সাংবাদিকদের অনুসন্ধানের বাইরে দূতাবাস-হাইকমিশন, তথাকথিত মেধাবী আমলাতন্ত্রের সুবিধাভোগী সংস্কৃতি এবং দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্ন।
ফলোআপ নিউজ | বিশেষ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ
একজন রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক সংবাদ নেই। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই, অনিয়মের খবর নেই, ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিবেদন নেই। তিনি উচ্চশিক্ষিত, দীর্ঘদিনের কূটনীতিক, একাধিক দেশে দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকারি জীবনবৃত্তান্তে তার কর্মজীবন বেশ বর্ণাঢ্য।
তাহলে কি তিনি একজন আদর্শ রাষ্ট্রদূত?
প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে অস্বস্তিকর। কিন্তু আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা বিদেশে অবস্থিত দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোর কার্যক্রম নিয়ে কতটা অনুসন্ধান করেন? এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সরকারি অর্থের ব্যবহার, প্রবাসীদের অভিযোগ, শ্রমিকদের আইনি সহায়তা এবং নাগরিক সুরক্ষায় ব্যর্থতা নিয়ে নিয়মিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কোথায়?
বাংলাদেশের রাজনীতি, ব্যবসা কিংবা প্রশাসনের নানা ক্ষেত্র নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিতর্ক দেখা গেলেও বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে তুলনামূলকভাবে কতটা অনুসন্ধান হয়, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। তবে এই ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম. দেলোয়ার হোসেনকে ঘিরে তাই প্রশ্নটি শুধু একজন কর্মকর্তার কর্মদক্ষতা নিয়ে নয়। এটি সাংবাদিকতার অগ্রাধিকার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং তথাকথিত মেধাবী আমলাতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়েও।
রাষ্ট্রদূত সম্পর্কে খারাপ কথা নেই— এটি তার সাফল্যের প্রমাণ, নাকি তার কাজ নিয়ে যথেষ্ট অনুসন্ধানই হয়নি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে জানতে হবে, তিনি কে, তার কর্মজীবন কী এবং তার নেতৃত্বাধীন মিশনের দায়িত্ব কী।

প্রকৌশলী থেকে কূটনীতিক, কূটনীতিক থেকে রাষ্ট্রদূত
রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের সরকারি জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, এম. দেলোয়ার হোসেন ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হওয়ার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে এমবিএ করেন। পরে প্যারিসের International Institute of Public Administration থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
তার কূটনৈতিক কর্মজীবনের বড় অংশ কেটেছে বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক বিভাগে।
এম. দেলোয়ার হোসেনের কর্মজীবনের টাইমলাইন
| সময়কাল | কর্মস্থল ও দায়িত্ব |
|---|---|
| ১৯৯৮ | বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিসে যোগদান |
| ২০০১–২০০৪ | প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাস— থার্ড ও সেকেন্ড সেক্রেটারি |
| ২০০৪–২০০৮ | ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাস— ফার্স্ট সেক্রেটারি ও কাউন্সেলর |
| ২০০৮–২০১২ | সরকারি জীবনীতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও মিশনে দায়িত্বের ধারাবাহিকতা; এই সময়ের পূর্ণাঙ্গ পদায়ন-তালিকা প্রকাশিত জীবনীতে নেই |
| ২০১২–২০১৪ | থিম্পুতে বাংলাদেশ দূতাবাস— কাউন্সেলর |
| ২০১৪–২০১৭ | বেইজিংয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস— মিনিস্টার ও ডেপুটি হেড অব মিশন |
| ২০১৭–২০২১ | পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে কর্মরত থাকার সময়; সুনির্দিষ্ট পদায়নের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশিত জীবনীতে নেই |
| ২০২১–২০২৪ | দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত |
| ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে | সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত |
সূত্র: রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের সরকারি জীবনবৃত্তান্ত। উপরের যেসব সময়ের পূর্ণাঙ্গ পদায়ন-তথ্য প্রকাশিত জীবনীতে নেই, সেগুলো অনুমান করে পূরণ করা হয়নি।
শিক্ষাগত যোগ্যতা
| বিষয় | প্রতিষ্ঠান |
|---|---|
| মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং | খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (KUET) |
| এমবিএ | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (IBA) |
| আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে ডিপ্লোমা | International Institute of Public Administration, Paris |
| ভাষাগত দক্ষতা | ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় ভালো দক্ষতা— সরকারি জীবনী অনুযায়ী |
সরকারি জীবনীতে তার বৈবাহিক অবস্থা ও দুই ছেলের কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত জীবনের এসব তথ্যের চেয়ে রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার কাজের মূল্যায়নই জনস্বার্থে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তথাকথিত মেধাবীঃ সাফল্য কার, দায় কার?
বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, বিদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়া, উচ্চপদে পদোন্নতি পাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ দেশে পদায়নকে প্রায়ই মেধার স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়। এসব অর্জন অবশ্যই পেশাগত যোগ্যতার পরিচায়ক হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই যোগ্যতার সামাজিক মূল্য কী?
একজন কর্মকর্তা তার কর্মজীবনে সফল হয়েছেন— এর অর্থ কি তিনি জনগণের জন্যও সফল? পদোন্নতি, বিদেশে দায়িত্ব পালন এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অর্জন এক ধরনের সাফল্য। আর নাগরিকের অধিকার রক্ষা, সংকটে কার্যকর সহায়তা দেওয়া এবং নিজের প্রতিষ্ঠানের কাজের জন্য জবাবদিহি করা আরেক ধরনের সাফল্য।
দু’টি এক নয়।
একজন প্রকৌশলী কূটনীতিক হতে পারেন, একজন ব্যবসায় প্রশাসনে শিক্ষিত ব্যক্তি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন, একজন কর্মকর্তা একাধিক ভাষায় দক্ষ হতে পারেন। কিন্তু এসব যোগ্যতার কোনোটিই নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে তিনি প্রবাসী শ্রমিকের বকেয়া বেতন আদায়ে সফল, বন্দির আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে সক্ষম কিংবা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে কার্যকর।
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় যখন পদমর্যাদা ও পেশাগত সুবিধা দৃশ্যমান থাকে, অথচ ব্যর্থতার পরিমাপযোগ্য হিসাব জনসমক্ষে থাকে না, তখন সুবিধাভোগী প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এম. দেলোয়ার হোসেনকে ব্যক্তিগতভাবে সুবিধাবাদী ঘোষণা করার বিষয় এখানে নয়। কিন্তু তার মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পদায়নের ইতিহাস যথেষ্ট নয়। তাদের দায়িত্ব পালনের ফলাফলও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডঃ রাষ্ট্র জানল ঘটনার পর
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে।
দ্য ডেইলি স্টার ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব ১৪ অক্টোবর ২০২৬ মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে তাদের নাম নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের বিরুদ্ধে মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছিল। তদন্তের পর তাদের আদালতে পাঠানো হয়, আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর তা কার্যকর করা হয়। তবে প্রকাশিত বিবৃতিতে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, গ্রেপ্তারের সময়, আইনজীবী নিয়োগ কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ছিল না।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে মন্ত্রণালয় কিংবা সৌদি আরবে বাংলাদেশের মিশনকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়নি। ১৪ অক্টোবর ঘটনার পর বাংলাদেশ বিষয়টি জানতে পারে। এরপর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়।
১৮ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, বৈঠকে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সৌদি আরব আগে থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশকে অবহিত করেনি বলে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি বাংলাদেশের মিশনের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ ও ঝুঁকি শনাক্তকরণের ব্যবস্থাও যাচাই করা প্রয়োজন।
বন্দিদের তালিকায় নাম ছিল, কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের তথ্য ছিল না
দ্য ডেইলি স্টারের ১৯ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষ এর আগে প্রায় ২,৫০০ বন্দির একটি তালিকা বাংলাদেশি মিশনকে দিয়েছিল। ওই তালিকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির নাম ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট সেপ্টেম্বর মাসে ওই অঞ্চলের বাংলাদেশি বন্দিদের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চেয়েছিল। জবাবে পাওয়া তালিকায় দুই ব্যক্তির নাম থাকলেও তা দের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কথা উল্লেখ ছিল না। একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে ‘adultery’ এবং অন্যজনের ক্ষেত্রে ‘ICT’ লেখা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
কনস্যুলেটের একজন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, তালিকায় থাকা তথ্য দিয়ে দুই ব্যক্তির মামলার সঙ্গে পরবর্তী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে মেলানো সম্ভব হয়নি।
একজন কর্মকর্তার বক্তব্যে আরও বলা হয়, বিপুলসংখ্যক বন্দির প্রত্যেকের মামলা নিয়মিত অনুসরণ করা বাস্তবে কঠিন। মিশন কারাগার পরিদর্শন করে কনস্যুলার সেবা দিয়ে থাকে এবং কিছু ক্ষেত্রে সাজা কমানোর সফল উদ্যোগও ছিল।
এই তথ্যগুলো একদিকে দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে, অন্যদিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নও তৈরি করে: বন্দিদের তালিকা পাওয়ার পর গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, তাদের মামলা অনুসরণ করা এবং সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি যাচাই করার জন্য কী ব্যবস্থা ছিল?
তালিকায় নাম থাকা মানেই মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে আগে থেকে জানা ছিল না। আবার তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের তথ্য ছিল না বলেই দায়িত্ব পালনের সব প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না।
রাষ্ট্রদূত কি ব্যক্তিগতভাবে দায়ী?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে প্রমাণ ও দায়িত্বের সীমা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে অবহিত না করে থাকলে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সমস্যা। কোনো রাষ্ট্রদূত স্বাগতিক দেশের প্রতিটি বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। হাজার হাজার প্রবাসী নাগরিকের প্রতিটি মামলা ব্যক্তিগতভাবে অনুসরণ করাও বাস্তবসম্মত নয়।
কিন্তু দূতাবাসের দায়িত্ব কেবল কূটনৈতিক অনুষ্ঠান আয়োজন কিংবা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সৌহার্দ্য তুলে ধরা নয়। বিদেশে আটক নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ, তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা, কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া, গুরুতর মামলার ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন হলে আইনি সহায়তার সুযোগ খোঁজাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এই ঘটনায় তাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন:
১. প্রায় ২,৫০০ বন্দির তালিকা পাওয়ার পর কীভাবে মামলাগুলো যাচাই করা হয়েছিল?
২. দুই বাংলাদেশির বিষয়ে দূতাবাস বা কনস্যুলেটের কাছে আগে কী তথ্য ছিল?
৩. তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, আইনজীবীর সহায়তা কিংবা কনস্যুলার যোগাযোগের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি?
৪. মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করার কোনো নির্দিষ্ট প্রটোকল রয়েছে কি?
৫. ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নেবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া রাষ্ট্রদূতকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যর্থ ঘোষণা করা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি তা র পদমর্যাদা ও অভিজ্ঞতার কারণে তাঁকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়।
সাংবাদিকেরা দূতাবাস ও হাইকমিশন নিয়ে অনুসন্ধান করে না কেন?
আমাদের মূল প্রশ্ন এখানেই।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে দূতাবাস ও হাইকমিশনের সংবাদ বলতে প্রায়ই দেখা যায় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে মন্ত্রী বা বিদেশি কর্মকর্তার বৈঠক, জাতীয় দিবস উদ্যাপন, প্রবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময় কিংবা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিবাচক বিবরণ।
এসব সংবাদ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু এগুলো দিয়ে কোনো মিশনের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা যায় না।
একটি দূতাবাসে বছরে কতজন বাংলাদেশি শ্রমিক সহায়তা চান? কতটি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়? কতজনের বকেয়া বেতন আদায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়? কতজন বন্দি কনস্যুলার সহায়তা পান? গুরুতর অপরাধের মামলাগুলো কীভাবে অনুসরণ করা হয়? সরকারি অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়? দূতাবাসের সেবার মান নিয়ে অভিযোগ থাকলে তার নিষ্পত্তি কীভাবে হয়?
এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কতটা প্রকাশিত হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
আমাদের হাতে বাংলাদেশের সব দূতাবাস ও হাইকমিশন নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই। ফলে সাংবাদিকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে এসব প্রতিষ্ঠানকে আড়াল করেন— এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না, বরং এটি সংবাদ মাধ্যমের সামর্থ্যের প্রশ্ন। এক্ষেত্রে সংবাদ প্রকাশের প্রবণতা, অনুসন্ধানের ঘাটতি এবং তথ্যপ্রাপ্তির বাধা নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।
দূতাবাস ও হাইকমিশন বিদেশে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাদের কার্যক্রমের ওপর সাংবাদিকতার নজরদারি না থাকলে সাফল্য ও ব্যর্থতা— দুটিই জনসাধারণের কাছে অস্পষ্ট থেকে যেতে পারে।
সাংবাদিকতার কাজ কোনো কর্মকর্তাকে অকারণে বিতর্কিত করা নয়; বরং যার হাতে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব রয়েছে, তার কাজের হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরা।
রাষ্ট্রদূতের জীবনবৃত্তান্ত আছে, কর্মদক্ষতার প্রকাশ্য হিসাব কোথায়?
এম. দেলোয়ার হোসেনের সরকারি জীবনবৃত্তান্তে তার শিক্ষা, বিদেশে পদায়ন, কূটনৈতিক পদমর্যাদা এবং ভাষাগত দক্ষতার তথ্য রয়েছে। কিন্তু তার নেতৃত্বাধীন মিশনের বার্ষিক কর্মদক্ষতার এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ্য প্রতিবেদন এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি, যেখানে প্রবাসীদের অভিযোগ নিষ্পত্তি, শ্রমিকদের আইনি সহায়তা, বন্দিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নাগরিক সুরক্ষায় অর্জিত ফলাফল একসঙ্গে পরিমাপ করা যায়।
এটি দিয়ে বলা যায় না যে দূতাবাস এসব কাজ করে না। বরং বলা যায়, এসব কাজের কার্যকারিতা যাচাই করার জন্য আরও তথ্য দরকার।
একটি কার্যকর জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় অন্তত কয়েকটি সূচক নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে:
| মূল্যায়নের ক্ষেত্র | যে তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন |
|---|---|
| শ্রমিকদের অভিযোগ | বছরে কতটি অভিযোগ এসেছে, কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে |
| বকেয়া বেতন ও ক্ষতিপূরণ | কতটি মামলায় সহায়তা দেওয়া হয়েছে, কী ফলাফল হয়েছে |
| বন্দিদের কনস্যুলার সেবা | কতজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, কতটি গুরুতর মামলা অনুসরণ করা হয়েছে |
| আইনি সহায়তা | আইনজীবী বা আইনি পরামর্শ পেতে কতজনকে সহায়তা করা হয়েছে |
| জরুরি নাগরিক সুরক্ষা | গুরুতর সংকটে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে |
| সরকারি ব্যয় | প্রযোজ্য বিধি ও গোপনীয়তা রক্ষা করে বরাদ্দ, ব্যয় ও ক্রয়প্রক্রিয়ার তথ্য |
| অভিযোগের জবাবদিহি | সেবার মান নিয়ে অভিযোগের নিষ্পত্তি ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা |
এ ধরনের তথ্য থাকলে রাষ্ট্রদূত বা দূতাবাসের কাজ মূল্যায়ন করা সহজ হবে। তখন আলোচনা ব্যক্তিগত প্রশংসা কিংবা অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রমাণের ভিত্তিতে কার্যকারিতা বিচার করা সম্ভব হবে।
সুবিধাভোগী আমলাতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, বেতন-ভাতা, বিদেশে দায়িত্ব পালনের সুযোগ এবং পেশাগত সুবিধা ভোগ করেন। এসব সুবিধা তাদের দায়িত্ব পালনের জন্যই দেওয়া হয়। ফলে তাদের কর্মদক্ষতা যাচাই করা কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; এটি জনস্বার্থে স্বাভাবিক জবাবদিহি।
কিন্তু কোনো ব্যবস্থায় যদি কর্মকর্তাদের অর্জন দৃশ্যমান হয়, অথচ তাদের কাজের ফলাফল পরিমাপের ব্যবস্থা দুর্বল থাকে, তাহলে সুবিধা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।
এম. দেলোয়ার হোসেনের কর্মজীবন উচ্চশিক্ষা ও দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার পরিচয় দেয়। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় কতটা কার্যকর, তা যাচাইয়ের জন্য বাস্তব ফলাফল প্রয়োজন।
মেধা কেবল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বা উচ্চপদে পৌঁছানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে মেধার সামাজিক মূল্য নির্ধারিত হয় সেই যোগ্যতা জনস্বার্থে কতটা কাজে লাগানো হয়েছে, তার মাধ্যমে।
এখানে প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিকে আগেভাগে সুবিধাবাদী আখ্যা দেওয়া নয়। প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক ব্যবস্থায় দায়িত্ব পালনের সাফল্য ও ব্যর্থতা পরিমাপের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
আমাদের নদের চাঁদেরা প্রশ্নের বাইরে কেনো থাকতে চান?
রাষ্ট্রদূত এম. দেলোয়ার হোসেন সম্পর্কে নেতিবাচক সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে না— এই তথ্য নিজে থেকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তৈরি করে না। একইভাবে, সংবাদ না থাকার অর্থও এই নয় যে তার কাজের প্রতিটি দিক সন্তোষজনক।
তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত। সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাও নথিভুক্ত। বাংলাদেশি মিশনকে আগে জানানো হয়নি বলে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, বন্দিদের একটি তালিকায় ওই দুই ব্যক্তির নাম থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের তথ্য ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এখন প্রয়োজন এসব তথ্যের ভিত্তিতে দূতাবাসের ভূমিকা যাচাই করা, রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা থাকলে তা চিহ্নিত করা।
ফলোআপ নিউজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূত এম. দেলোয়ার হোসেন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা— দুই বাংলাদেশির মামলার বিষয়ে দূতাবাসের কাছে আগে কী তথ্য ছিল, কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হোক।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের সাংবাদিকদেরও প্রশ্ন করতে হবে, বিদেশে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারা কতটা জবাবদিহির আওতায় আনছেন।
আমাদের নদের চাঁদ— রাষ্ট্রদূত সম্পর্কে খারাপ কথা নেই, কিন্তু তার কাজ নিয়ে যথেষ্ট অনুসন্ধান হয়েছে কি? এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত জীবনবৃত্তান্তকে কর্মদক্ষতার চূড়ান্ত সনদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রদূতের পদমর্যাদা তাকে সম্মান দিতে পারে; কিন্তু জনস্বার্থে তার কাজের মূল্যায়ন থেকে অব্যাহতি দিতে পারে না। তথাকথিত মেধাবী ও সুবিধাভোগী আমলাতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদ—এম. দেলোয়ার হোসেনের সরকারি জীবনবৃত্তান্ত: https://riyadh.mofa.gov.bd/pages/static-pages/6952667f35ce18e1c05a9912
২. The Daily Star, ১৫ অক্টোবর ২০২৬—সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর: https://www.thedailystar.net/news/world/middle-east/news/saudi-arabia-executes-2-bangladeshis-over-immoral-act-makkah-mosque-4299596
৩. The Daily Star, ১৭ অক্টোবর ২০২৬—বাংলাদেশের মিশনের তথ্য চাওয়া ও সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাবের অপেক্ষা: https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/diplomacy/news/dhaka-still-the-dark-over-saudi-executions-4300601
৪. The Daily Star, ১৮ অক্টোবর ২০২৬—বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া: https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/diplomacy/news/execution-2-bangladeshis-makkah-dhaka-seeks-explanation-saudi-ambassador-4301756
৫. The Daily Star, ১৯ অক্টোবর ২০২৬—বন্দিদের তালিকায় দুই বাংলাদেশির নাম থাকা, কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের তথ্য না থাকার প্রতিবেদন: https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/diplomacy/news/2-bangladeshis-executed-ksa-shared-prisoner-list-concealed-death-penalties-4302226
