Headlines

প্রকৃত উগ্রবাদী কারা? ধর্মের বেশে যারা আছে, নাকি শোষিত অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক যারা?

ফলোআপ নিউজ ডেস্ক


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে উগ্রবাদকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়, পোশাক, স্লোগান কিংবা কোনো বিশেষ মতাদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। দেখতে হবে—কে মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে, কে বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখছে, কে মানুষের শ্রমের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করছে, কে নিজের ক্ষমতা রক্ষার জন্য অন্যের অধিকার ধ্বংস করছে এবং কারা এসব অন্যায় জেনেও নীরব থেকে শোষণের কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে।

অর্থনৈতিক উগ্রবাদ
ক্ষমতার অশুভ চক্র: যখন পুঁজিপতিদের চরম শোষণ আর ‘অর্থনৈতিক উগ্রবাদ’ আড়াল করতে সমাজজুড়ে ‘ধর্মীয় উগ্রবাদ ও মেরুকরণ’ উসকে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের চোখ অন্ধ করে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার এক সুনিপুণ খেলা এটি।

একদিকে ধর্মের নামে সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও ব্যক্তিস্বাধীনতা দমনের প্রবণতা রয়েছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি আটকে রাখা, ঋণের ফাঁদে মানুষকে বন্দী করা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুবিধা কুক্ষিগত করা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্ন। যে পশ্চিমা দেশগুলো একসময় উপনিবেশ স্থাপন করে অন্য ভূখণ্ডের সম্পদ ও শ্রম নিয়ন্ত্রণ করেছিল, তাদের অনেকেই আজ সরাসরি উপনিবেশ শাসন করে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বহুজাতিক কোম্পানি, প্রযুক্তি, মেধাস্বত্ব, ঋণ ও আর্থিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতার অসমতা এখনও টিকে থাকতে পারে।

এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— শোষণ কেবল শোষকের সক্রিয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে টিকে থাকে না। কখনো তা টিকে থাকে এমন একদল শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী মানুষের নীরবতা, আপস এবং সুবিধাভোগী অবস্থানের কারণে, যাদের কাছ থেকে সমাজ ন্যায়বিচার ও সত্যের পক্ষে কথা বলার প্রত্যাশা করে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: মানুষ কি ক্ষমতার জন্য, নাকি ক্ষমতা মানুষের জন্য?

১. ধর্মীয় উগ্রবাদ: বিশ্বাস যখন অন্যের ওপর আধিপত্যের অস্ত্র

বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের প্রশ্নটি বাস্তব। কেউ যখন নিজের ধর্মীয় ব্যাখ্যাকেই সবার জন্য বাধ্যতামূলক করতে চান, ভিন্নমতকে শত্রু মনে করেন, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কাউকে হেনস্তা করেন কিংবা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন ধর্মবিশ্বাস আর ব্যক্তিগত থাকে না— তা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ারে পরিণত হয়।

ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, নৈতিকতা ও আত্মিক জীবনের অংশ হতে পারে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের নামে অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া, নারীর অধিকার সংকুচিত করা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিপন্ন করা কিংবা ভিন্নমতাবলম্বীদের শাস্তি দেওয়ার দাবি তোলা ধর্মীয় উগ্রতার লক্ষণ।

বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নাস্তিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। এর সমাধান ধর্মবিশ্বাসকে আক্রমণ করে নয়; বরং আইনের সমান প্রয়োগ, ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা এবং ধর্মের নামে সংঘটিত অপরাধের নিরপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে করতে হবে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন: ধর্ম পালন করা উগ্রবাদ নয়। ধর্মীয় পোশাক পরা, উপাসনা করা কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধে জীবন পরিচালনা করাও উগ্রবাদের প্রমাণ নয়। অন্যের অধিকার অস্বীকার করা, জবরদস্তি করা এবং সহিংসতার মাধ্যমে নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সমস্যাটি।

বাংলাদেশের বিপদ শুধু ধর্মীয় উগ্রবাদীদের উপস্থিতি নয়। বিপদ হলো, যখন রাজনৈতিক বা সামাজিক স্বার্থে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করা হয়, তখন ধর্মের নামে সংঘটিত অন্যায়ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে যাওয়ার সুযোগ পায়।

২. অর্থনৈতিক উগ্রবাদ: শোষণ যখন স্বাভাবিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়

এবার অর্থনীতির দিকে তাকানো যাক।

একজন শ্রমিক সারাদিন কাজ করেও যদি পরিবারের খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার নিশ্চয়তা না পান, অথচ তার শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে অন্য কেউ বিপুল সম্পদ অর্জন করেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ন্যায্যতা নিয়ে।

কোনো ব্যবসায়ী মুনাফা করলেই তিনি শোষক নন। ব্যক্তিগত সম্পদ, ব্যবসায়িক সাফল্য কিংবা বিনিয়োগ নিজে উগ্রবাদের প্রমাণ নয়। কিন্তু যখন অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে শ্রমিকের অধিকার খর্ব করা হয়, প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করা হয়, রাষ্ট্রীয় সুবিধা ব্যক্তিগত স্বার্থে নেওয়া হয় কিংবা প্রভাবশালীরা আইনের প্রয়োগ থেকে নিজেদের আড়াল করেন, তখন সেটি গুরুতর সামাজিক অন্যায়ের রূপ নেয়।

বাংলাদেশের শ্রমবাজার, আয়বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কর্মসংস্থানের সংকট এই প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। অর্থনৈতিক শোষণকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখলে হবে না। দেখতে হবে, কার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, কে নিয়ম তৈরি করছে, কে সুবিধা পাচ্ছে এবং ক্ষতির বোঝা কে বহন করছে।

অর্থনৈতিক উগ্রবাদ বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে এমন এক ক্ষমতাকাঠামো, যেখানে মানুষের জীবন ও মর্যাদার চেয়ে মুনাফা, সম্পদ কুক্ষিগত করা এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এটি একটি বিশ্লেষণী ধারণা; ধর্মীয় উগ্রবাদের মতো সর্বজনস্বীকৃত বা নির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞার পরিভাষা নয়।

এই অর্থে কোনো প্রতিষ্ঠান আইন মেনে মুনাফা করলেও তার ব্যবসায়িক মডেল শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশ কিংবা জনস্বার্থের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। আবার সেই প্রশ্নের উত্তরও প্রমাণের ভিত্তিতে দিতে হবে— শুধু সম্পদের পরিমাণ দেখে কাউকে শোষক ঘোষণা করা যাবে না।

৩. বাংলাদেশের বাস্তবতায় দুই ধরনের আধিপত্য

ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের ক্ষেত্র আলাদা হলেও উভয়ের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় রয়েছে: ক্ষমতার অসম ব্যবহার।

ধর্মীয় আধিপত্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে অন্যের বিশ্বাস, মতপ্রকাশ কিংবা জীবনযাপনের স্বাধীনতা সীমিত করতে চায়।

অর্থনৈতিক আধিপত্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুঁজি, বাজার, ঋণ, রাজনৈতিক যোগাযোগ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ব্যবহার করে অন্যের সুযোগ ও অধিকার সংকুচিত করতে পারে।

ধর্মীয় আধিপত্য মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে বিপন্ন করতে পারে। অর্থনৈতিক আধিপত্য মানুষের শ্রম, আয়, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগকে সংকুচিত করতে পারে।

কিন্তু এদের এক করে দেখলে চলবে না। প্রতিটি ক্ষেত্রের কার্যপদ্ধতি, ক্ষতির ধরন এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা আলাদা। একইভাবে, ধর্মীয় নেতা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিচার করতে হবে তাদের নির্দিষ্ট কাজ ও ক্ষমতার ব্যবহারের ভিত্তিতে।

কোনো ব্যক্তি ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারেন, আবার কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সমর্থন অর্জন করতে পারেন। এমন যোগসাজশই এই আলোচনার তাৎপর্য।

৪. পশ্চিমারা কি এখন আর শোষণ করে না, নাকি শোষণ করায়?

এই আলোচনায় পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকাও যুক্ত করা জরুরি। কারণ শোষণ শুধু একটি দেশের ভেতরে ধনী ও দরিদ্রের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ঋণ, প্রযুক্তি, মেধাস্বত্ব, বহুজাতিক কোম্পানি এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়েও অর্থনৈতিক ক্ষমতা এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রবাহিত হতে পারে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলার সম্পদ, রাজস্ব ও বাণিজ্যের ওপর ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উপনিবেশিক শাসন শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতাই কেড়ে নেয়নি; এটি উৎপাদন, রাজস্ব আহরণ, বাণিজ্য এবং সম্পদ বণ্টনের ব্যবস্থাকেও ঔপনিবেশিক স্বার্থের অধীন করেছিল।

আজ বাংলাদেশ সরাসরি ব্রিটিশ উপনিবেশ নয়। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করলেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ক্ষমতার বৈষম্য বিলুপ্ত হয়ে যায় না।

আগে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে উপনিবেশের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করত। বর্তমানে অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব দেখা যেতে পারে বহুজাতিক কোম্পানি, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, মেধাস্বত্ব, প্রযুক্তির মালিকানা, ঋণের শর্ত এবং আন্তর্জাতিক করব্যবস্থার মধ্যে।

অর্থাৎ, শোষণের পদ্ধতি বদলাতে পারে। কোনো দেশের ভূখণ্ড দখল না করেও তার উৎপাদন, শ্রম, বাজার ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব।

তবে এই পরিবর্তনকে বুঝতে হলে সূত্রভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন। সব পশ্চিমা দেশ একই নীতি অনুসরণ করে না; সব বিদেশি বিনিয়োগও শোষণ নয়। পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও স্বার্থ ও নীতির পার্থক্য রয়েছে। একই সঙ্গে এসব দেশের শ্রমিক, নাগরিক, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যেও বৈশ্বিক বৈষম্যের সমালোচনা রয়েছে।

প্রশ্নটি তাই পশ্চিমা পরিচয়কে দোষী সাব্যস্ত করার নয়। প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কার হাতে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, কারা বেশি সুবিধা পাচ্ছে এবং উৎপাদনকারী দেশ ও শ্রমজীবী মানুষ তাদের ন্যায্য অংশ পাচ্ছে কিনা।

৫. বাংলাদেশের পোশাকশিল্প: উৎপাদন এখানে, মূল্য সংযোজন কোথায়?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এই প্রশ্নটি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

বাংলাদেশের শ্রমিকেরা পোশাক তৈরি করেন। স্থানীয় উদ্যোক্তারা কারখানা পরিচালনা করেন, বিনিয়োগ করেন এবং রপ্তানির ঝুঁকি বহন করেন। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের নকশা, ব্র্যান্ড, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং খুচরা বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে।

এখানে প্রশ্ন তোলা যায়: পোশাকের চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্যের কত অংশ বাংলাদেশের শ্রমিক, উৎপাদক, সরবরাহকারী ও সরকারের কাছে থাকে, আর কত অংশ বিদেশি ব্র্যান্ড, বিপণন, পরিবহন ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীর কাছে যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর সব পণ্যের ক্ষেত্রে এক নয়। পণ্যের ধরন, ক্রয়চুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, ব্র্যান্ডের ব্যবসায়িক মডেল ও খরচের ওপর বণ্টন নির্ভর করে। তাই নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া বিদেশি ব্র্যান্ডের মুনাফা বা বাংলাদেশের ক্ষতির একটি নির্দিষ্ট হার দাবি করা ঠিক হবে না।

তবে কাঠামোগত প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। যে দেশে শ্রমিক উৎপাদন করেন, সেই দেশই যদি কম মজুরি ও সীমিত মূল্য সংযোজনের মধ্যে আটকে থাকে, অথচ ব্র্যান্ড ও বাজারের নিয়ন্ত্রণ অন্যত্র কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সুফল কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে?

এখানে বিদেশি ক্রেতাদের পাশাপাশি বাংলাদেশের কারখানামালিক, সাবকন্ট্রাক্টর, মধ্যস্বত্বভোগী ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকাও পরীক্ষা করতে হবে। বিদেশি ক্রেতার মূল্য ও সরবরাহের চাপ স্থানীয় মালিকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে; কিন্তু শ্রমিকের প্রতি স্থানীয় নিয়োগকর্তার দায়িত্ব তাতে বিলুপ্ত হয় না।

অতএব, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শোষণের প্রশ্নটি কেবল বিদেশি ব্র্যান্ড বনাম বাংলাদেশ নয়। এটি বৈশ্বিক বাজারের ক্ষমতা, স্থানীয় মালিকানা, শ্রমিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সম্মিলিত প্রশ্ন।

৬. ঋণ, সুদ ও নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা

উন্নয়নশীল দেশগুলো অবকাঠামো, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের জন্য বিদেশি ঋণ নিতে পারে। ঋণ নিজে শোষণ নয়; সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে এটি উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু ঋণের ব্যয় বেড়ে গেলে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিলে কিংবা ঋণ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য অর্থের পরিসর সংকুচিত হতে পারে।

এখানে অনুসন্ধানের প্রশ্ন হওয়া উচিৎঃ ঋণ নেওয়ার শর্ত কে নির্ধারণ করছে? প্রকল্পের ব্যয় ও সম্ভাব্য আয় কি বাস্তবসম্মতভাবে হিসাব করা হয়েছে? ঋণের অর্থে তৈরি সম্পদ থেকে কে লাভবান হচ্ছে? ঋণ পরিশোধের বোঝা শেষ পর্যন্ত করদাতা ও সাধারণ নাগরিকের ওপর কতটা পড়ছে? ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা— উভয়ের সিদ্ধান্তের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছে?

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকল্পভিত্তিক ঋণচুক্তি, সুদের হার, পরিশোধের সময়সূচি, ব্যয় ও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল যাচাই করে বের করতে হবে।

সব আন্তর্জাতিক ঋণকে শোষণ বলা যেমন ভুল, তেমনি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা, শর্ত এবং নীতিগত প্রভাব উপেক্ষা করাও ভুল। কোনো ঋণের শর্ত যদি ঋণগ্রহীতা দেশের সামাজিক সুরক্ষা, নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে অযৌক্তিকভাবে সীমিত করে, তাহলে সেই শর্তের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব দায়ও রয়েছে। দুর্বল প্রকল্প পরিকল্পনা, দুর্নীতি, অস্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় অকার্যকর প্রকল্প গ্রহণের দায় কেবল বিদেশি ঋণদাতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। ঋণ গ্রহণ, ব্যয় এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশীয় নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

৭. কর, মুনাফা স্থানান্তর ও সম্পদ কুক্ষিগত করার অদৃশ্য পথ

অর্থনৈতিক শোষণ সব সময় কম মজুরি কিংবা সরাসরি সম্পদ লুটের মাধ্যমে ঘটে না। কখনো তা করব্যবস্থার ফাঁকফোকর, জটিল করপোরেট কাঠামো, মুনাফা স্থানান্তর এবং বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কাজ করে।

বহুজাতিক কোম্পানির কার্যক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— যে দেশে উৎপাদন, বিক্রি বা অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেকে আয় তৈরি হচ্ছে, সেখানে যথাযথ কর পরিশোধ হচ্ছে কিনা।

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক গবেষণায় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কম করের দেশে স্থানান্তর এবং করব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহারের ঝুঁকি নথিভুক্ত হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর-রাজস্ব কমে যেতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য স্পষ্ট। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কৃত্রিম লেনদেন, ভুল স্থানান্তরমূল্য নির্ধারণ কিংবা অন্য কোনো বেআইনি পদ্ধতিতে করের দায় এড়ায়, তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে কর পরিকল্পনা, আইনগত কর ছাড়, কর এড়ানো এবং বেআইনি কর ফাঁকি এক বিষয় নয়; প্রতিটি ক্ষেত্রে নথি ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এখানে আরও একটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিকঃ আন্তর্জাতিক করনীতির নিয়ম তৈরিতে উন্নত অর্থনীতির প্রভাব তুলনামূলক বেশি হলে, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের রাজস্বস্বার্থ কতটা কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পারে?

এটি শুধু বিদেশি কোম্পানির সমস্যা নয়। দুর্বল কর প্রশাসন, স্থানীয় প্রভাবশালীদের কর ফাঁকি, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও রাষ্ট্রের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

রাষ্ট্র যদি কর আদায় করতে ব্যর্থ হয়, অথচ সাধারণ মানুষ পরোক্ষ কর, মূল্যস্ফীতি ও বিভিন্ন ফি-এর বোঝা বহন করেন, তাহলে করব্যবস্থার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কে কত আয় করছেন, কে কত কর দিচ্ছেন এবং কে কতটা রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাচ্ছেন— এসব তথ্যের স্বচ্ছতা তাই অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের অপরিহার্য অংশ।

৮. শোষণের নীরব ভাগীদার: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সুশীল সমাজ ও ভাড়াটে সংস্কৃতিসেবী

কোনো সমাজে অর্থনৈতিক শোষণ দীর্ঘস্থায়ী হতে হলে শুধু পুঁজির মালিক, রাজনৈতিক ক্ষমতাবান কিংবা প্রশাসনিক সুবিধাভোগীদের সক্রিয় ভূমিকা যথেষ্ট নয়। অনেক সময় প্রয়োজন হয় এমন একটি সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ, যেখানে শোষণের কাঠামো প্রশ্নের মুখে পড়ে না, বৈষম্যকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয় এবং ক্ষমতাবানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলার মানুষ ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

এখানেই সামনে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিসেবীদের ভূমিকা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার অর্থ শুধু পাঠদান বা গবেষণা করা নয়; সমাজের ক্ষমতাকাঠামো, বৈষম্য, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনামূলক বিশ্লেষণেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু যখন কোনো শিক্ষক নিজের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা, পদোন্নতি, রাজনৈতিক যোগাযোগ, পরামর্শক নিয়োগ কিংবা ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা রক্ষার জন্য সামাজিক অন্যায়ের প্রশ্ন এড়িয়ে যান, তখন তার নীরবতা বৃহত্তর সমাজে জবাবদিহির সংকটকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।

একইভাবে, সুশীল সমাজের কাজ শুধু সভা-সেমিনার আয়োজন, বিবৃতি প্রকাশ কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়া নয়। রাষ্ট্র, বাজার ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনস্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানোও তার মৌলিক দায়িত্ব।

কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রভাবশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক, প্রকল্পের অর্থায়ন, পদ-পদবি, পরামর্শক নিয়োগ কিংবা রাজনৈতিক সুবিধার কারণে কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট অন্যায়ের প্রশ্নে নীরব থাকেন। অন্যদিকে, তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ বা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক বিষয়ে তারা উচ্চকণ্ঠ হন।

এখানে মূল প্রশ্নটি তাদের পরিচয় নয়, তাদের অবস্থানের ধারাবাহিকতা। তারা কি একই মানদণ্ডে ক্ষমতাবান ও দুর্বল— উভয়ের কাজের সমালোচনা করেন? নাকি ক্ষমতাবানের ক্ষেত্রে তাদের ভাষা নমনীয় হয়ে যায়, আর দুর্বল বা ক্ষমতাহীন মানুষের ক্ষেত্রে নীতিকথা কঠোর হয়ে ওঠে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সুশীল সমাজের সবাইকে এভাবে বিচার করা যাবে না। বহু শিক্ষক, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সংগঠন বৈষম্য, দুর্নীতি এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে কাজ করেন। তাদের অবদান অস্বীকার করা হবে আরেক ধরনের অন্যায়। আলোচনার বিষয় হলো সেই অংশ, যারা জ্ঞান, মর্যাদা ও সামাজিক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত সুবিধার কারণে জনস্বার্থের প্রশ্নে আপস করেন।

সংস্কৃতিসেবী যখন সংস্কৃতির বদলে ক্ষমতার সেবা করেন

একটি সমাজের শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ ন্যায়বোধ, মানবিকতা এবং ক্ষমতার সমালোচনা প্রত্যাশা করেন। কারণ সংস্কৃতির অন্যতম কাজ হলো মানুষের অভিজ্ঞতা, যন্ত্রণা, স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে প্রকাশ করা।

কিন্তু সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও পৃষ্ঠপোষকতা, পুরস্কার, পদ, প্রকল্প, প্রচার এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রভাব থাকতে পারে। কোনো সংস্কৃতিকর্মী যখন নিজের শিল্পীসত্তা ও স্বাধীন অবস্থানের বদলে ক্ষমতাবান পৃষ্ঠপোষকের স্বার্থ রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেন, তখন তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

এখানে ‘ভাড়াটে সংস্কৃতিসেবী’ বলতে বোঝানো হচ্ছে সেই ধরনের সুবিধাভোগী ভূমিকাকে, যেখানে সংস্কৃতি ও শিল্পকে স্বাধীন চিন্তার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার না করে অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রচার, বৈধতা কিংবা জনমত নিয়ন্ত্রণের কাজে লাগানো হয়।

কেউ অর্থের বিনিময়ে কাজ করলেই তিনি ভাড়াটে সংস্কৃতিসেবী নন। শিল্পী বা সাংস্কৃতিক কর্মীর পারিশ্রমিক গ্রহণ করা স্বাভাবিক। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন অর্থ বা পৃষ্ঠপোষকতার বিনিময়ে সত্য গোপন করা হয়, অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া হয়, সমালোচনাকে দমন করা হয় কিংবা একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে সুবিধা অনুযায়ী নীতি বদলে ফেলা হয়।

একজন শিল্পী কোনো সরকারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন; একজন শিক্ষক কোনো প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হতে পারেন; একজন নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধি কোনো প্রকল্পের অর্থায়ন গ্রহণ করতে পারেন। এসবের কোনোটিই নিজে অপরাধ বা অনৈতিকতার প্রমাণ নয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট আর্থিক সম্পর্ক, স্বার্থের সংঘাত এবং বক্তব্যের স্বাধীনতা সম্পর্কে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।

প্রশ্নটি হলো— তারা কি অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতার উৎস নির্বিশেষে সত্য বলার স্বাধীনতা বজায় রাখছেন?

নীরবতা কি সব সময় অপরাধের সহযোগিতা?

এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য জরুরি। কোনো ব্যক্তি কোনো বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন না বলেই তাকে শোষণের সহযোগী বলা যায় না। ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, প্রমাণের অভাব, পেশাগত সীমাবদ্ধতা কিংবা অন্য কোনো বৈধ কারণেও মানুষ নীরব থাকতে পারেন।

কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো অন্যায়ের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানে, তার বিরুদ্ধে কথা বলার বাস্তব সক্ষমতা রাখে এবং তবু ব্যক্তিগত সুবিধা রক্ষার জন্য ধারাবাহিকভাবে সত্য গোপন করে বা অন্যায়কে বৈধতা দেয়, তখন সেই ভূমিকা সমালোচনার দাবি রাখে।

বিশেষ করে যারা জনসম্পদ, জনমত, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নীতিনির্ধারণের ওপর প্রভাব রাখেন, তাদের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি। কারণ তাদের বক্তব্যের সামাজিক প্রভাবও বেশি হতে পারে।

শোষণের কাঠামো শুধু শোষকের হাতে তৈরি হয় না; কখনো তা টিকে থাকে এমন মানুষের সহায়তায়, যারা নিজেদের স্বার্থে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমাজের প্রতিরোধ দুর্বল করে দেন।

৯. ধর্মীয় উগ্রবাদ বনাম বৈশ্বিক অর্থনৈতিক আধিপত্যঃ তুলনাটি কোথায়?

ধর্মীয় উগ্রবাদ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক আধিপত্য এক ধরনের ঘটনা নয়। একটির সঙ্গে বিশ্বাস, পরিচয় ও সামাজিক কর্তৃত্বের প্রশ্ন যুক্ত; অন্যটির সঙ্গে উৎপাদন, সম্পদ, বণ্টন এবং বাজারের ক্ষমতার প্রশ্ন যুক্ত। তবে উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতার অপব্যবহার, অসমতা ও জবাবদিহির ঘাটতি মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনুসন্ধানের বিষয় হচ্ছে— অর্থনৈতিক উগ্রবাদ কীভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদকে ব্যবহার করে। এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ কীভাবে দুবৃত্তের অর্থনীতি থেকে সুবিধা নিয়ে নিষ্কর্মা হয়েও ধর্মীয় উগ্রবাদকে পুঁজি করো ভোগবাদী জীবন কাটায়।

ধর্মীয় উগ্রবাদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি হতে পারে ভয়, সামাজিক চাপ, সহিংসতা কিংবা ভিন্নমত দমন। অর্থনৈতিক আধিপত্যের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি হতে পারে অন্যায্য চুক্তি, বাজারে একচেটিয়া প্রভাব, শ্রমের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করা, ঋণের শর্ত কিংবা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা।

এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক বৈধতা। কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে যদি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে বিদ্যমান বৈষম্যই স্বাভাবিক, দরিদ্র মানুষের দুর্দশা কেবল তাদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা এবং ক্ষমতাবানদের সম্পদ অর্জন সব সময় তাদের যোগ্যতার ফল, তাহলে সামাজিক কাঠামোর প্রশ্নটি আড়ালে চলে যেতে পারে।

এ ধরনের ধারণা কখনো সরলীকৃত অর্থনৈতিক বক্তব্য, কখনো রাজনৈতিক প্রচার, আবার কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি ও সুশীল সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ— তারা কি বিদ্যমান ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে মানুষকে সাহায্য করছে, নাকি প্রশ্নহীন আনুগত্য তৈরি করছে?

কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে শোষণের সহযোগী বলতে হলে তাদের কাজ, আর্থিক সম্পর্ক, বক্তব্য এবং সিদ্ধান্তের প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু ভিন্নমত, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে কাউকে এই পরিচয় দেওয়া যুক্তিসংগত নয়।

১০. বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি

বাংলাদেশের মানুষের সামনে প্রশ্নটি শুধু ধর্মীয় উগ্রবাদ মোকাবিলার নয়, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও।

ধর্মের নামে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিলে তার বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। একইভাবে, কোনো দেশি বা বিদেশি কোম্পানি শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘন করলে, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান অন্যায্য সুবিধা নিলে কিংবা কোনো ক্ষমতাবান গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগত করলে তার বিরুদ্ধেও কথা বলতে হবে।

একই মানদণ্ড প্রযোজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিসেবীদের ক্ষেত্রেও। তাদের কাজের সমালোচনা করা যাবে, তাদের স্বার্থের সংঘাত অনুসন্ধান করা যাবে এবং তাদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে অসংগতি থাকলে তা প্রকাশ করা যাবে। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তি হতে হবে যাচাইযোগ্য তথ্য, নথি এবং প্রমাণ।

অর্থনৈতিক শোষণের সমালোচনা করতে গিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বা ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নকে তুচ্ছ করা যাবে না। আবার ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরোধিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে বৈশ্বিক পুঁজির অন্যায্য ক্ষমতা, স্থানীয় অর্থনৈতিক বৈষম্য কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক সুবিধাবাদের প্রশ্নকে আড়াল করার ফলও ভয়ঙ্কর। ধর্মীয় উগ্রবাদ জিইয়েই রাখা হয় যেনো দৃষ্টি আড়াল করতে।

বাংলাদেশের জন্য কার্যকর অবস্থান হবে— একদিকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও জবরদস্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, অন্যদিকে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, করের ন্যায্যতা, স্বচ্ছ ঋণব্যবস্থা, প্রতিযোগিতামূলক বাজার, রাষ্ট্রীয় সম্পদের জবাবদিহি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

ন্যায়বিচারকে যদি সর্বজনীন নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে ধর্মীয় পরিচয়, জাতীয় পরিচয়, অর্থনৈতিক শক্তি কিংবা সামাজিক মর্যাদা— কোনোটিই অন্যায় করার ছাড়পত্র হতে পারে না।

শক্তি ভূখণ্ড দখল করে সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করত। আজ অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ক্ষমতা কাজ করে বাজারের শর্ত, প্রযুক্তির মালিকানা, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, সরবরাহব্যবস্থা ও করনীতির মধ্য দিয়ে। তাই শোষণ সব সময় বিলুপ্ত হয় না; কখনো তার পদ্ধতি বদলায়, কখনো তার বৈধতা প্রতিষ্ঠার ভাষা বদলায়।

বাংলাদেশের ভেতরেও অর্থনৈতিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক মর্যাদার অসম বণ্টন মানুষের অধিকারকে প্রভাবিত করতে পারে। এই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী শুধু পুঁজির মালিক বা ক্ষমতাবান রাজনীতিক নন; কিছু ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাভোগীরাও থাকতে পারে।

কেউ যদি ধর্মের নামে মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেন, তিনি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। কেউ যদি পুঁজির জোরে মানুষের শ্রম ও ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেন, তিনিও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। আর কেউ যদি নিজের জ্ঞান, সামাজিক মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ব্যবহার করে এসব অন্যায়কে আড়াল করেন, বৈধতা দেন কিংবা জবাবদিহি এড়ানোর পরিবেশ তৈরি করেন, তার ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে আসা উচিৎ।

তবে বিচার হতে হবে কাজ ও প্রমাণের ভিত্তিতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। ধনী হলেই শোষক, ধর্মীয় হলেই উগ্রবাদী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেই সুবিধাভোগী কিংবা শিল্পী হলেই পৃষ্ঠপোষকের দালাল— এমন সিদ্ধান্ত ন্যায়সংগত নয়।

প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কার ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কার অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে, কে অন্যায়ের সুবিধা পাচ্ছে এবং কে সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে।

ধর্মীয় উগ্রবাদ, অর্থনৈতিক শোষণ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সুবিধাবাদ—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে বুঝতে হবে, আবার তাদের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কও অনুসন্ধান করতে হবে। কারণ কোনো সমাজে অন্যায় শুধু অস্ত্র, অর্থ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে টিকে থাকে না; অনেক সময় তা টিকে থাকে মানুষের নীরবতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রশ্নহীন আনুগত্যের ওপরও।

বাংলাদেশে প্রকৃত পরীক্ষা হওয়া উচিৎ পরিচয়ের নয়, ক্ষমতার ব্যবহারের; স্লোগানের নয়, কাজের; আর বাহ্যিক ধার্মিকতা, সম্পদ কিংবা সামাজিক মর্যাদার নয়, মানুষের অধিকার রক্ষায় বাস্তব ভূমিকার।

যে ব্যবস্থায় মানুষ ন্যায়বিচার পায় না, সেখানে শুধু ধর্মীয় উগ্রবাদ দমন করলেই মুক্তি আসবে না। আবার অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর নামে ধর্মীয় স্বাধীনতা বা ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করলেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না।

প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে বিশ্বাসের স্বাধীনতা থাকবে, শ্রমের মর্যাদা থাকবে, সম্পদের ব্যবহারে জবাবদিহি থাকবে, সংস্কৃতি ও জ্ঞান স্বাধীন থাকবে এবং ক্ষমতাবান বলে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন না।

কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ধর্ম বনাম অর্থনীতি নয়; প্রশ্নটি মানুষের স্বাধীনতা বনাম আধিপত্য, ন্যায়বিচার বনাম শোষণ এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো বনাম সুবিধার জন্য নীরব থাকার।