Headlines

নিজের জীবন বহুমুখী, বহুগামী এবং উন্মুক্ত হলেও অহংকারী চিন্তার খোরাক হিসেবে কেনো তারা বেছে নিচ্ছে ধর্ম এবং সম্প্রদায়?

লেখক
ফলোআপ নিউজ ডেস্ক

নিজের জীবনযাপন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পেশাগত সুবিধা কিংবা স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে যারা বহুমুখী, বহুগামী ও উন্মুক্ত; তারাই কখনো কখনো নিজেদের অহংকার, সামাজিক মর্যাদা এবং শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্ম, সম্প্রদায় কিংবা নৈতিকতার কঠোর ভাষাকে বেছে নেয়। ব্যক্তিগত জীবনে সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই, কিন্তু অন্যের জীবনযাপন, বিশ্বাস ও স্বাধীনতার প্রশ্নে তারাই হয়ে ওঠে কঠোর নীতিবাদী!

সবাই ব্যবসা করলে ক্রেতা হবে কে? ধর্ম ব্যবসার দিন কি ফুরালো?

 

এখানে ‘বহুগামী’ বলতে কেবল যৌন সম্পর্কের বহুমাত্রিকতা বোঝানো হচ্ছে না। বরং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজের সুবিধা আদায় করতে একাধিক অবস্থান গ্রহণ, প্রয়োজনে নীতি পরিবর্তন এবং স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আদর্শ বেছে নেওয়ার প্রবণতাকে বোঝানো হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে এই ধরনের দ্বিচারিতার সামাজিক দৃশ্যমানতা এতটা বেড়েছে কেন? এমন একটি প্রজন্ম বা সামাজিক গোষ্ঠী কীভাবে তৈরি হলো, যারা ব্যক্তিগত জীবনে স্বাধীনতা ও সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চায়, অথচ প্রকাশ্য পরিচয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় কিংবা সম্প্রদায়গত শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী?

আত্মপরিচয়ের সংকট, নাকি ধার করা অহংকার?

মানুষ নিজের অর্জন, যোগ্যতা, সৃজনশীলতা, সততা কিংবা সামাজিক অবদানের ভিত্তিতে আত্মমর্যাদা তৈরি করতে পারে। কিন্তু যখন নিজের অর্জনের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন কেউ কেউ বৃহত্তর কোনো পরিচয়ের গৌরবকে ব্যক্তিগত অহংকারের উৎস হিসেবে গ্রহণ করে।

ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায় কিংবা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পরিচয় তখন ব্যক্তিগত যোগ্যতার বিকল্প হয়ে ওঠে। নিজের অর্জনের চেয়ে নিজের পরিচয়কে বড় করে দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয়। ‘আমি কী করেছি’— এই প্রশ্নের জায়গা দখল করে ‘আমি কোন গোষ্ঠীর’ প্রশ্নটি।

এটি অবশ্য প্রত্যেক ধর্মবিশ্বাসী কিংবা সম্প্রদায়গত পরিচয়ে গর্বিত মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের ব্যক্তিগত নৈতিকতা, আত্মসংযম ও মানবিকতার উৎসও হতে পারে। সংকট তৈরি হয় তখন, যখন পরিচয় আত্মসমালোচনার পরিবর্তে আত্মম্ভরিতার উপকরণ হয়ে ওঠে।

ভারত

ব্যক্তিগত জীবনে স্বাধীনতা, অন্যের জীবনে নৈতিকতার শাসন

এই দ্বিচারিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দ্বৈত নৈতিকতা। নিজের ক্ষেত্রে যে আচরণকে বাস্তবতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কিংবা পরিস্থিতির প্রয়োজনে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়, অন্যের ক্ষেত্রে সেই একই আচরণকে অনৈতিকতা, চরিত্রহীনতা কিংবা ধর্মীয় অবক্ষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

নিজের সুবিধার জন্য নীতি থেকে সরে আসা যায়, কিন্তু অন্যের সামান্য বিচ্যুতিও ক্ষমার অযোগ্য হয়ে ওঠে। নিজের স্বার্থে আপস করা যায়, কিন্তু প্রতিপক্ষের আপসকে বিশ্বাসঘাতকতা বলা হয়। নিজের জীবনে বহুমাত্রিকতা গ্রহণযোগ্য, অথচ অন্যের স্বাধীনতা অসহ্য।

এখানে মূল সমস্যা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কিংবা বহুমুখী জীবনযাপন নয়। মূল সমস্যা হলো, নিজের জন্য এক ধরনের নৈতিকতা এবং অন্যের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের নৈতিকতা নির্ধারণ করা।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, নিজের বিশ্বাস ও আচরণের মধ্যে অসংগতি তৈরি হলে মানুষ কখনো নিজের আচরণ সংশোধন করে, আবার কখনো সেই আচরণকে যুক্তিসংগত প্রমাণ করার চেষ্টা করে। ধর্মীয় কিংবা সম্প্রদায়গত পরিচয় কখনো কখনো এই আত্মপক্ষসমর্থনের ঢাল হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশে এই প্রবণতা কবে থেকে বাড়ল?

ধর্মীয় পরিচয়কে সামাজিক মর্যাদা কিংবা রাজনৈতিক শক্তির উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস বাংলাদেশে নতুন নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং পরিচয়কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা এই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং জাতীয়তাবাদের প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে। পরবর্তী দশকগুলোতে ধর্মীয় পরিচয় নির্বাচনী রাজনীতি ও সামাজিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে।

২০০০-এর দশক থেকে ডিজিটাল যোগাযোগ, স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং ধর্মীয় বক্তব্যের বিস্তৃত প্রচার পরিচয়ভিত্তিক সামাজিক প্রভাবের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে। ২০১০-এর দশকে ফেসবুক ও ইউটিউব ধর্মীয় পরিচয় প্রদর্শন, নৈতিক অবস্থানের প্রতিযোগিতা এবং গোষ্ঠীগত স্বীকৃতি অর্জনের সুযোগ আরও বাড়িয়ে দেয়।

২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধর্ম, জাতীয় পরিচয়, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান হয়েছে। তবে এসব পরিবর্তনকে সরাসরি একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

অর্থাৎ, সমস্যাটি কোনো একটি প্রজন্মের মধ্যে হঠাৎ জন্ম নেয়নি। বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রবণতা নতুন প্রযুক্তি, নতুন ক্ষমতার সম্পর্ক এবং নতুন ধরনের সামাজিক স্বীকৃতির বাজারে ভিন্ন রূপ পেয়েছে।

ধর্মীয় পরিচয় কি সামাজিক পুঁজি?

যে সমাজে যোগ্যতা, সততা ও কাজের চেয়ে পরিচয়, আনুগত্য কিংবা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক বেশি কার্যকর বলে বিবেচিত হয়, সেখানে ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত পরিচয় সামাজিক পুঁজিতে পরিণত হতে পারে।

কেউ এই পরিচয়ের মাধ্যমে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেন, কেউ রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন, আবার কেউ নিজেকে নৈতিকভাবে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

এক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশ্বাসের আন্তরিকতা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কৌশলগত ব্যবহারকে আলাদা করে দেখা জরুরি। কেউ বিশ্বাস থেকে ধর্ম পালন করেন, আর কেউ ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করেন সামাজিক ক্ষমতা, গ্রহণযোগ্যতা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্জনের জন্য। বাইরে থেকে দুজনকে কখনো একই রকম মনে হলেও তাদের উদ্দেশ্য ও আচরণের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য থাকতে পারে।

প্রকৃত পরীক্ষা তাই কে কতটা ধর্মীয় পরিচয় প্রদর্শন করছেন, তা নয়। বরং নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেও তিনি ন্যায়বিচার, সততা ও অন্যের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন কিনা।

রাজনীতি ও সামাজিক মাধ্যম কীভাবে এই দ্বিচারিতাকে পুরস্কৃত করে?

রাজনীতিতে নৈতিকতার নির্বাচিত ব্যবহার একটি পরিচিত কৌশল। নিজের পক্ষের মানুষ অন্যায় করলে সেটিকে ব্যক্তিগত ভুল বলা হয়, কিন্তু প্রতিপক্ষ একই কাজ করলে সেটিকে ধর্ম, সংস্কৃতি কিংবা জাতির বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এভাবে নৈতিকতা সর্বজনীন নীতির জায়গা থেকে সরে গিয়ে গোষ্ঠীগত অস্ত্রে পরিণত হয়।

সামাজিক মাধ্যমও এই প্রবণতাকে উৎসাহিত করতে পারে। উসকানিমূলক বক্তব্য, ধর্মীয় প্রতীক প্রদর্শন, নৈতিক ক্ষোভ এবং প্রতিপক্ষকে হেয় করার ভাষা অনেক সময় সংযত বিশ্লেষণের তুলনায় বেশি মনোযোগ পায়। ফলে প্রকৃত নৈতিক আচরণের চেয়ে নৈতিকতার প্রকাশ্য প্রদর্শন বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

যে ব্যক্তি নিজের বাস্তব আচরণের জবাব দিতে অনাগ্রহী, তিনিও অনলাইনে নৈতিকতার বিচারক হয়ে উঠতে পারেন। তার অনুসারীরা তার বক্তব্যকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করলে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আরও কমে যায়।

এখানে ব্যক্তির পাশাপাশি সেই সামাজিক ব্যবস্থাকেও প্রশ্ন করা প্রয়োজন, যে ব্যবস্থা নৈতিকতার প্রদর্শনকে পুরস্কৃত করে, কিন্তু নৈতিক আচরণ ও জবাবদিহিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।

পুজো কি শুধুই উৎসব, নাকি পিছনে কিছু লুকানোও থাকে।

মধ্যবিত্তের মর্যাদাসংকট ও ধার করা শ্রেষ্ঠত্ব

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক প্রতিযোগিতা এবং দ্রুত মর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা মানুষের আত্মপরিচয়কে প্রভাবিত করতে পারে। পেশাগত সাফল্য, সৃজনশীলতা কিংবা জনকল্যাণমূলক অবদানের মাধ্যমে স্বীকৃতি অর্জন সময়সাপেক্ষ। কিন্তু কোনো শক্তিশালী পরিচয়ের সদস্য হওয়ার মাধ্যমে দ্রুত সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে ধর্মীয় কিংবা সম্প্রদায়গত পরিচয় কারও কারও কাছে আত্মমর্যাদার বিকল্প উৎস হয়ে ওঠে। নিজের ব্যক্তিগত অর্জন নিয়ে গর্ব করার মতো যথেষ্ট উপাদান না থাকলেও গোষ্ঠীর ঐতিহ্য, ইতিহাস কিংবা শ্রেষ্ঠত্বের দাবি থেকে অহংকারের উপকরণ পাওয়া যায়।

তবে এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। ধর্মীয় পরিচয়ে গর্ব করা মানেই ব্যক্তিগত অর্জনের অভাব থাকা নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, কেউ নিজের পরিচয়কে মানবিকতা ও আত্মসংযমের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করছেন, নাকি অন্যকে ছোট করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।

এরা কি নিজের মধ্যে অহংকার করার মতো কিছু খুঁজে পায় না?

প্রশ্নটির উত্তর এককথায় দেওয়া সম্ভব নয়। তবে একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, কিছু মানুষ নিজের ব্যক্তিগত অর্জনের ভিত্তিতে আত্মমর্যাদা গড়ে তোলার পরিবর্তে পরিচয়ভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের ওপর নির্ভর করেন।

নিজের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তারা গোষ্ঠীর গৌরব সামনে আনেন। নিজের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তারা পরিচয়ের পবিত্রতা তুলে ধরেন। নিজের অসংগতি স্বীকার করার পরিবর্তে সমালোচককে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন।

এভাবে পরিচয় আত্মসমালোচনা থেকে রক্ষাকবচে পরিণত হয়।

সামাজিক মনোবিজ্ঞানের ‘Social Identity Theory’ অনুযায়ী, মানুষ নিজের আত্মপরিচয়ের একটি অংশ গোষ্ঠীগত সদস্যত্ব থেকে গ্রহণ করে। নিজের গোষ্ঠীকে ইতিবাচকভাবে দেখার মাধ্যমে ব্যক্তিগত আত্মমর্যাদাও বাড়তে পারে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া যখন অন্য গোষ্ঠীকে হেয় করা কিংবা নিজের গোষ্ঠীর অন্যায়কে অস্বীকার করার দিকে যায়, তখন তা সামাজিক বিভাজন ও দ্বিচারিতাকে শক্তিশালী করে।

সুতরাং, সমস্যাটি পরিচয় থাকা নয়; সমস্যাটি পরিচয়কে নিজের আচরণের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।

লেখক

দ্বিচারিতা চেনার পাঁচটি পরীক্ষা

কোনো মানুষ সত্যিই নীতিনিষ্ঠ, নাকি নৈতিকতার প্রদর্শন করছেন— তা বোঝার জন্য তার পোশাক, ধর্মীয় প্রতীক কিংবা ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে অনুমানের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। বরং তার আচরণ যাচাই করা যেতে পারে পাঁচটি প্রশ্নে।

১. নিজের গোষ্ঠীর মানুষ অন্যায় করলে তিনি কি একইভাবে প্রতিবাদ করেন?

২. নিজের সুবিধার বিপরীতে গেলেও কি তিনি নীতির পক্ষে দাঁড়ান?

৩. ভিন্ন ধর্ম, মত কিংবা সম্প্রদায়ের মানুষের সমান অধিকার মেনে নেন?

৪. নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন, নাকি সমালোচককে শত্রু বানান?

৫. পরিচয়ের গৌরবের বাইরে তার বাস্তব অবদান, দক্ষতা, সততা ও জনকল্যাণমূলক কাজ কী?

এই প্রশ্নগুলো ধর্মীয় মানুষের বিরুদ্ধে নয়। বরং সব ধরনের পরিচয়কেন্দ্রিক অহংকার, সুবিধাবাদ এবং দ্বৈত নৈতিকতা যাচাই করার মানদণ্ড।

পরিচয়ের অহংকার, নাকি অর্জনের আত্মমর্যাদা?

বাংলাদেশে যে প্রবণতাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থ, সামাজিক স্বীকৃতি এবং পরিচয়ভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের জটিল সম্পর্ক।

ব্যক্তিগত জীবনে সুবিধাবাদ, সামাজিক জীবনে মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক জীবনে পরিচয়ের ব্যবহার একই মানুষের মধ্যে পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে। যে সমাজে অর্জনের চেয়ে পরিচয়, জবাবদিহির চেয়ে আনুগত্য এবং নৈতিক আচরণের চেয়ে নৈতিকতার প্রদর্শন বেশি পুরস্কৃত হয়, সেখানে এই দ্বিচারিতা টিকে থাকার অনুকূল পরিবেশ পায়।

তবে এর সমাধান ধর্মকে আক্রমণ করা কিংবা ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সন্দেহের চোখে দেখা নয়। সমাধান হলো নৈতিকতার সর্বজনীন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা, ব্যক্তির আচরণকে তার ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং পরিচয়ের আড়ালে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করা।

মূল সংকট ধর্ম নয়, ব্যক্তিগত স্বাধীনতাও নয়। সংকট হলো— নিজের স্বার্থে সব দরজা খোলা রেখে অন্যের জন্য নৈতিকতার দরজা বন্ধ করে দেওয়া; নিজের সুবিধাকে বাস্তবতা বলা, আর অন্যের স্বাধীনতাকে অপরাধ বানানো।

যে মানুষ নিজের জীবনযাপনে স্বাধীনতা দাবি করেন, অথচ অন্যের স্বাধীনতা অস্বীকার করেন; যিনি নিজের স্বার্থে নীতির সঙ্গে আপস করেন, অথচ অন্যের কাছে কঠোর নৈতিকতার দাবি তোলেন— তার ক্ষেত্রে ধর্ম কিংবা সম্প্রদায়ের পরিচয় আত্মশুদ্ধির পথ না হয়ে আত্মপক্ষসমর্থনের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

সেখানেই আত্মপরিচয় আত্মমর্যাদার উৎস না হয়ে অহংকারের অস্ত্রে পরিণত হয়।

আর তখন প্রশ্নটি কেবল ধর্মের নয়, বরং মানুষের নিজের কাছে নিজের জবাবদিহির: নিজের অর্জন দিয়ে কি আমরা আত্মমর্যাদা তৈরি করছি, নাকি অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হওয়ার জন্য একটি পরিচয়ের আড়ালে আশ্রয় নিচ্ছি?