আমদানিকারক ও পাইকাররা বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করতে পারেন।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত অনেকে লোকসান করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আমদানি কমে যায়। সেপ্টেম্বরে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম দ্রুত বাড়ে।

এটি বাজারের স্বাভাবিক supply-demand mechanism দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন থাকে—

সরবরাহ কমেছে কত শতাংশ, আর খুচরা দাম বেড়েছে কত শতাংশ?

এই দুটি তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করা হলে বোঝা যেত দাম বৃদ্ধির কতটা বাস্তব সরবরাহ সংকট এবং কতটা বাজারের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার ফল।

ডেঙ্গুর সময় ফলের চাহিদা: আরেকটি চাপ

এবারের পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭৭,৬৭২ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২৩৯ দেখানো হয়েছে। শুধু সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেই ৬,১৩৬ আক্রান্ত ও ২০ মৃত্যুর তথ্য ড্যাশবোর্ডে ছিল।

ডেঙ্গু রোগীদের খাবারের তালিকায় ফল নিয়ে পরিবারগুলোর চাহিদা বাড়তে পারে। ফলে একই সময়ে যদি আমদানি কম থাকে, বাজারে চাহিদা-সরবরাহের ব্যবধান আরও বড় হতে পারে।

তবে ডেঙ্গুর কারণে মাল্টার বর্তমান দাম কতটা বেড়েছে— এটি প্রমাণ করার জন্য আলাদা বাজার-চাহিদার তথ্য প্রয়োজন।

শুধু ডেঙ্গু বেড়েছে বলেই মাল্টার দাম বেড়েছে— এমন সরল সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।

২০২৫ সালে কর কমানোর উদ্যোগও হয়েছিল

ফলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে শুধু ব্যবসায়ীরাই কথা বলেননি। ২০২৫ সালের মার্চে NBR আমদানি করা তাজা ফলের Advance Income Tax ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করেছিল।

এর আগে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও ফলের আমদানি শুল্ক ও কর কমানোর সুপারিশ করেছিল।

অর্থাৎ নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও প্রশ্নটি ছিল—

উচ্চ কর আদায় বনাম ভোক্তার জন্য ফলের মূল্য— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়?

উচ্চ কর থেকে সরকার কত রাজস্ব পায়?

এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনুপস্থিত।

শুধু করের হার বেশি হলেই সরকারের রাজস্ব বেশি হবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।

কারণ—

করহার ↑ → আমদানি ↓ → বাজারে সরবরাহ ↓ → ভোক্তার দাম ↑ → ভোগ ↓

এমন একটি সম্ভাব্য চক্র তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে—

করহার ↓ → বৈধ আমদানি ↑ → সরবরাহ ↑ → বাজারদর ↓ → ভোগ ↑ → আমদানি-ভিত্তিক করের পরিমাণও বাড়তে পারে।

কোন মডেলে সরকারের প্রকৃত রাজস্ব বেশি হয়, সেটি জানতে প্রয়োজন করহার বনাম আমদানি পরিমাণ বনাম মোট রাজস্বের দীর্ঘমেয়াদি ডেটা।

অনুসন্ধানে এই জায়গাটিই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

না— এমন দাবি করার মতো তথ্য নেই।

কারণ ৮৭ টাকা আমদানি মূল্য থেকে ১৯৩ টাকা হওয়ার পরও বন্দরের বাইরে পরিবহন, গুদাম, পচন, অর্থায়ন, পাইকারি ও খুচরা ব্যয় থাকে।

এমনকি ২০২৫ সালে ফল ব্যবসায়ীদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ১০০ টাকার ফলের ওপর ১৩৬ টাকার বেশি কর-শুল্ক দেওয়ার পর পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ হয়ে পাইকারি পর্যায়ে দাম প্রায় ২৫০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

তাই কর কমানো দাম কমানোর একটি উপাদান, কিন্তু একমাত্র উপাদান নয়।

আসল অনুসন্ধান: ১৯৩ টাকা থেকে ৫২০ টাকা

মাল্টার বর্তমান বাজারদর বিশ্লেষণ করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি হলো এই অংশটি।

একটি সম্ভাব্য মূল্যশৃঙ্খল

৮৭ টাকা
↓
শুল্ক-কর ≈১০৬ টাকা
↓
১৯৩ টাকা
↓
বন্দর + কনটেইনার + পরিবহন + গুদাম
↓
পচন/ক্ষতি
↓
আমদানিকারকের মার্জিন
↓
পাইকারি মার্জিন
↓
পরিবহন ও বাজার খরচ
↓
খুচরা বিক্রেতার মার্জিন
↓
৪৮০–৫২০ টাকা

এখানে সবচেয়ে বড় অস্বচ্ছতা হচ্ছে মাঝের স্তরগুলোতে।

১. আমদানিকারকের প্রকৃত landed cost কত?

প্রতি কেজি মাল্টার—

  • CIF মূল্য
  • Customs assessable value
  • Duty
  • Port charge
  • Container charge
  • C&F charge
  • Transport
  • Warehouse
  • Wastage

আলাদাভাবে জানা দরকার।

২. কত শতাংশ মাল্টা নষ্ট হয়?

পচনশীল ফলের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি ১০০ কেজি মাল্টার মধ্যে ২–৫ কেজি নষ্ট হয়, তাহলে বিক্রিত ৯০–৯৫ কেজির ওপর সেই ক্ষতির খরচও পড়বে।

৩. আমদানিকারক থেকে পাইকারি বাজারে বিক্রয়মূল্য কত?

একই চালানের ক্ষেত্রে—

Importer invoice → wholesale invoice → retail purchase invoice

তুলনা করা প্রয়োজন।

৪. পাইকারি থেকে খুচরায় প্রতি কেজিতে কত মার্জিন?

এটি বাজারভেদে কতটা পরিবর্তিত হয়, তা দেখতে হবে।

৫. চট্টগ্রাম ও ঢাকার দামের পার্থক্য কত?

চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি থাকার কারণে পরিবহন খরচ ঢাকার তুলনায় কম হওয়ার কথা।

তবু যদি চট্টগ্রাম ও ঢাকার খুচরা দামে অস্বাভাবিক পার্থক্য থাকে, তার কারণ অনুসন্ধান করা দরকার।

৬. আমদানি কমেছে, নাকি শুধু বৈধ আমদানি কমেছে?

উচ্চ করের ফলে বৈধ আমদানি কমে গেলে বাজারে অন্য উৎস, সীমান্তপথ বা অনিবন্ধিত সরবরাহ ঢুকছে কি না— সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

৭. সরকার প্রতি কেজি মাল্টা থেকে কত রাজস্ব পাচ্ছে?

একটি চালানের জন্য নয়— পুরো অর্থবছরে:

মাল্টা আমদানি × গড় assessable value × TTI = সম্ভাব্য আমদানি পর্যায়ের রাজস্ব

এবং তা আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যাবে উচ্চ করের নীতিটি সরকারের রাজস্বের দিক থেকে কী ফল দিয়েছে।

১. ১২১.৭৮ শতাংশ করভার নির্ধারণের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা কী?

২. ফলকে কি এখনো বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে?

৩. উচ্চ করের কারণে আমদানি কমে গেলে সরকারের মোট রাজস্ব কমছে কিনা— এর কোনো impact assessment করা হয়েছে?

৪. ফল আমদানির ক্ষেত্রে পচনশীলতার কারণে কোনো বিশেষ শুল্ক সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি?

৫. আমদানিকারক থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্য ব্যবধান পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো সরকারি database আছে কি?

৬. একই আমদানিকারকের পণ্য কোন দামে পাইকারের কাছে বিক্রি হচ্ছে এবং পাইকার কোন দামে খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করছে— এ তথ্য কি নিয়মিত সংগ্রহ করা হয়?

৭. খুচরা পর্যায়ে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হলে তা নির্ধারণের কোনো কার্যকর benchmark আছে কি?

৮৭ টাকার মাল্টা ৫২০ টাকা হওয়া শুধু একজন ব্যবসায়ীর মুনাফার গল্প নয়।

এখানে আছে উচ্চ আমদানি কর, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্য, বন্দর ও পরিবহন ব্যয়, পচনশীল পণ্যের ঝুঁকি, সরবরাহের ওঠানামা, পাইকারি বাজার এবং খুচরা বাজার— সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘ মূল্যশৃঙ্খল।

তবে সরকারি তথ্য বলছে, আমদানি পর্যায়ের করভার একাই খুব বড় একটি মূল্য সংযোজন ঘটাচ্ছে।

৮৭ টাকার মাল্টায় প্রায় ১০৬ টাকা কর যোগ হয়ে প্রাথমিক মূল্য প্রায় ১৯৩ টাকা হওয়ার হিসাব কাস্টমসের বর্তমান ১২১.৭৮ শতাংশ TTI-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কিন্তু এরপর ১৯৩ টাকা থেকে ৫২০ টাকা হওয়ার অবশিষ্ট প্রায় ৩২৭ টাকার স্বচ্ছ হিসাব কোথায়?

এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে বোঝা যাবে—

মাল্টার দাম শুধু করের কারণে বেশি, নাকি করের পরবর্তী বাজারব্যবস্থাতেও বড় ধরনের মূল্য সংযোজন হচ্ছে।

আর সেই হিসাবই হতে পারে বাংলাদেশের আমদানি করা ফলের বাজার নিয়ে পরবর্তী বড় অনুসন্ধানের ভিত্তি।

FollowUpNews-এর অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন

“৮৭ টাকার মাল্টা ৫২০ টাকা হওয়ার পথে ১০৬ টাকা সরকারের কর— কিন্তু বাকি প্রায় ৩২৭ টাকা কার কার পকেটে, কোন কোন খাতে এবং কত করে যাচ্ছে?”