Headlines

ভারত ও বাংলাদেশে ‘একই’ ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের নিচে পিষ্ট হচ্ছে মানুষ, যুদ্ধটাও তাই একই

ভারত
ফলোআপ নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত সামাজিক যুদ্ধ এখনো শুরু হয়নি। জুলাই আন্দোলনকে সেই যুদ্ধের সূচনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ছিল কর্তৃত্ববাদী শাসন, বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে একটি বহুমাত্রিক বিস্ফোরণ। সেখানে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদবিরোধিতা কোনো সর্বজনস্বীকৃত, সুসংহত ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না।

ভারত
একই শৃঙ্খল, একই হাহাকার এবং একই অধিকার আদায়ের লড়াই। ভারত ও বাংলাদেশে ধর্মের নামে চলা পদ্ধতিগত শৃঙ্খল, দমন-পীড়নের শিকার সাধারণ মানুষ আজ এক কাতারে। কতৃত্ববাদ এবং ক্ষমতার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধটা তাই একই।

বরং জুলাই আন্দোলনের ভেতরে ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল, উদারপন্থী, জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় রক্ষণশীল— বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রবণতা পাশাপাশি অবস্থান করেছে। এই বৈচিত্র্যই আন্দোলনের শক্তি ছিল; কিন্তু আন্দোলন-পরবর্তী বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদ ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে একটি সুসংগঠিত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তা বড় চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে।

বাংলাদেশে এর আগে গণজাগরণ মঞ্চের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি দৃশ্যমান গণপরিসর তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই আন্দোলনও স্থায়ী, সর্বব্যাপী ধর্মীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী সামাজিক শক্তিতে পরিণত হতে পারেনি। তার রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা, দলীয় মেরুকরণ এবং সাংগঠনিক পরিণতি নিয়ে সমালোচনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

ভারতের পরিস্থিতিও ভিন্নতর রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্য দিয়ে একই ধরনের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি: রাষ্ট্র, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ ও সংখ্যাগরিষ্ঠের পরিচয় যখন একাকার হয়ে যায়, তখন সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী এবং স্বাধীন চিন্তার মানুষের নাগরিক অধিকার কতটা নিরাপদ থাকে?

ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন, নাগরিকত্ব আইনবিরোধী প্রতিবাদ, ‘নট ইন মাই নেম’ প্রচারণা এবং সাম্প্রতিক তরুণদের আন্দোলন বিভিন্ন সময়ে বিকল্প প্রতিরোধের জায়গা তৈরি করেছে। কিন্তু এসব আন্দোলনকে একটিমাত্র অভিন্ন সংগঠন বা অভিন্ন আদর্শের অংশ হিসেবে দেখা যাবে না।

এখানেই সামনে আসে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা Cockroach Janta Party-র প্রশ্ন। এটি কি নিছক ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক পরিচয়, নাকি ভারতের তরুণদের মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, বেকারত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক অবিচারের বিরুদ্ধে একটি নতুন নাগরিক প্রতিরোধের সম্ভাবনা?

এর উত্তর নির্ভর করবে আন্দোলনটি কতটা বহুত্ববাদী, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থান নিতে পারে তার ওপর। কেবল সরকারবিরোধিতা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদবিরোধিতা নয়। একইভাবে, একটি ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী শক্তিকে সরিয়ে অন্য কোনো কর্তৃত্ববাদী শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করাও মুক্তি নয়।

ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। কিন্তু দুই দেশেই যখন ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠি বানানো হয়, যখন সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা সংখ্যাগরিষ্ঠের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যখন ধর্মের নামে বৈষম্য ও ঘৃণাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলে— তখন মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াই একটি অভিন্ন নৈতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য অর্জন করে।

সেই লড়াইয়ের প্রথম শর্ত হলো, নিজের পক্ষের অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস। দ্বিতীয় শর্ত, ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সবার সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। তৃতীয় শর্ত, কোনো দল, নেতা কিংবা ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে না রাখা।

বাংলাদেশে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান কিংবা ভারতে ‘ককরোচ’ আন্দোলন— কোনোটিকেই আগেভাগে মুক্তির চূড়ান্ত প্রতীক বানানোর প্রয়োজন নেই। বরং দেখতে হবে, তারা ক্ষমতার চরিত্র বদলাতে পারছে, নাকি শুধু ক্ষমতার আসনে বসা মানুষগুলোকে বদলাচ্ছে।

যুদ্ধটা তাই শুধু ভারত বা বাংলাদেশের নয়। যুদ্ধটা এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে ধর্ম মানুষের মুক্তির ভাষা না হয়ে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং শোষণের অস্ত্র হয়ে ওঠে।