Headlines

মুখে নারীবাদ, বাস্তবে দুর্বৃত্ত পুরুষতন্ত্রের তল্পিবাহক: এলিট হতে চাওয়া এই নারীরা আসলে কারা?

অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ

নারীবাদের কথা বললেই কেউ নারীমুক্তির পক্ষের মানুষ হয়ে যান না। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পছন্দের অধিকার, পোশাক, জীবনযাপন কিংবা পেশাগত সাফল্যের দাবি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নারীমুক্তির প্রশ্ন যদি কেবল একটি বিশেষ শ্রেণির নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেই নারীবাদ কতটা সর্বজনীন? আর কতটা শ্রেণিগত সুবিধা রক্ষার রাজনৈতিক ভাষা?

অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ
মতাদর্শে দুই দল, লড়াইয়ে দুই পক্ষ—কিন্তু সুতো একই মালিকের হাতে। আর এই ক্ষমতার পুতুলনাচে আড়াল হয়ে যায় প্রকৃত নিপীড়িত নারীদের কণ্ঠস্বর।

আমাদের সমাজে এমন একদল দৃশ্যমান নারী রয়েছেন, যারা নিজেদের আধুনিক, প্রগতিশীল, স্বাধীনচেতা ও নারীবাদী হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাদের বক্তব্যে ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে, অভিজাত পরিসরে প্রবেশাধিকারের দাবি আছে, পেশাগত প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের এই উচ্চকণ্ঠ অবস্থানে সমাজের সবচেয়ে অসহায় নারীদের জায়গা কোথায়?

নারী শিশু শ্রমিকদের কথা কোথায়? অল্প মজুরিতে কারখানায় কাজ করা নারী শ্রমিকদের কথা কোথায়? নিজের শ্রমে সংসার চালানো গৃহকর্মীদের কথা কোথায়? বিনা পারিশ্রমিকে সন্তান লালন-পালন, রান্না, পরিচর্যা ও সংসারের অসংখ্য দায়িত্ব পালন করা গৃহিণীদের শ্রমের স্বীকৃতি কোথায়? যৌন হয়রানি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, অনিরাপদ যাতায়াত, মাতৃত্বকালীন অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার মধ্যে বেঁচে থাকা কোটি নারীর মুক্তির প্রশ্ন কোথায়?

এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। কারণ এগুলো নারীবাদী পরিচয়ের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নয়, তার বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থান যাচাই করে।

স্বাধীনতা কার, সুবিধা কার?

একজন উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত নারী নিজের পছন্দমতো পোশাক পরতে পারবেন, পেশা বেছে নিতে পারবেন, সম্পত্তির অধিকার ভোগ করবেন, নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছাবেন— এসবই তার অধিকার। কিন্তু তার স্বাধীনতার ধারণায় যদি অন্য নারীর শ্রমের মূল্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা অনুপস্থিত থাকে, তাহলে সেই স্বাধীনতার সামাজিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়।

যে নারী নিজের কর্মজীবন এগিয়ে নিতে গৃহকর্মীর শ্রমের ওপর নির্ভর করেন, কিন্তু সেই গৃহকর্মীর ন্যায্য মজুরি, বিশ্রাম, নিরাপত্তা ও শ্রমিক হিসেবে অধিকার নিয়ে নীরব থাকেন, তার অবস্থানের মধ্যে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। একইভাবে, যে নারী করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নারীর প্রতিনিধিত্ব চান, কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানের নিচের স্তরে কর্মরত নারীদের শোষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না, তার সমতার ধারণা কতটা পূর্ণাঙ্গ?

সমস্যা কোনো নারীর সাফল্য নয়। সমস্যা হলো, সেই সাফল্যকে নারীমুক্তির সামগ্রিক অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা, অথচ অন্য নারীদের বঞ্চনাকে রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে রাখা।

পুরুষতন্ত্র কি শুধু পুরুষের হাতে টিকে থাকে?

পুরুষতন্ত্র কেবল পুরুষের আধিপত্য নয়; এটি একটি সামাজিক ক্ষমতাকাঠামো। এই কাঠামোর নিয়ম, মূল্যবোধ ও সুবিধা নারীরাও বহন করতে পারেন, কখনো সচেতনভাবে, কখনো নিজেদের সামাজিক অবস্থান রক্ষার স্বার্থে।

কোনো নারী যদি নিজের শ্রেণিগত সুবিধা বজায় রাখতে অন্য নারীর অধস্তন অবস্থানকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেন, যদি নারী শ্রমিকের শোষণকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বলে এড়িয়ে যান, যদি দরিদ্র নারীর মর্যাদা ও অধিকারকে নিজের স্বাধীনতার সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা না করেন, তাহলে তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবেও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতাব্যবস্থার পুনরুৎপাদনে ভূমিকা রাখতে পারেন।

এখানে ‘দুর্বৃত্ত পুরুষতন্ত্রের তল্পিবাহক’ কথাটির তাৎপর্য রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, নারীর পরিচয় বা উচ্চবিত্ত জীবনযাপনই অপরাধ। বরং প্রশ্নটি হলো, কে কোন ক্ষমতাকাঠামোর পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, কার শ্রম থেকে সুবিধা নিচ্ছেন এবং কার বঞ্চনাকে অদৃশ্য করে রাখছেন?

নারীবাদ যখন শ্রেণিগত সুবিধার ভাষা হয়ে ওঠে

নারীমুক্তিকে যদি কেবল কিছু নারীর ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রবেশ, অভিজাত সামাজিক পরিসরে স্বীকৃতি অর্জন কিংবা পুরুষের মতো ব্যক্তিগত সুবিধা ভোগের অধিকারে সীমিত করা হয়, তাহলে সমাজের বৃহত্তর অংশের নারীদের মুক্তি অনিশ্চিতই থেকে যায়।

কারণ, ক্ষমতার কাঠামোয় কয়েকজন নারীর প্রবেশ মানেই কাঠামোটির পরিবর্তন নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে নারী নেতৃত্ব এলেও যদি নিচের স্তরের নারী শ্রমিকেরা কম মজুরি পান, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে সেখানে নারীর প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে, কিন্তু শ্রমের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে— এ কথা বলা যায় না। আসলে নারীর এই প্রতিনিধিত্ব বিভ্রান্তিকর, আনুপাতিক নয়।

একইভাবে, কোনো নারী রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা করপোরেট এলিটের অংশ হলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নারীমুক্তির প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন না। তার অবস্থান যাচাই করতে হবে তার বক্তব্য, কাজ, শ্রেণিগত স্বার্থ এবং নিপীড়িত নারীদের অধিকারের প্রশ্নে তার অবস্থানের ভিত্তিতে।

তাহলে এই নারীরা আসলে কারা?

এই প্রশ্নের উত্তর তাদের লিঙ্গ বা সামাজিক পরিচয় দিয়ে দেওয়া যায় না। দৃশ্যমান, প্রতিষ্ঠিত কিংবা উচ্চাকাঙ্ক্ষী সব নারীকে একই শ্রেণিতে ফেলা যেমন অন্যায্য, তেমনি নারীবাদের নামে পরিচালিত প্রতিটি বক্তব্যকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখাও যুক্তিসংগত নয়।

যারা নারীমুক্তির ভাষা ব্যবহার করে কেবল নিজেদের সুবিধার পরিসর বাড়াতে চান, অথচ শ্রমজীবী ও প্রান্তিক নারীদের বঞ্চনার প্রশ্নে নীরব থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে ‘শ্রেণিসুবিধাভোগী নারীবাদ’ একটি প্রাসঙ্গিক সমালোচনামূলক ধারণা। আর যারা নিজেদের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে অন্য নারীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক মুক্তির পক্ষে দাঁড়ান, তাঁদের অবস্থান আলাদা।

তাই পরিচয় নয়, বিচার করতে হবে রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে। স্লোগান নয়, দেখতে হবে বাস্তব ভূমিকা দিয়ে। সামাজিক পরিচিতি নয়, দেখতে হবে কার স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে।

প্রকৃত নারীমুক্তি শুধু কিছু নারীর ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা নয়; এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো নারীকে অন্য নারীর সস্তা শ্রম, অনিরাপত্তা কিংবা অধস্তনতার ওপর নিজের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে না হয়।

যে নারীবাদ নারী শিশু শ্রমিক, পোশাকশ্রমিক, গৃহকর্মী, গৃহিণী এবং দরিদ্র নারীর শ্রম ও মর্যাদাকে তার রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে আনতে পারে না, তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। কারণ নারীমুক্তি যদি কেবল সুবিধাভোগী নারীদের মুক্তি হয়, তবে তা সর্বজনীন মুক্তি নয়— তা বিদ্যমান ক্ষমতাব্যবস্থার মধ্যে সুযোগের পুনর্বণ্টন মাত্র।

একই মালিক বা একই মাফিয়ার প্রতিনিধি, অথচ মিডিয়ায় দুই দলের শত্রু শত্রু খেলা

একদল শিক্ষিত নারী ধর্মীয় পোশাক পরে রক্ষণশীলতার কথা বলেন, আরেকদল শিক্ষিত নারী নারীবাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও প্রগতির কথা বলেন। মিডিয়ায় তারা দুই বিপরীত শিবিরের প্রতিনিধি, পরস্পরের প্রতিপক্ষ; তাদের নিয়ে বিতর্ক হয়, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলে, চলে শত্রু শত্রু খেলা। কিন্তু দিনশেষে প্রশ্ন হলো, এই দুই দলের নিয়ন্ত্রক কি আলাদা? নাকি তারা একই মালিক, একই ক্ষমতাকাঠামো, একই মাফিয়ার স্বার্থ রক্ষাকারী দুই পক্ষ? একজন ধর্মের নামে নারীর স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সামাজিক বৈধতা তৈরি করেন, অন্যজন প্রগতির নামে এমন এক অভিজাত নারীবাদের প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে সুবিধাভোগী নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা দৃশ্যমান হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর শ্রম, শোষণ ও বঞ্চনা আড়ালেই থেকে যায়। তাদের মতাদর্শের ভাষা আলাদা, পোশাক আলাদা, স্লোগান আলাদা; কিন্তু দুই পক্ষের লড়াই যদি শেষ পর্যন্ত একই ক্ষমতাবানদের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখে, তাহলে এই বিরোধ কতটা বাস্তব, আর কতটা সাজানো রাজনৈতিক মঞ্চ— সেই প্রশ্ন তুলতেই হবে। কারণ, এই দুই শিবিরের মুখর লড়াইয়ে মিডিয়ার প্রায় পুরো জায়গা দখল হয়ে যায়, অথচ নারী পোশাকশ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, গৃহকর্মীর নিরাপত্তা, নারী শিশুশ্রমিকের শোষণ, গৃহিণীর বিনা পারিশ্রমিকের শ্রম কিংবা দরিদ্র নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্ন জায়গা পায় না। এক পক্ষ পুরুষতন্ত্রকে ধর্মীয় বৈধতা দেয়, অন্য পক্ষ সেই ব্যবস্থার ভেতর নিজেদের জন্য ক্ষমতা ও সুবিধার জায়গা তৈরি করে— আর দুই পক্ষের প্রচারযুদ্ধে আড়াল হয়ে যায় সেই নারীরা, যাদের শ্রম ও বঞ্চনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে গোটা সুবিধাভোগী ব্যবস্থা। এ কারণেই তাদের কে কতটা প্রগতিশীল, কে কতটা রক্ষণশীল— সেই তর্কের চেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, দিনশেষে তারা কার স্বার্থের প্রতিনিধি? একই মালিকের অধীনে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের মতো, তারা কি আসলে এমন এক ব্যবস্থার দুই মুখ, যে ব্যবস্থা চায় নারীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ুক, কিন্তু নিজেদের প্রকৃত শোষককে চিনতে না শিখুক?


পড়তে পারেনঃ

“নারীবাদ এখন শহুরে অভিজাতবাদে নিমগ্ন থাকে” -এলিসন ওলফ