কর্ণফুলী EPZ-এর রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান জিং চ্যাং সুজ (বিডি) লিমিটেডকে ঘিরে বড় অঙ্কের শুল্ককর ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। কাস্টমসের তদন্তে দুই বছরে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের হিসাব না মেলার কথা উঠে এসেছে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (EPZ) জিং চ্যাং সুজ (বিডি) লিমিটেড জুতা উৎপাদনের জন্য বন্ড সুবিধায় লেদার, সোল, এক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং সামগ্রীসহ বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করেছে। কাস্টমসের তদন্তে এর মধ্যে ৬ হাজার ৭১ মেট্রিক টন কাঁচামালের হিসাব পাওয়া যায়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাস্টমসের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এসব কাঁচামালের বিপরীতে প্রায় ৩৪১ কোটি ১৮ লাখ টাকা শুল্ককর ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। একই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ওপর প্রায় ৩৪২ কোটি টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। ফলে শুল্ককর ও জরিমানার অঙ্ক মিলিয়ে বিষয়টি প্রায় ৬৮৩ কোটি টাকার।
দুই বছরে আমদানি ৮ হাজার ২৬৩ টন
প্রকাশিত তদন্তসংক্রান্ত তথ্যে বলা হয়েছে, জিং চ্যাং সুজ দুই বছরে প্রায় ৮ হাজার ২৬৩ মেট্রিক টন কাঁচামাল আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৭১ মেট্রিক টনের হিসাব কাস্টমসের কাছে মেলেনি।
অর্থাৎ আমদানি করা কাঁচামালের বড় একটি অংশের ব্যবহার, মজুত অথবা রপ্তানি পণ্যে ব্যবহারের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কাস্টমসের তদন্তে এগুলো খোলাবাজারে বিক্রি করার অভিযোগও উঠে এসেছে।
তদন্ত কী বলছে?
কাস্টমসের নিরীক্ষার অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। বন্ডেড ওয়্যারহাউজে থাকা কাঁচামাল ও ফিনিশড পণ্যের ইনভেন্টরি করা হয়। পরে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত কাগজপত্র, হিসাব ও সরেজমিন তথ্য যাচাই করা হয়।
তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে কাঁচামালের ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২২ সালে আমদানি প্রায় ১৩ হাজার টন
তদন্তসংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্যে আরও বলা হয়েছে, শুধু ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ ৪৮ হাজার কেজি— অর্থাৎ প্রায় ১২ হাজার ৯৪৮ মেট্রিক টন— চামড়া, সোল, এক্সেসরিজ, প্যাকেজিং সামগ্রী, ফুটওয়্যার স্যাম্পল ও মেশিনারি আমদানি করে।
এসব পণ্যের ঘোষিত মূল্য ছিল প্রায় ১১ কোটি ৫৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ মার্কিন ডলার।
প্রতিষ্ঠানের দাবি কী?
অভিযোগের বিপরীতে জিং চ্যাং সুজ কর্তৃপক্ষ শুল্ককর ফাঁকি ও কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক কাজি সাদাত ওমর এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়ে জরিমানার আদেশ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— কাস্টমস যে ৬,০৭১ মেট্রিক টন কাঁচামালের হিসাব পায়নি বলে দাবি করছে, সেই হিসাব কীভাবে করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি কোন নথির ভিত্তিতে ওই হিসাবের বিরোধিতা করছে?
FollowUpNews-এর অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন
৬,০৭১ মেট্রিক টন কাঁচামাল কোথায় গেল?
এ প্রশ্নের উত্তর বের করতে প্রয়োজন—
- আমদানির Bill of Entry
- Bond licence ও entitlement
- Utilization Declaration (UD)
- কাঁচামাল ও ফিনিশড পণ্যের stock register
- সংশ্লিষ্ট সময়ের export documents
- কাস্টমসের audit report
- তদন্ত কমিটির investigation report
- adjudication order
- প্রতিষ্ঠানের লিখিত আপত্তি/আপিল
- কাস্টমসের চূড়ান্ত অবস্থান
এই নথিগুলো পাশাপাশি বসানো গেলে বোঝা যাবে, ৩৪১ কোটি টাকার দাবিটি কীভাবে হিসাব করা হয়েছে, ৬,০৭১ টন কাঁচামালের ঘাটতির হিসাব কীভাবে এসেছে এবং প্রতিষ্ঠানটির আপত্তির ভিত্তি কতটা নথিনির্ভর।
কর্ণফুলী EPZ-এর অস্তিত্বই রপ্তানিমুখী শিল্পকে বন্ড সুবিধাসহ বিভিন্ন সুযোগ দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত। BEPZA-এর তথ্য অনুযায়ী কর্ণফুলী EPZ-এর নিজস্ব জোন অফিস রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকির জন্য BEPZA কাঠামো বিদ্যমান।
FollowUpNews-এর পরবর্তী অনুসন্ধানের বিষয় তাই শুধু “ফাঁকি হয়েছে কিনা” নয়— বরং ৬,০৭১ টন কাঁচামালের হিসাব, ৩৪১.১৮ কোটি টাকার শুল্ককর দাবি এবং ৩৪২ কোটি টাকার জরিমানার পেছনে থাকা প্রতিটি নথি যাচাই করা।
