চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কার্ল ডাইসেরথের (Karl Deisseroth) আবিষ্কার ‘অপটোজেনেটিক্স’ (Optogenetics) মস্তিষ্কের জটিল রোগগুলোর চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। অটিজম এবং সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল মানসিক ও আচরণগত ব্যাধির ক্ষেত্রে মানুষের মস্তিষ্কে সরাসরি আলো ফেলে কোষ নিয়ন্ত্রণ করা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ডাইসেরথের এই নোবেলজয়ী প্রযুক্তি বর্তমানে পরোক্ষভাবে (Indirectly) অত্যন্ত নিখুঁত ও কার্যকর ওষুধ আবিষ্কারের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে
অতীতে অটিজম বা সিজোফ্রেনিয়ার ওষুধ তৈরি করা কঠিন ছিল, কারণ মস্তিষ্কের ঠিক কোন অংশের ত্রুটির কারণে এই রোগগুলো হয় তা নির্দিষ্ট করে জানা যেত না। ডাইসেরথের অপটোজেনেটিক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে ল্যাবরেটরিতে জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট নিউরনে আলো ফেলে দেখা সম্ভব হয়েছে যে, কোন কোষগুলো সামাজিক আচরণ বা মতিভ্রমের (Hallucination) জন্য দায়ী। এটি বিজ্ঞানীদেরকে অটিজম ও সিজোফ্রেনিয়ার জন্য দায়ী ব্রেন-সার্কিটের একটি নিখুঁত মানচিত্র বা ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

১. ত্রুটিপূর্ণ ব্রেন-সার্কিটের নির্ভুল মানচিত্র তৈরি (Mapping the Circuits)
অতীতে অটিজম বা সিজোফ্রেনিয়ার ওষুধ তৈরি করা কঠিন ছিল, কারণ মস্তিষ্কের ঠিক কোন অংশের ত্রুটির কারণে এই রোগগুলো হয় তা নির্দিষ্ট করে জানা যেত না। ডাইসেরথের অপটোজেনেটিক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে ল্যাবরেটরিতে জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট নিউরনে আলো ফেলে দেখা সম্ভব হয়েছে যে, কোন কোষগুলো সামাজিক আচরণ বা মতিভ্রমের (Hallucination) জন্য দায়ী। এটি বিজ্ঞানীদেরকে অটিজম ও সিজোফ্রেনিয়ার জন্য দায়ী ব্রেন-সার্কিটের একটি নিখুঁত মানচিত্র বা ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
২. ট্রায়াল অ্যান্ড এরর (Trial and Error) পদ্ধতির অবসান
ঐতিহ্যগতভাবে মনোরোগের ওষুধগুলো তৈরি হতো ট্রায়াল অ্যান্ড এরর বা অনুমানের ভিত্তিতে, যা পুরো মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলত এবং তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত। ডাইসেরথের গবেষণা এই ধারোণাকে বদলে দিয়েছে। অপটোজেনেটিক্সের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট কোষ চিহ্নিত হওয়ায়, বিজ্ঞানীরা এখন শুধু সেই নির্দিষ্ট সার্কিটকে লক্ষ্য করে (Targeted Therapy) ওষুধ ডিজাইন করতে পারছেন। ফলে ওষুধের কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়েছে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
৩. ম্যাপলাইট থেরাপিউটিক্স ও বাস্তব প্রয়োগের বর্তমান অবস্থা
কার্ল ডাইসেরথের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত বায়োটেক কোম্পানি ম্যাপলাইট থেরাপিউটিক্স (Maplight Therapeutics) বর্তমানে এই পরোক্ষ চিকিৎসা পদ্ধতিকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে :
সিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা: সিজোফ্রেনিয়ার রোগীদের আচরণগত সমস্যা ও মতিভ্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা ‘ML-007’ নামের একটি নির্দিষ্ট ওষুধ তৈরি করেছে। ওষুধটি মস্তিষ্কের শুধুমাত্র সেই রিসেপ্টরকে লক্ষ্য করে কাজ করে যা অপটোজেনেটিক্স দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছিল।
অটিজমের চিকিৎসা: অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে (ASD) আক্রান্ত ব্যক্তিদের সামাজিক মেলামেশার জড়তা ও খিটখিটে মেজাজ দূর করার জন্যও তারা একই প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে বিশেষ থেরাপিউটিক ওষুধ তৈরি করেছে।
৪. ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও এফডিএ (FDA) স্বীকৃতি
এই গবেষণা যে অলরেডি সফলভাবে কাজ করছে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো এর বর্তমান ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ধাপগুলো:
ম্যাপলাইটের তৈরি সিজোফ্রেনিয়া ও অটিজমের ওষুধগুলো মানুষের ওপর ফেজ-২ (Phase 2) ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন করে বর্তমানে ফেজ-৩ (Phase 3) ট্রায়ালে প্রবেশ করেছে।
সিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসার জন্য তৈরি এই ওষুধটির কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ (FDA) এটিকে ‘Fast Track’ বা দ্রুত অনুমোদনের বিশেষ স্বীকৃতি দিয়েছে।
কার্ল ডাইসেরথের অপটোজেনেটিক্স গবেষণা অটিজম ও সিজোফ্রেনিয়ার রোগীদের সরাসরি মস্তিষ্কে আলো না জ্বেলেও, তাদের রোগ নিরাময়ের পথকে আলোকিত করেছে। গবেষণাগারের এই প্রযুক্তি আজ ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিতে এমন এক বিপ্লব এনেছে, যার ফলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই অটিজম ও সিজোফ্রেনিয়ার শতভাগ কার্যকরী ও সুনির্দিষ্ট ওষুধ সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
