ফলোআপ নিউজ ডেস্ক
নারী নিজের মতো বাঁচবে, উৎসব করবে, বিশ্বাসের সীমানা পেরিয়ে মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করবে— এ অধিকারটুকুও কি পুরুষতান্ত্রিক ধর্মীয় কর্তৃত্বের অনুমতির ওপর নির্ভর করবে?
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা দুর্গাপূজার জন্য এক মাস ধরে শাড়ি জমিয়েছেন। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে কোন শাড়ি পরবেন, সেই পরিকল্পনাও করেছেন। পূজামণ্ডপে গিয়ে তিনি বলেছেন, ঈদের তুলনায় পূজায় তার ঘোরাঘুরি ও আনন্দের সুযোগ বেশি। দুর্গোৎসবকে তিনি অভিহিত করেছেন সবার প্রাণের উৎসব হিসেবে। [সূত্র: কালবেলা, ১৯ অক্টোবর ২০২৬]
অন্যদিকে, বিজয়া দশমীতে অভিনেত্রী ও কণ্ঠশিল্পী মেহের আফরোজ শাওনকে দেখা গেছে ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সিঁদুর খেলায় অংশ নিতে। [সূত্র: জাগোনিউজ২৪, ২১ অক্টোবর ২০২৬]
দুটি ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে উৎসবে অংশগ্রহণের সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় এগুলোকে ঘিরে আরও বড় একটি প্রশ্ন তোলা যায়: ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক বিধিনিষেধ ও পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বাইরে গিয়ে একজন নারী নিজের আনন্দ, সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলে, সেই স্বাধীনতাকে সমাজ কতটা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারে?

নারী কি কেবল নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতিনিধি?
আমাদের সমাজে নারীর জন্য প্রায়ই একটি অদৃশ্য আচরণবিধি তৈরি করে দেওয়া হয়। তিনি কী পরবেন, কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে মিশবেন, কোন উৎসবে অংশ নেবেন, কী বলবেন— এসবের ওপরও অন্যের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলে।
এই নিয়ন্ত্রণের ভাষা কখনো ধর্ম, কখনো সংস্কৃতি, কখনো পারিবারিক সম্মান, আবার কখনো সামাজিক শালীনতা।
কিন্তু একজন নারী কি তার নিজের পরিচয় নিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না? তিনি কি মুসলমান হয়েও হিন্দু প্রতিবেশীর দুর্গাপূজার আনন্দে অংশ নিতে পারবেন না? অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করলে কি তার নিজের ধর্মীয় পরিচয় মুছে যায়?
রুমিন ফারহানার পূজার আনন্দ ভাগ করে নেওয়া কিংবা শাওনের সিঁদুর খেলায় অংশগ্রহণকে এই প্রশ্নগুলোর আলোকে দেখা যায়। তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস সম্পর্কে অনুমান করার প্রয়োজন নেই। তারা যে প্রকাশ্য সাংস্কৃতিক পরিসরে অংশ নিয়েছেন, সেটিই এখানে আলোচনার বিষয়।
ধর্মীয় উগ্রবাদের অস্বস্তি কি স্বাধীন নারীকে ঘিরেই?
ধর্মীয় উগ্রবাদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, ব্যক্তির স্বাধীনতার ওপর মতাদর্শগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। নারী যখন সেই কর্তৃত্বকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মেনে নেন না, তখন তার পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা চরিত্র নিয়ে আক্রমণ শুরু হতে পারে।
তবে ধর্মীয় মানুষ মাত্রই উগ্রবাদী নন। ধর্মীয় বিশ্বাসের চর্চা এবং অন্যের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কেউ পূজায় যাবেন না, কেউ যাবেন— দুই সিদ্ধান্তই ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ। সমস্যা তৈরি হয় যখন একজনের বিশ্বাস অন্যজনের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার যুক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
এখানেই শাওন ও রুমিন ফারহানার মতো প্রকাশ্য ব্যক্তিত্বদের ঘিরে বিতর্কের তাৎপর্য। তাদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে কেউ দ্বিমত পোষণ করতেই পারে। কিন্তু সেই দ্বিমত কি যুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নারীকে ভয় দেখানো, অপমান করা কিংবা সামাজিকভাবে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করবে?
এই পার্থক্যটিই গুরুত্বপূর্ণ।

‘ডোন্টকেয়ার’ নারী: পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বের জন্য অস্বস্তিকর এক বাস্তবতা
‘ডোন্টকেয়ার’ বলতে এখানে দায়িত্বহীনতা বোঝানো হচ্ছে না। বোঝানো হচ্ছে— অন্যের অযৌক্তিক সামাজিক চাপের কাছে আত্মসমর্পণ না করা; নিজের সিদ্ধান্তের দায় নিজের কাঁধে নেওয়া; কে কী বলবে, সেই ভয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন বন্ধ না করা।
এমন নারীর উপস্থিতি প্রচলিত কর্তৃত্বের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। কারণ তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শুধু নিয়ম ঘোষণা করলেই চলে না, তার স্বাধীনতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে হয়।
রুমিন ফারহানা রাজনীতির মানুষ। শাওন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ। তাদের পেশা ও জনপরিসরে ভূমিকা আলাদা। কিন্তু তাদের ঘিরে আলোচনার একটি অভিন্ন প্রশ্ন হলো— একজন নারী কি নিজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপস্থিতি নিজেই নির্ধারণ করবেন, নাকি তার জন্য গ্রহণযোগ্যতার সীমানা অন্যেরা ঠিক করে দেবে?
এ প্রশ্ন শুধু পরিচিত নারীদের জন্য নয়। বাংলাদেশের অসংখ্য সাধারণ নারীও প্রতিদিন পরিবার, সমাজ ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার নামে তৈরি নানা বিধিনিষেধের মুখোমুখি হন। তাদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া অনেক সময় আরও কঠিন।
একই সমাজে ঈদ ও পূজার আনন্দ— এটি কি এতই অস্বাভাবিক?
বাংলাদেশের সামাজিক জীবন বহু শতাব্দী ধরে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংস্পর্শে গড়ে উঠেছে। প্রতিবেশীর উৎসবে যাওয়া, শুভেচ্ছা বিনিময় করা, আনন্দ ভাগ করে নেওয়া— এসব নাগরিক সহাবস্থানের স্বাভাবিক প্রকাশ হতে পারে।
রুমিন ফারহানা যখন বলেন, পূজার আনন্দও সবার, তখন বক্তব্যটির রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি একটি সামাজিক তাৎপর্যও রয়েছে। ধর্মীয় উৎসবকে কেবল একটি সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে আটকে না রেখে পারস্পরিক আনন্দের জায়গা হিসেবে দেখা যায়।
আর শাওনের সিঁদুর খেলায় অংশগ্রহণ মনে করিয়ে দেয়, সাংস্কৃতিক পরিসরে মানুষের উপস্থিতিকে সব সময় সংকীর্ণ পরিচয়ের হিসাব দিয়ে বিচার করতে হবে— এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
অবশ্য উৎসবে অংশ নেওয়া মানেই সব সামাজিক বৈষম্য দূর হয়ে যাওয়া নয়। প্রকৃত সহাবস্থানের পরীক্ষা হয় তখন, যখন সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন সামনে আসে; যখন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে বৈষম্যের শিকার হতে হয়; কিংবা যখন কোনো নারী নিজের সিদ্ধান্তের জন্য অপমানিত হন।
তাহলে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা কি তাদের চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত?
প্রশ্নটি এমন নয় যে শাওন বা রুমিন ফারহানা ব্যক্তিগতভাবে কাউকে পরাজিত করবেন কিনা। বরং প্রশ্ন হলো, তাদের মতো প্রকাশ্য ব্যক্তিত্বের স্বাধীন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়ে মতাদর্শগত বিরোধীরা কি যুক্তি, সহনশীলতা ও নাগরিক অধিকারের ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন?
যদি কেউ তাদের বক্তব্যের সমালোচনা করেন, সেই সমালোচনা যুক্তির ভিত্তিতে হোক। যদি কেউ তাদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত করেন, নিজের বিশ্বাসের পক্ষে কথা বলুন। কিন্তু নারী বলে তাদের চরিত্র, পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণকে আক্রমণের লক্ষ্য বানানো হলে সেটি আর নিছক মতবিরোধ থাকে না।
একজন নারীকে নিজের মতো করে বাঁচতে দেওয়ার মধ্যেই সমাজের সহনশীলতার প্রকৃত পরীক্ষা।
ধর্মের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম না চাপিয়ে দেওয়ার স্বাধীনতা। নিজের ধর্ম পালন করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি অন্যের উৎসবের আনন্দে অংশ নেওয়া বা না নেওয়ার অধিকারও রয়েছে।
শাওন ও রুমিন ফারহানার ঘটনাকে তাই কেবল পূজার ছবি বা বিনোদন কিংবা রাজনৈতিক খবর হিসেবে দেখলে আলোচনার বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এখানে নারীস্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক সহাবস্থান এবং ব্যক্তির ওপর মতাদর্শগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতা— তিনটি বিষয়ই সামনে আসে।
দিনশেষে প্রশ্নটি খুব সরল: একজন নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিলে সমাজ তাকে নাগরিক হিসেবে সম্মান করবে, নাকি তার স্বাধীনতার জন্য তাকেই সামাজিক শাস্তি পেতে হবে?
যে সমাজ এই প্রশ্নের উত্তর স্বাধীনতা, সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের পক্ষে দিতে পারে, সেই সমাজেই ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তির অধিকারকে গ্রাস না করে সহাবস্থানের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
